বইমেলা প্রাণের মেলা চিরচেনা জনস্রোত

কি কি বই কিনেছ? প্রশ্ন করতেই শত কণ্ঠের চিত্কারে বোঝা গেল না কিছুই। বইমেলায় আসার, নতুন নতুন বই কেনার আনন্দে শিশু-কিশোরদের চোখে খুশির ঝিলিক। সেটাই জানান দিল শতকণ্ঠের মিলিত চিত্কারে। গতকাল সকালে ‘শিশুপ্রহর’ এ মেলায় শিশুরা এসেছিল দলবেঁধে। অভিভাবকরা জানালেন, শুধু লেখাপড়া নয়, আমাদের শিশুদের সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের চেতনালালিত এ বইমেলার সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে চাই। সে কারণেই বইমেলায় আসা। মেলায় এসে বইমেলা, বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সম্বন্ধে জানবে। শুধু বই পড়ে জানার চেয়ে ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে এলে তারা হূদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবে। সেটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।

এদিকে, গতকাল শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় বইমেলা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। সেই চিরচেনা জনস্রোত। মানুষের লাইন, আর বইমেলা প্রাঙ্গণ ভরে উঠেছে মানুষের পদচারণায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এত বড় মেলা প্রাঙ্গণকেও কাল ছোট মনে হয়েছে। মনে হয়েছে আরো জায়গা প্রয়োজন।

বাবা-মায়ের হাত ধরে সকাল  থেকেই শিশুদের ভিড় বাড়তে থাকে শিশু চত্বরে। শিশু চত্বর সাজানো হয়েছে ভিন্নভাবে। শিশু চত্বরের গেট দিয়ে প্রবেশ করার সময় মনে হবে যেন কোনো কল্পলোকে প্রবেশ করছে তারা। সেখান তাদের জন্য বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সিসিমপুরের হালুম-ইকরি-টুকটুকি-শিকু। বই কিনতে স্টলে স্টলে ঘুরে বেড়ানো, আর ইকরি-হালুমদের সরাসরি দেখতে পাওয়ায় আনন্দের জোয়ারে ভাসে কচি সব প্রাণ। সন্তানের সঙ্গে অভিভাবকরাও শিশু হয়ে গিয়েছিলেন, বাচ্চাদের সঙ্গে মেতে উঠেছিলেন খেলায়।

বইমেলার সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ বলেন, ‘শিশুদের জন্য এবার শিশু চত্বরে আলাদা গেট করায় সুবিধা হয়েছে। শিশুরা তাদের নিজেদের জায়গাটা চিনতে পারছে। শিশু-কিশোরদের জন্য কার্টুন, রূপকথা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ মজার মজার সব বই নিয়ে হাজির হয়েছে প্রকাশকরা। শুধু শিশু চত্বর নয়। শিশুদের জন্য আলাদা আয়োজন রয়েছে প্রতিটি প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানেই। তাই শিশুপ্রহর সীমাবদ্ধ থাকেন শিশু চত্বরে। পুরো মেলাই শিশুদের আনাগোনায় হয়ে উঠেছিল রঙিন।

আর বিকালে বইমেলায় ছিল মানুষের জোয়ার। দলবেঁধে মানুষের ঢল এসে মিলেছে বইমেলা প্রাঙ্গণে। স্টলে স্টলে বই কেনার পাশাপাশি বইমেলায় ঘুরে আড্ডা দিয়ে আর সেলফি তুলে যেন উত্সবে মেতে উঠেছিলেন সবাই।

শুক্রবারের মেলা নিয়ে তাম্র্রলিপির প্রকাশক একে তারিকুল ইসলাম রনি বলেন, ‘মেলা শুক্রবারে ভরে ওঠে পাঠকের আনাগোনায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রচুর মানুষ আসছে। তারা শুধু বই দেখছেন না, কিনছেনও। এবারের মেলাটা বেশ জমাট হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।’

এদিকে, আজ শনিবারও শিশু প্রহর। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মেলায় শিশু প্রহর অনুষ্ঠিত হবে।

গতকাল অনেক কবি লেখকরাও এসেছিলেন মেলায়। আনিসুল হক প্রতিদিন আসছেন। গতকাল আরো যারা এসেছিলেন তারা হলেন — আনোয়ার সৈয়দ হক, প্রাবন্ধিক সৈয়দ আবুল মকসুদ, কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, মোস্তফা কামাল, সুমন্ত আসলামসহ আরও অনেকেই।

ছুটির বিকালে মেলায় এসেছে কবি-সাংবাদিক মুস্তাফিজ শফির দুইটি কবিতার বই। কথাপ্রকাশ থেকে এসেছে ‘ব্যক্তিগত রোদ এবং অন্যান্য’। তিনটি কবিতার ধারাবাহিক নিয়ে সাজানো হয়েছে বইটি। চৈতন্য থেকে এসেছে তার ‘কবির বিষণ্ন বান্ধবীরা’ বইটির পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ।

সিসিমপুর শুধু টিভি অনুষ্ঠান নয়, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাও ... মার্কিন রাষ্ট্রদূত

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার গতকাল শুক্রবার সকালে সস্ত্রীক বইমেলায় এসেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সিসিমপুরের মঞ্চে শিশুদের সঙ্গে তিনি অনেকটা সময় কাটান। শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন, খেলা করেন।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, সিসিমপুর শুধু টিভি অনুষ্ঠান নয়, সিসিমপুর একটি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাও। এর মাধ্যমে শিশুদের ভাষা, গণিত, বন্ধুত্ব এবং নৈতিকতার শিক্ষা দেয়া হয় জানতে পারে। এই সিসিমপুর দেখে যারা বড় হবে তারা যতদিন বাঁচবে তাদের হূদয়ে মানুষের দরদ ও ভালোবাসা থাকবে। এই শিক্ষাই সিসিমপুর দেয়।

এসময় আর্ল রবার্ট মিলার বলেন, বাংলাদেশের মাসব্যাপী এ বইমেলা এক অসাধারণ উদ্যোগ। যা দেখে আমি মুগ্ধ। তিনি বলেন, ২০১৩ সাল থেকে ইউএসএআইডি’র সহযোগিতায় সিসিমপুর চলছে। এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি অনুষ্ঠান যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘সিসেম স্ট্রিট’ এর কার্টুন চরিত্রের আদলে সৃষ্টি। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ শিশুদের কাছে এটি পৌঁছাচ্ছে। আমরা আমাদের সময়ে থাকা কার্টুন চরিত্রের সঙ্গে বড় হয়েছি, আর এখন আমাদের শিশুরা বড় হচ্ছে হালুম-ইকরি-টুকটুকির সঙ্গে।

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কথা শেষে মঞ্চে আসে শিশুদের প্রিয় চরিত্র হালুম, ইকরি, শিকু ও টুকটুকি। এরপর শিশুরা তাদের সঙ্গে আনন্দযজ্ঞে মেতে ওঠে।

নতুন বই

গতকাল মেলায় এসেছে ২৬৩টি বই। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ডা. প্রাণগোপাল দত্তের ‘পদোন্নতির সাতকাহন (অনিন্দ্য), আবিদ আনোয়ারের ধলপহরের পদাবলি (আগামী), ভবেশ রায়ের ‘কালজয়ী স্থাপত্য ও সভ্যতা (রিয়া প্রকাশনী), মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘এক ডজন একজনে’ (সময় প্রকাশন), বেলাল চৌধুরীর ‘যাওয়ার আগে আরেক চুমুক (চিত্রা প্রকাশনী), খালেক বিন জয়েন উদ্দিনের ‘আমার নদী আমার মেয়ে’ (প্রত্যয় প্রকাশনী), জাকির তালুকদারের ‘কুরসিনামা’ (কবি প্রকাশনী), হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘ঈহা’ (পাঞ্জেরী) প্রভৃতি।