ফুলের রাজধানী গদখালী

নিজে স্বীকার করেন না। কিন্তু গদখালীর ফুলের রাজ্যে তিনিই যে মুকুটহীন রাজা। তিনিই পথিকৃত। তিনি শের আলী সরদার। গত প্রায় চার দশকে এক শের আলী থেকে তৈরি হয়েছে হাজার হাজার শের আলী। ধান নয়, পাট নয়, ফুলই তাদের ধ্যানজ্ঞান। ফুল চাষ করেই রীতিমতো বিখ্যাত দেশের যশোর জেলার ঝিকরগাছার এই গদখালী। এই গ্রামের ফুল এখন শুধু সারাদেশে নয়, যাচ্ছে বিদেশেও। কিন্তু কিভাবে সম্ভব হলো এটা? 

১৯৮২ সালে ছোট্ট একটি নার্সারি থেকে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করেন শের আলী। এই নার্সারি ব্যবসা ছিল তার বাবা আব্দুর রহমান সরদারের। সেই নার্সারিতে তার ভারতীয় বন্ধু রমেশের উত্সাহে রজনীগন্ধা ফুলের চাষ শুরু করেন তিনি। তারপরই বদলে যেতে থাকে সবকিছু। এখন শের আলী ৫০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করেন। আর গদখালীসহ আশপাশের কয়েকগ্রাম মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে পাঁচ হাজার চাষি ফুল চাষ করছেন। সারাদেশের ফুলের চাহিদার ৭০ ভাগই মেটানো হচ্ছে গদখালী থেকে। গদখালী এখন ফুলের রাজ্য। যেখানে যাবেন শুধু ফুল আর ফুল।

শহর থেকে যশোর রোড ধরে শতবর্ষী রেইনট্রির ছায়া মাড়িয়ে বেনাপোলের দিকে ১৯ কিলোমিটার গেলেই চোখে পড়বে গদখালী বাজার। সেখান থেকে পূর্বদিকের রাস্তা ধরে কিছু দূর এগোলেই শের আলীর ফুল সাম্রাজ্য। সেই সাম্রাজ্যে রয়েছে ইউরোপের অনিন্দ্য সুন্দর ফুল জারবেরা, রয়েছে রথস্টিক, রজনীগন্ধা, গোলাপ, ক্যালেনডোলাসহ নানারকম ফুল। এই ফুল চাষ করেই তিনি হয়েছেন কোটিপতি কৃষক। ঘুরেছেন বিশ্বের ১৮টি দেশ। 

আশি বছরের বয়োবৃদ্ধ মো:শের আলী জানান, আশির দশকে ভারত থেকে ফুল আমদানি করে চাহিদা মেটানো হতো। সেসময় স্বল্প পরিসরে শুরু করলেও ফুল আমদানি বন্ধ করাই ছিল তার ফুল চাষের উদ্দেশ্য। এখন তা সফল হয়েছে। তবে ফুলের বীজ ও চারা আমদানিতে এখনো ভারতের উপর নির্ভর করতে হয়। তিনি বলেন, আমাদের ফুলচাষিরা দক্ষ হয়ে উঠছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ফুল রপ্তানির করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে তিনি জানান।

গদখালীর নামযশ ছিল ব্রিটিশ আমলেও

গদখালীর নামকরণ-এর সঠিক ইতিহাস পাওয়া না গেলেও জনশ্রুতি রয়েছে ব্রিটিশ আমলে গদখালী ব্যবসা কেন্দ্র ছিল। গদখালী রেল স্টেশনের কারণে বর্তমান উপজেলা সদর (ঝিকরগাছা) এর চেয়ে গদখালীতে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো ছিল। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় গদখালী বাজারের পতন হলে ব্যবসা বাণিজ্যেরও পতন ঘটে। তখন থেকে গদখালীর মানুষ চাষাবাদে মনযোগ দেয়। ধান-পাটসহ অন্যান্য ফসল চাষে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু ফসলে তেমন লাভ না হওয়ায় তারা ধীরে ধীরে ফুল চাষে ঝুঁকে পড়ে।

গদখালীর আশপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে ফুল চাষ

এ দিকে গদখালীকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী পানিসারা, মঠবাড়ি, সৈয়েদপাড়া, টাওরা, বেনেয়ালী গ্রামেরও প্রায় ১২শ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ শুরু হচ্ছে। দিন দিন ফুল চাষির সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে গদখালী ও আশপাশের গ্রামের প্রায় ৫ হাজার চাষি ফুল চাষ করছেন। তারা গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্যান্ডরিয়া, জারবেরা, গাঁদা, ক্যালোনন্ডোলা, লিলিয়াম, গ্লাডিউলাস, চন্দ্রমল্লিকা, রডস্টিক, জিপসি ইত্যাদি ফুল চাষ করে থাকে। তবে চাহিদা বেশি হওয়ায় গোলাপ, রজনীগন্ধা, জারবেরা ফুল বেশি চাষ হয়।

সৈয়েদপাড়া গ্রামের ফুল চাষি রমজান আলী জানান, গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার ফুল উত্পাদন বেড়েছে। শ্রমিকের মূল্য বেশি, চারার মূল্য দ্বিগুণ, সার কীটনাশকের মূল্য বেশি হওয়ায় উত্পাদন খরচ বেড়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে ফুলের দাম বাড়েনি। তারপরও ফুল চাষে লাভ বেশি।

চাষিরা জানান, ধান ও পাট চাষে বিঘা প্রতি উত্পাদন খরচ ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা। লাভ হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। সেখানে বিঘা প্রতি গোলাপ উত্পাদন খরচ ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। লাভ কখনো কখনো আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত হয়।    

পানিসার গ্রামের ফুল চাষি হারুন অর রশিদ জানান, চোরাপথে ফুল আমদানী হওয়ায় ফুলের বিক্রয় মূল্য কম হচ্ছে। ফলে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গদখালীর পটুয়াপাড়া গ্রামের ফুল চাষি আব্দুল্লাহ জানান, ফুলহাটে ইজারাদারদের কারণে কখন কখন ফুলের বাজার অস্থিশীল হয়ে ওঠে। তিনি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তিনি বলেন, ফুল ও ফুলবীজ সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত কোনো হিমাগার নেই। এ জন্য চাষিদের সমস্যায় পড়তে হয়। 

সপ্তাহে দুদিন গদখালীতে ফুলের হাট বসে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যাপারীরা এসে এখান থেকে ফুল কেনেন। সাধারণত ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, খুলনা ছাড়া দেশের ছোট বড় এলাকা থেকে এখানে ব্যাপারীরা আসেন। কিন্তু এ হাট সংলগ্ন এলাকায় আবাসিক হোটেল না থাকায় ব্যাপারীরা ভোগান্তির শিকার হন। তবে যশোর-বেনাপোল সড়কের পাশে গদখালী ফুলের হাট হওয়ায় দেশের সর্বত্র সহজেই ফুল পাঠানো সম্ভব হয়।   

ফেব্রুয়ারি ব্যস্ততম মাস

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি এলেই ঘুমানোর জন্য এতটুকু সময় থাকে না এখানকার ফুল চাষিদের। বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবসসহ বিভিন্ন দিবসকে উপলক্ষ করে এখানকার চাষিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। সারা বছরের তুলনায় এ দিবসগুলোতে ফুল বিক্রি হয় কয়েকগুণ বেশি। সংশ্লিষ্টরা জানান, সারা বছর প্রতি সপ্তাহে রবি ও বৃহস্পতিবার দুই হাটে গড়ে ত্রিশ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয়। কিন্তু ফুলের ভরা মৌসুমে এ বিক্রির পরিমাণ কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এ বছর বিভিন্ন উত্সবকে সামনে রেখে ফুল চাষিরা ১শ কোটি টাকা ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের নজরদারিতে এবার ফুলের ফলন বেশি হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হবে বলে আশা করছে।

রাজধানীর ফুল ব্যবসায়ী কালার ফ্লাওয়ার শপের জহির উদ্দিন বাবর ইত্তেফাককে জানান, ফুলের বাজার মানেই গদখালী। আর এখানকার ফুলের মান ভালো হওয়ায় ২০ বছর ধরে আমি এ মোকাম থেকে ফুল কিনি।  

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, ফুল সংরক্ষণের জন্য এখনো গদখালীতে হিমাগার নির্মাণ হয়নি। আমাদের দাবি এটা দ্রুত করা হোক। তিনি ফুল চাষিদের স্বার্থে চীন ও থাইল্যান্ড থেকে ফুল আমদানি বন্ধের দাবি জানান।