রাজধানীর অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্পে গতি নেই, দুর্ভোগ

রাজধানী ঢাকার উন্নয়ন নিয়ে সরকারের উদ্যোগ ও আন্তরিকতার অভাব নেই। নগরে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। কিন্তু এত কিছুর পরও জনদুর্ভোগ কাটছে না। বছর জুড়ে যানজট, জলজটে নাকাল হচ্ছে নগরজীবন। শুষ্ক মৌসুমে রাস্তায় উড়ছে ধুলো-বালি। আজ এক সেবা প্রতিষ্ঠান খোঁড়াখুঁড়ির কাজ করলে সাত দিন পর একই রাস্তায় কাজ করছে আরেক সংস্থা। উন্নয়ন কাজে নেই কোনো সমন্বয়। কে কোনো রাস্তায় কখন কাজ করছে তা-ও জানা থাকে না সেবাসংস্থাগুলোর। সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাবে নগরবাসী দুর্ভোগ পোহাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আসছে বর্ষায় জনদুর্ভোগ আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বর্তমানে রাজধানীজুড়ে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার ১৪টি বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বাস্তবায়নাধীন পাঁচটি প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত আছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বিভিন্ন ধরনের নয়টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পগুলোর সার্বিক অগ্রগতি কাঙ্ক্ষিত মানে নেই বলে স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দুই সিটি করপোরেশনের বেশিরভাগ  প্রকল্প চলছে কচ্ছপ গতিতে। এর মধ্যে উত্তর সিটি করপোরেশনের অনেক প্রকল্প নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে এসব প্রকল্প শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। 

নাগরিক ও নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিক সেবা বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ ও আন্তরিকতা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। টাকার অভাব নেই, অভাব শুধু সমন্বয়ের। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প মাঠ পর্যায়ে যারা বাস্তবায়ন করছেন, তাদের দায়সারা কাজে জনভোগান্তি বাড়ছে। রাজধানীর দায়িত্বে থাকা ২৬ সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করার জন্য সিটি করপোরেশনের মেয়রের নেতৃত্বে সংস্থাগুলোর প্রধানদের নিয়ে প্রতি মাসে সমন্বয় সভা হওয়ার কথা থাকলেও তা ঠিক মতো হচ্ছে না। ফলে কোনো সংস্থা কখন, কোথায় কতটুকু কাজ করছে তা অন্যদের কাজের সাথে সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বছরজুড়ে জনদুর্ভোগ লেগেই থাকছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, যখন কোনো একটা এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজ চলে, তখন এর বিকল্প ব্যবস্থা না করে বৃহত্ এলাকা জুড়ে কাজ করলে জনদুর্ভোগ বাড়ে। আমাদের দেশের বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন ঠিকাদারকে কাজ ভাগ করে দিলেও তারা একসাথে কাজ ধরেন। আবার অনেক সময় বিভিন্ন সেবা সংস্থার কাজ একই সাথে চলে। এটা এড়াতে হবে।

প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি চিত্র: জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে রাজধানীর তেজগাঁও থেকে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১১টি ইউটার্ন নির্মাণ প্রকল্প এগুচ্ছে না বলে জানা গেছে। আগামী বছরের জুনে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৬ শতাংশ কাজ হয়েছে। ডিএনসিসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের জন্য যে জমি দরকার, তার পুরোটাই সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার। এ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে সময়মতো জমি পায়নি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা।

জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ১ হাজার ২১৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ আগামী বছরের জুন পর্যন্ত। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৫৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে হলে বাকি ৪৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে হবে পরবর্তী নয় মাসে। অন্যদিকে সংস্থাটির সাথে নবনিযুক্ত আট ইউনিয়নের শ্যামপুর, দনিয়া, মাতুয়াইল ও সারুলিয়া ইউনিয়নে সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ২০১৭ সালে ৭৭৩ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২০ সালের জুনে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৫৮ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউনিয়ন থেকে সিটি করপোরেশনে যুক্ত হওয়ায় বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে প্রকল্পে ধীরগতি।

অন্যদিকে মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল্ড উন্নয়নের একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। ৭২৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি ২০২০ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৫৫ শতাংশ। ঢাকা দক্ষিণের ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে ৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী বছরের জুনে। এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পের অগ্রগতি ৫৫ শতাংশ। ডেমরা, মান্ডা, নাসিরাবাদ ও দক্ষিণগাঁও এলাকার সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি প্রকল্প শুরু হয় চলতি বছরের জানুয়ারিতে। মেয়াদ ধরা আছে ২০২০ সাল পর্যন্ত। ৪৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজে টেন্ডার আহ্বান ছাড়া আর কোনো অগ্রগতি নেই।

উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, সংস্থাটির আওতাধীন এলাকায় এলইডি সড়কবাতি, সিসিটিভি কন্ট্রোল সেন্টার সরবরাহ ও স্থাপন শীর্ষক একটি প্রকল্পের আওতায় ৪০ হাজার আধুনিক এলইডি সড়কবাতি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। চলমান এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণে ২০১৬ সালের জুনে ১ হাজার ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পেরও অগ্রগতি ৬২ শতাংশ। ২০১৫ সালের জুন থেকে ৭৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্ট (ইউআরপি ডিএনসিসি অংশ) প্রকল্পের কাজ চলছে,  মেয়াদ ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি ইমার্জেন্সি অপারেটিং সেন্টার ও কয়েকটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অফিস স্থাপন করার কথা রয়েছে। বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতিও স্থাপন করা হবে এ প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পটির অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ৩০ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

চলতি বছরের জুনে শেষ হবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উন্মুক্ত স্থানগুলোর উন্নয়ন ও সবুজায়ন প্রকল্প। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২২টি পার্ক ও চারটি খেলার মাঠ উন্নয়ন, ১৫টি ফুটওভার ব্রিজ উন্নয়ন ও সৌন্দর্যকরণ, ৭৩টি স্বাস্থ্যকর পাবলিক টয়লেট নির্মাণ এবং চারটি কবরস্থানের উন্নয়ন কাজ করা হবে। ২৭৯ দশমিক ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে চলমান এ প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৮ শতাংশ।

অন্যদিকে ডিএনসিসির ‘ইসিবি চত্বর থেকে মিরপুর পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন এবং কালশী মোড়ে ফ্লাইওভার নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ চলমান আছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন এবং কালশী মোড়ে ৮৪৪ মিটার ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের মাধ্যমে মিরপুর, পল্লবী, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, উত্তরা ও মহাখালীর মধ্যে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতকরণ হবে। ৬১২ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের মেয়াদ আগামী বছরের জুন পর্যন্ত। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১০ শতাংশ।

২০১৭ সালের জুনে নেয়া গাবতলী সিটি পল্লীতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ক্লিনারদের জন্য বহুতলবিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের জুনে। ১৭৭ দশমিক ৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের মাধ্যমে সংস্থাটির পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য চারটি ১৫তলা আবাসিক ভবন ও একটি স্কুল নির্মাণের কথা রয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৬ শতাংশ।

সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, রাজধানীর অভিভাবক হিসেবে পরিচিত হলেও এর আওতাধীন অঞ্চলে সড়ক নির্মাণ ও মেরামত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিধন ও সৌন্দর্যবর্ধন ছাড়া তেমন কোনো দৃশ্যমান উন্নয়নে কার্যক্রম পরিচালনা করে না সিটি করপোরেশন। আবাসন সমস্যা, যানজট নিরসন, গ্যাস, পানি, বিদ্যুত্ সরবরাহ সংক্রান্ত রাজধানীর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলো সিটি কর্পোরেশনের হাতে নেই। ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও ঢাকা এনার্জি সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষসহ সব উন্নয়ন সংস্থা পৃথক মন্ত্রণালয়ের অধীন। এ কারণেই কোনো উন্নয়ন কাজ একক সিদ্ধান্তে করা সম্ভব হয় না। কাজের মধ্যে সমন্বয়ও থাকে না।

জানা যায়, রাজধানীর উন্নয়নে সাতটি স্বাধীন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র, রেল, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি, গণপূর্ত, সড়ক ও যোগাযোগ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া অর্থ, পরিকল্পনাসহ আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয় পরোক্ষভাবে ঢাকার উন্নয়নের অংশীদার। এ সব মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২৬টি সেবাদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

জনদুর্ভোগ এড়াতে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, যে কোনো প্রকল্প শুরুর সময় কী কী কাজ করলে জনদুর্ভোগ নিরসন হবে, সেটি যেন প্রকল্পের খরচের মধ্যে দেওয়া হয় এবং তা তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর বাধ্যবাধকতা থাকে। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে চলমান জুন মাসে প্রকল্প শেষ করার প্রক্রিয়াকে সরিয়ে ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে যেন নেয়া হয়। যাতে করে বর্ষাকালে শেষ মুহূর্তে কাজ শেষ করার তামাশা বন্ধ হয়।