ষাটের দশকে নির্মিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি)। গ্রীক স্থপতি ডক্সিয়াডিসের নকশায় নির্মিত এই স্থাপনা যেমন এর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যে অনন্য, তেমনি এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও অপরিসীম। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে এমন একটি স্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত, যার চারপাশে ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সুকুমার বৃত্তির চর্চার নানা পীঠস্থান। আছে ইতিহাস ও কৃষ্টি নিয়ে সংগ্রহশালা।
টিএসসি প্রতিষ্ঠাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল পাঁচ হাজারের কাছাকাছি। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজারে। ক্রমবর্ধমান ছাত্রসংখ্যার কারণে টিএসসি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে আলোচনাও চলছে বেশকিছুদিন ধরে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শেখ হাসিনা ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রটির আধুনিকায়নের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন। টিএসসির সংস্কার কিংবা সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল প্রতিক্রিয়ায় বিষয়টি অনেকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। এ কাজে বর্তমান টিএসসি ভবন ভেঙ্গে ফেলা হবে কিনা, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দেয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্থাপত্য অধিদপ্তরের স্থপতিরা বর্তমান সব স্থাপনা সংরক্ষণ করেই নতুন সংযোজনের দুই দফা নকশা প্রণয়ন করেন, তবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
মূলত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যেমন বর্ধিত ছাত্রসংখ্যার স্থান সংকুলান প্রয়োজন, তেমনি বজায় রাখতে হবে টিএসসির ঐতিহ্যের আবেদন—কারণ টিএসসি'র স্থাপনাগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক আবেগ, ইতিহাস। রাজু ভাস্কর্যের মোড় কিংবা পায়রা চত্ত্বরের সামনে দাঁড়িয়ে দেখা টিএসসির ইউনিয়ন ভবনটিই আলোড়িত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক-বর্তমান সকল শিক্ষার্থীকে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সূতিকাগারের ভূমিকায় ছিল এই টিএসসি, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়াও আরও অনেকে জড়িত ছিলেন। ফলে ঢাকাবাসী কিংবা পুরো বাংলাদেশের জন্যই এটি নিছক একটি স্থাপনা নয়, বরং ঐতিহ্যের স্মারক। সুতরাং যেকোনো সংস্কারে টিএসসির বর্তমান রূপকে বজায় রেখেই যেন এর পরিধিকে প্রসারিত করা হয়, এমনটাই দাবি জানাচ্ছেন সকলে।
এই বিষয়গুলো নিয়ে ভেবেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের পঞ্চম বর্ষের একদল শিক্ষার্থী। স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ভাবতে হয়। সুপরিকল্পিত নকশা প্রণয়নের মাধ্যমে করে দেখাতে হয় সমাধান। নির্দিষ্ট বিষয়টি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও সৃজনশীল ভাবনায় তৈরি করা হয় একেকটি নকশা। স্থাপত্যে পড়ার ধাপে ধাপে নানা বিষয় শেখার পর, চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থীরা একেবারেই বাস্তব কোনো বিষয়কে নিয়ে অ্যাকাডেমিক প্রজেক্টের কাজ করেন। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের পঞ্চাশজন শিক্ষার্থী তাদের ‘স্প্রিং ২০২১’ সেমিস্টারে কাজ করেছেন টিএসসির সংস্কার, সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়ে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইনের ডীন প্রফেসর ড. ফুয়াদ হাসান মল্লিকের তত্ত্বাবধানে ও স্থাপত্য বিভাগের চেয়ারপারসন প্রফেসর ড. জয়নাব ফারুকী আলীর সার্বিক দিক-নির্দেশনায় এই স্টুডিও পরিচালনা করা হয়। দু'টি গ্রুপে শিক্ষার্থীদের ডিজাইন স্টুডিও কোর্স পরিচালনা করেন স্বনামধন্য স্থপতি এহসান খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ফারুক, স্থপতি নাঈম আহমেদ কিবরিয়া, সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহম্মদ হাবিব রেজা ও শিক্ষাদান সহকারী এহসান আলম।
প্রথমে কয়েকটি ধাপে আলোচনা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও টিএসসির ইতিহাস, অবস্থান এবং ঢাকা শহরের সঙ্গে এর সংযোগ নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর মতামতও জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে টিএসসির স্থাপনার সম্পর্ক, কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের পর্যালোচনা তুলে ধরেন স্থাপত্যের শিক্ষার্থীরা।
আলোচনায় বলা হয়, শাহবাগ থেকে পলাশী কিংবা দোয়েল চত্ত্বর পর্যন্ত পুরো এলাকাটি একটি সাংস্কৃতিক বলয়, যার ঠিক কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির অবস্থান। দেশের অন্য সকল সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্র থাকলেও, 'টিএসসি' শব্দটি শোনামাত্রই যে কারোর মনসপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির ছবিই ভেসে ওঠে। গ্রীক স্থপতি ডক্সিয়াডিসের নকশায় ষাটের দশকে নির্মিত টিএসসি ভবন যেমন এর নান্দনিকতার জন্য যে কাউকে আকৃষ্ট করে, তেমনি নানা কার্যকলাপের দিক থেকেও এটির ভূমিকা অনন্য। স্থপতি ডক্সিয়াডিস টিএসসির নকশা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও আবহাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখেছিলেন। দেশের গ্রামীণ পরিসরে ও স্থাপনার প্রাণকেন্দ্রে উঠান থাকে, সেটিকে কেন্দ্র করে মানুষের ঘর তৈরি হয়। তেমনি টিএসসির প্রাণকেন্দ্রে উঠানের মতোই রয়েছে সবুজ মাঠ। তার পাশে অডিটোরিয়াম, ক্যাফেটেরিয়া, সুইমিং পুল, জিমনেশিয়াম, ইত্যাদি জায়গাগুলো জুড়ে থাকে শিক্ষার্থীদের কোলাহল। গ্রামীণ গোলপাতার ঘরের ছাদের আদলে টিএসসির অডিটোরিয়াম ভবনটি নির্মিত। বারান্দার খুঁটিগুলো যেন গ্রামীণ বাড়ির বারান্দায় ব্যবহৃত বাঁশের খুঁটিরই প্রতিচ্ছবি। এছাড়া দক্ষিণের বাতাস, আলো, সব বিষয়কে ভেবেই সুনিপুণভাবে সাজানো পুরো স্থাপনাটি।
পরবর্তী ধাপে শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকে টিএসসি সম্প্রসারণের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্বাচন, প্রক্রিয়া ও নকশা নিয়ে কাজ শুরু করেন। ধাপে ধাপে প্রত্যক্ষভাবে তাদের সহযোগিতা করেন শিক্ষকরা। শিক্ষার্থী ইশরাক সালিহ তালুকদার বলেন, টিএসসির বর্তমান ভবনগুলোকে সংরক্ষণ করে, গ্রীক স্থপতি ডক্সিয়াডিসের দর্শনেই সম্প্রসারণের অংশটুকুকে সাজালে সেটি টিএসসির আবেদন আরও বৃদ্ধি করবে। কারণ এই নকশাটি বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও আবহাওয়াকে ভেবেই তৈরি করেছিলেন ডক্সিয়াডিস। দেশের গ্রামীণ পরিসরে ও স্থাপনার প্রাণকেন্দ্রে উঠান থাকে, তেমনি টিএসসির প্রাণকেন্দ্রে উঠানোর মতোই রয়েছে সবুজ মাঠ। ভবনগুলো মানবিক। এর প্রতিটি বৈশিষ্ট্যকে অটুট রেখেই সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
আরেক শিক্ষার্থী আশফাক উল্লাহ চৌধুরী বলেন, টিএসসির দক্ষিণে আণবিক শক্তি কমিশনের একটি কেন্দ্রের অবস্থান। কেন্দ্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। এই কেন্দ্রকে অন্যকোথাও স্থানান্তর করে ওই জমিতে টিএসসি সম্প্রসারণ করা হলে সরাসরিভাবে এটির পরিধি ও ব্যাপ্তি আরও বিস্তৃত হবে। পাশাপাশি বাংলা একাডেমির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনেরও সুযোগ রয়েছে। এছাড়া, টিএসসির মূল উঠানের পূর্বদিকে প্রস্তাবিত মেট্রোরেল প্রকল্পের একটি স্টেশন স্থাপিত হবে, যেটি ব্যাপক জনসমাগম তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং ঠিক বিপরীতে টিএসসির পশ্চিমে জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল বা শামসুন্নাহার হলের বাসিন্দাদের জন্য নতুন জমির মধ্য দিয়ে সংযোগ তৈরির সুযোগ আছে। এছাড়া ভেতরের কয়েকটি মঠকেও সংরক্ষণ করা হবে। একইরকম ভাবনা শানিলা, ফেরদৌস, ঐন্দ্রিজা, সোহানা, রাফা, আকিব, সাদেকুল, ফাহিম, সনদ, রিশাদ, মারুফ, নাফিয়া, অর্ণাসহ অনেক শিক্ষার্থীর। আরও আছেন জুবায়ের, রিদা, সামিরা, ইয়ুকি, তৃষা, ফাবলিহা, জাহিন, অধরা, রাফিয়া, সামিরা প্রমুখ।
টিএসসির বর্তমান স্থাপনাগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে পরিবর্তন আনার কথাও ভেবেছেন তারা। যেমন পরিত্যক্ত সুইমিং পুলের অংশে হতে পারে এম্ফিথিয়েটার, যেখানে পথশিশুদের জন্য মুক্ত পাঠশালার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে করে টিএসসির আশেপাশে ঘুরে-বেড়ানো পথশিশুদেরকে পাঠদান করতে পারবেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা। ইনডোর গেম্স রুমে হতে পারে লাইব্রেরি। ইউনিয়ন ভবনের নিচতলায় হতে পারে আর্কাইভ ও লাউঞ্জ। এছাড়া ৩০০ আসনবিশিষ্ট অডিটোরিয়ামটিকে একটি সিনেমা হল হিসেবে রূপ দেয়া যেতে পারে, কারণ বিভিন্নসময়ই শিক্ষার্থীরা এখানে প্রজেক্টের মাধ্যমে খেলা দেখেন। আর সম্প্রসারিত অংশে যুক্ত হবে ১৫০০ আসনের নতুন অডিটোরিয়াম, ক্লাব অফিস, রিহার্সেল রুম, মাল্টিপারপাস, সেমিনার হল, ফিটনেস সেন্টার ও ইনডোর গেম্স, নামাজের জায়গা, ইত্যাদি। বাড়ানো হবে ক্যাফেটেরিয়ার আসন। বেজমেন্টে গাড়ি পার্কিং থাকবে। এ সকল বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের চাহিদার কথাই মাথায় রাখা হয়েছে।
তবে একেবারেই ভিন্ন একটি পরিকল্পনার কথা ভেবেছেন আরেক শিক্ষার্থী রুবাইয়াৎ কামাল। এর জন্য যুক্তিও দেন তিনি। বৃটিশ আমলে কাঁটাবনের উপর দিয়ে ফুলবাড়িয়া রেললাইন ছিল, যার কিছুটা সামনেই ছিল ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন। এই রেললাইনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও কাঁটাবনের আরবান প্যাটার্নেও ভিন্নতা দেখা যায়। বর্তমান টিএসসি সেই রেললাইন থেকে বেশ দূরে হওয়ায় তখন এতে কোনো প্রভাব পড়েনি, তবে এখন যেহেতু এই অংশে মেট্রো তৈরি হচ্ছে তাই সম্প্রসারণের অংশটি অন্য জমিতে নেয়া যেতে পারে। রুবাইয়াৎ বলেন, নির্মিতব্য মেট্রোরেল স্টেশনের কোলাহলের কারণে বর্তমান টিএসসি'র আবেদনে অনেকটাই ভাটা পরার সম্ভাবনা আছে। বর্তমান উপাচার্য ভবনের একাংশে নতুন টিএসসি তৈরির কথা চিন্তা করা যেতে পারে। ১১৫ বছরের পুরানো উপাচার্য ভবনটিও বৃটিশ স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য উদাহরণ। তাই এই পুরানো স্থাপত্যটি সসম্মানে রেখে পুরো জমির একটা অংশে সানকেন (মাটির নিচে) করেও টিএসসির কর্মকাণ্ডগুলোর সম্প্রসারণ তৈরি করা সম্ভব। অনেকটা কাছাকাছি চিন্তা শিক্ষার্থী স্বাক্ষর রায়েরও।
বাস্তবে হোক বা না হোক, নিজের মত করে ভাবতে কিংবা স্বপ্ন দেখতে তো বাঁধা নেই। তাই শিক্ষার্থীদের প্রায় সকলেই মনের মত করে সাজাতে চেষ্টা করেছেন টিএসসি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা। সৃজনশীলতা, প্রকৌশল-প্রযুক্তি ও যুক্তির মিশেলে প্রত্যেকেই ভিন্নভাবে ভাবলেও বর্তমান টিএসসিকে সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষণের ছাপ ছিল প্রতিটিতে। সহযোগী অধ্যাপক ড. হাবিব রেজা বলেন, একটা স্থাপনাকে তখনই 'হেরিটেজ' বলা হয়, যখন এর সাথে ইতিহাস ও ঐতিহ্য মিশে থাকে। তাছাড়া হেরিটেজের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল মানুষের মনে স্মৃতি জাগিয়ে তোলা। এতে মানুষ অতীতে ফিরে যায়, স্মৃতি রোমান্থন করে আলোড়িত হয়। এমনকি স্থাপনার সঙ্গে জাতির পথপরিক্রমারও সম্পর্ক থাকে। তাই ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে থাকা স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলা যায়না। তবে প্রয়োজনের তাগিদে তার বাহ্যিক রূপ বজায় রেখে 'অ্যাডাপ্টিভ রি-ইউজ' বা ভেতরগত ব্যবহারে পরিবর্তন, সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা যায়। হেরিটেজ ম্যানেজমেন্টে এজন্য নানা পদ্ধতি আছে।
স্থপতি নাঈম আহমেদ কিবরিয়া বলেন, এটা খুব স্পষ্ট যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস। দেশের ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয় জড়িত। ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্র সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে সম্মিলন ঘটানোর মাধ্যমে জ্ঞানের আদানপ্রদানের একটি জায়গা হলেও, এই টিএসসি ছাত্র ও শিক্ষক থেকে শুরু করে সচেতন মানুষ, সবার কাছেই জ্ঞাণের তীর্থস্থান, সৃষ্টিশীলতার প্রেরণা, বোধের প্রতীক। পড়াশোনা, ইতিহাস, আন্দোলন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সবকিছুর কারণে অতীত থেকেই টিএসসি আলোচনায় থেকেছে। সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায় অপরিসীম ভূমিকা পালন করেছে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত প্রায় সব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ের অবস্থান টিএসসিতে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ নানা ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্ত্বর। বইমেলা, বৈশাখ উদযাপন থেকে শুরু করে যেকোনো উৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের কেন্দ্রে থাকে টিএসসি। আমরা এ সকল বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছি।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সেমিস্টারটি চলে ২০ মে পর্যন্ত। এরইমধ্যে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রকল্প তৈরির সব কাজ শেষ করেন। সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ফারুক বলেন, করোনাকালীন সময়ে ঘরে বসে অনলাইনের মাধ্যমে পুরো কোর্স পরিচালনা করা হয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতস্ফূর্ত। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেই যথাযথভাবে ক্লাস নেয়া সম্ভব হয়েছে, বেশ কয়েকটি ভালো পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে শিক্ষার্থীরা। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস জেনেছে, টিএসসিকে নিয়ে নতুন করে ভেবেছে। সবমিলিয়ে এটি আমাদের জন্য বেশ ইতিবাচক একটি অভিজ্ঞতা।
স্থপতি এহসান খান বলেন, শাহবাগ চত্বরের একেবারেই সন্নিকটে জাতীয় জাদুঘর, এর পরপরই সরকারি গণগ্রন্থাগার, চারুকলা ইন্সটিটিউট, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, মধুর ক্যান্টিন, ডাকসু, কলাভবন, হাকিম চত্বর, ইত্যাদি। এই চত্বরেই সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য এবং ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রের পরিসর শুরু। এরপর আছে বর্ধমান হাউজে প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমি। দক্ষিণে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, পূর্বে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, যার অন্যপাশে শিল্পকলা একাডেমি রয়েছে; আর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে দক্ষিণ-পূর্ব অংশে তিন নেতার মাজার ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এবং কার্জন হল অবস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান নির্দিষ্ট ভবন বা দেয়ালে আবদ্ধ না হবার ফলে এটির পরিধি পুরো এলাকাকে কেন্দ্র করে চতুর্পাশে বিস্তৃত। শিক্ষার্থীদের আনাগোনা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, নানা কর্মসূচি চারপাশের এলাকার সঙ্গেও যোগসূত্র স্থাপন করে। টিএসসি সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় এই প্রতিটি বিষয় ও ডক্সিয়াডিসের স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য গভীরভাবে ভেবেছে শিক্ষার্থীরা।
১৮, ১৯ ও ২০ মে অনলাইনে শিক্ষার্থীদের প্রকল্পগুলোর ‘জুরি’ অনুষ্ঠিত হয়। দেশের প্রথিতযশা কয়েকজন স্থপতি এতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশ নেন। খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে হবু স্থপতিদের জন্য নানা নির্দেশনা ও পরামর্শ দেন তারা। শিক্ষার্থীদের চেষ্টাকে তারা সাধুবাদ জানান। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইনের ডীন প্রফেসর ড. ফুয়াদ হাসান মল্লিক বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ শিক্ষার্থীদেরকে বাস্তবমুখী সমস্যার সমাধান করা শেখায়। ব্র্যাক যেহেতু মানুষের জন্য কাজ করে, তাই আমাদেরও লক্ষ্য থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে খাপ খাইয়ে তৈরি করার পাশাপাশি তাদের মধ্যে দূরদর্শী চিন্তার বীজ বপন করার। নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে চিন্তাকে মেলে ধরে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো এবং ইতিবাচক কাজে উদ্বুদ্ধ করাই মূল লক্ষ্য। এবারের এই অ্যাকাডেমিক স্টুডিওতে টিএসসি কীভাবে গড়ে উঠেছে, সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা কত ছিল, বর্তমানে এটি কতজন শিক্ষার্থী ব্যবহার করতে পারছে, ভবিষ্যতের জন্য এর চাহিদা কী—এ বিষয়গুলো আমাদের শিক্ষার্থীরা পর্যালোচনা করেছে। টিএসসি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বর্তমান স্থাপনাগুলোকে অক্ষুণ্ণ রেখেই কী সমাধান হতে পারে, তা ভেবে চূড়ান্ত ভাবনা দাঁড় করিয়েছে। তারা তাদের প্রকল্পগুলোকে এমনভাবে সাজিয়েছে যা বাস্তবায়ন সম্ভব। আমরা প্রত্যাশা করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রটি হয়ে উঠুক আরও প্রাণবন্ত, বেঁচে থাকুক এর ইতিহাস।
'এক্সপানশন অব টিএসসি' শিরোনামে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত বুকলেট দেখতে ক্লিক করুন
ইত্তেফাক/এসটিএম