দখল-দূষণে হুমকির মুখে বরিশালের অর্ধশত খাল

শাহীন হাফিজ, বরিশাল অফিস

বরিশাল সিটির অভ্যন্তরে একসময় প্রবহমান ছিল অর্ধশত খাল। এসব খাল দিয়ে চলত যাত্রীবাহী গয়না ও বজরা (পুরনো দিনের বিশেষ নৌযান), পণ্যবাহী নৌকা ও ট্রলার। কিন্তু দখলদারদের হাতে দখল হতে হতে এখন অনেক খালই আর নেই; রয়ে গেছে শুধু নাম। কলেজ রো’র খাল, ভাটার খাল, জেলখাল, সাগরদী খাল, বটতলা খাল, নাপিতখালি খাল, টিয়াখালি খাল, নথুল্লাবাদ খালসহ নগরীর অনেক খাল এখন ইতিহাস। বিভিন্ন সময়ে জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও ধারাবাহিকতা রক্ষা না হওয়ায় উদ্যোগগুলো সফলতা লাভ করেনি। নগরীর প্রবীণরা জানান, প্রশাসন বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে কোনো কোনো খালের কিছু অংশ অবৈধ দখলমুক্ত করলেও খালের পুরনো চেহারা ফিরছে না। এমনকি জোয়ার-ভাটায়ও পানি প্রবাহ হচ্ছে না এসব খালে। খালগুলো দখলদাররা ভরাট করে ফেলায় প্রতিবছর বর্ষায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।

জানা গেছে, ২০১৬ সালে জেলা প্রশাসক ড. গাজী সাইফুজ্জামান খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিলেও তা পরে আর বাস্তবায়িত হয়নি। সেই সময়ে বরিশাল সিটিসহ বিভিন্ন এনজিও জেলা প্রশাসকের ডাকে সাড়া দিলেও পরবর্তীতে তা রক্ষণা-বেক্ষণে এগিয়ে আসেনি কেউ। দখলমুক্ত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পরে ড. গাজী সাইফুজ্জামান ও বরিশাল সিটি থেকে খালগুলো রক্ষায় পৃথক প্রকল্প গ্রহণ করলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ফলে ফের খালগুলো দখলদারদের কবলে পড়ে। সরেজমিনে দেখা গেছে, অর্ধশত খালের অধিকাংশ স্থানেই রয়েছে দখলদারদের দৌরাত্ম্য। নগরীর রূপাতলী বটতলা মোড় মসজিদ সংলগ্ন চক্রবর্তীর খাল ভরাট করে বহুতল ভবন   নির্মাণের কাজ শুরুর অভিযোগ ওঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

স্থানীয়রা জানান, চক্রবর্তীর খালটি ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ। খালটি সরাসরি কীর্তনখোলা নদীতে গিয়ে মিশেছে। খালটির ভেতর স্থাপনা নির্মিত হলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে নগরে। এ ছাড়াও নগরীর বিভিন্ন খালের দু’পার্শ্বে প্রথমে ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করে ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভরাট শুরু করে। পরে আধাপাকা ও বহুতল ভবন নির্মাণ করে খালগুলোর অস্তিত্বই বিলীন করে ফেলা হয়। সাগরদী খালের কালুশাহ সড়ক অংশে ও নগরীর ২৩নং ওয়ার্ডের নওগাঁ মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন ভেদুরিয়া খাল দখল করে পাকা দোকানঘর তৈরি করছেন প্রভাবশালীরা। নগরীর বটতলা বাজার থেকে চৌমাথা পর্যন্ত বটতলা খাল এমনভাবে দখল করা হয়েছে, দেখে মনে হবে এখানে খালের অস্তিত্বই ছিল না। বটতলা হয়ে জিলা স্কুলের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভাটার খাল ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। জেল খালেরও দুই পাশে ফের গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্থাপনা। এই খালের শাখা নথুল্লাবাদ খালও দখল করে বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সাগরদী খালের দুই পাশে এমনভাবে দখল করা হয়েছে যে, বোঝার উপায় নেই এটি খাল ছিল। কাজীপাড়া খাল, সাগরদী খাল, টিয়াখালী খাল, জিয়া সড়ক খাল, আমানতগঞ্জ খাল, নবগ্রাম খাল, ভাটার খাল, কাশীপুর খাল, নাপিতের খাল, লাকুটিয়া খাল, চাঁদমারি খাল, পলাশপুর খালও ফের দখল হয়েছে।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আনিসুজ্জামান জানান, সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র নির্দেশনায় নগরীর ৪৬টি খাল ও ৩০টি পুকুর রক্ষায় একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বরিশাল পরিবেশবান্ধব নগরীতে পরিণত হবে। পাশাপাশি পর্যটন ও নৌপরিবহনেও গুরুত্ব বাড়বে। রোধ হবে নগরীর জলাবদ্ধতা। সাড়ে ৩ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৪৬টি খাল পুনঃখননের জন্য বরাদ্দ ধার্য করা হয়েছে ১২১ কোটি টাকা। ১০৯ কিলোমিটার এলাকার খালগুলোর দুই পাড়ের ২৩ কিলোমিটার স্থানে করা হবে সৌন্দর্য বৃদ্ধি। এজন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪৮০ কোটি টাকা। এছাড়া, বসার বেঞ্চ, ড্রেন, লাইট, ১৭টি আরসিসি ব্রিজ ও ৩০টি পুকুর সংস্কারের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৮৭ কোটি টাকা। নগরীর প্রবীণরা জানান, প্রতি বছরই দখলদাররা বর্ষা মৌসুমে পরিকল্পনা করে শুকনো মৌসুমে তা বাস্তবায়ন করে। এরা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ভোগ দখল করায় বিভিন্ন অভিযানে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে।