খেসারত দিয়েছি, আর ভোট বর্জন নয় :ড. কামাল

গণফোরাম সভাপতি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড.কামাল হোসেন বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমরা বয়কট করবো না। একবার নির্বাচন বয়কট করে ভুলের খেসারত এখনও দিতে হচ্ছে। তাই এবার নির্বাচন নিয়ে সরকার যতই ১০ নম্বরি করুক আমরা ভোট বর্জন করবো না। মহাজোট সরকারকে ‘ভাওতাবাজির সরকার’ অ্যাখ্যা দিয়ে ড. কামাল বলেন, এই সরকারকে ভাওতাবাজির জন্য গোল্ডমেডেল দেওয়া উচিত। দেশের মানুষকে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। আওয়ামী লীগ এই সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে বলেছিল- ২০১৪ সালের নির্বাচন পরিস্থিতির আলোকে নিয়েছি, দ্রুতই আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ৫ বছর পেরিয়ে গেল। দ্রুত কথার অর্থ যে ৫ বছর তা আমরা জানতাম না। ভাওতাবাজির সীমা থাকা উচিত। আমরা এখন ভাওতাবাজি থেকে মুক্তি পেতে চাই।

 গতকাল শনিবার সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত আইনজীবীদের মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের আয়োজনে সুপ্রিম কোর্ট বার প্রাঙ্গণে মহাসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক জয়নুল আবেদীন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও সানাউল্লাহ  মিয়ার সঞ্চালনায় মহাসমাবেশে বক্তব্য রাখেন- বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, দলের ও ফ্রন্টের নেতা ব্যারিস্টার মোহাম্মদ শাহজাহান ওমর, অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মীর নাসির উদ্দিন, এম এ রকীব, সুব্রত চৌধুরী, জগলুল হায়দার আফ্রিক প্রমুখ। এ সময় জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ব্যারিস্টার এ কে এম এহসানুর রহমান ছাড়াও দেশের ৫৪টি জেলার আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে ড.কামাল হোসেন বলেন, তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার কারামুক্তি চাই। যেখানে এতদিন পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে যাচ্ছে সেখানে খালেদা জিয়াকে, একটি বড় দলের নেত্রীকে পরিত্যক্ত জেলে রাখা হয়েছে। তাকে মুক্তি দিতে হবে। তাকে ছাড়াও হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে গণতন্ত্র ফিরে আসবে না, সংবিধান সমুন্নত থাকবে না। একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করবেন, অন্যজন জেলখানায় থাকবেন, এটা হতে পারে না।

ড. কামাল হোসেন বলেন, আমি মনে করি সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সংবিধানে আছে, দেশ শাসন করার সময় যাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়, তাদের দ্রুত পরীক্ষা করাতে হয়। আমি বলি, বোর্ড গঠন করে সাইকিয়াট্রিক দিয়ে এদের পরীক্ষা করা হোক।

ভোটযুদ্ধে নামুন: ফখরুল

আওয়ামী লীগের ‘অপশাসনের’ জবাব ভোটের মাধ্যমে দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, যখন আমাদের কোথাও দাঁড়াতে পারি না, যখন আমাদের কথা বলতে দেওয়া হয় না, যখন আমাদের নির্বাচনের জন্য ক্যাম্পেইন করতে দেয় না, আমাদের নেতা-কর্মীদের মিথ্যা ও গায়েবী মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে অথবা তারা পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন এই নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে আমরা এই দানবকে পরাজিত করব। আমাদের হাতে সময় খুব কম। যদি জাতিকে বাঁচাতে হয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে যদি বাঁচাতে হয়, আমাদের মানুষকে যদি বাঁচাতে হয়, আমাদের স্বাধীনতাকে যদি রক্ষা করতে হয়, তাহলে এই উপযুক্ত সময়। আসুন সবাই মিলে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোটযুদ্ধে নেমে পড়ি। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা তাদেরকে পরাজিত করি। আইনজীবী ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, নিপুণ রায় চৌধুরীর প্রসঙ্গ তুলে ফখরুল বলেন, এমন রাষ্ট্রে বাস করছি যে আইনজীবীরা পর্যন্ত মিথ্যা মামলায় নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ড. কামাল হোসেন এটা কোর্টে তুলেছেন, এখনও আমরা সুরাহা পাইনি। যেই তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে, তার পর থেকে এখন পর্যন্ত সাড়ে ৪শ গায়েবী মামলা হয়েছে। কীভাবে নির্বাচন করবেন? এভাবেই করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে ফখরুল বলেন, এই কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে করতে পারেনি, জাতীয় নির্বাচন কীভাবে সুষ্ঠু অবাধ করবে। নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে যে ফলাফল হয়, আগে সেই কেন্দ্রেই ফলাফল ঘোষণা করা হত। আমরা শুনতে পাচ্ছি, জানি না এটা সঠিক নাও হতে পারে, সেটা না কি বদলিয়ে দিয়ে তারা সেন্টারে নিয়ে যাবে। আমরা বলতে চাই, কেউই মানবে না। আমরা সাবধান করে দিচ্ছি নির্বাচন কমিশনকে, এটা করতে পারবেন না। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করুন, সকলকে সমান সুযোগ দিতে হবে, অন্যথায় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না।

সমাবেশে উপস্থিত বক্তাদের আলোচনা থেকে গৃহীত ১১টি সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। সিদ্ধান্তগুলো হলো:১. বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি, ২. খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সব ফরমায়েশি সাজা বাতিল, ৩. বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজানো মিথ্যা মামলাসহ সব রাজনৈতিক সাজা বাতিল, ৪. জামিনযোগ্য অপরাধে আগত বিচারপ্রার্থীরা বিচার থেকে বঞ্চিত, ৫. মাসদার হোসেন মামলার আলোকে গেজেট সংশোধন, ৬. প্রভাবমুক্ত থেকে নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান, ৭. দেশের আইনজীবী ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবী, ভুয়া ও রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার, ৮. দেশের আইনজীবী ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের মুক্তি, ৯. বাকস্বাধীনতা হরণকারী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮সহ সব কালো আইন বাতিল, ১০. একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার স্থগিত, সংবাদকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে সংবাদ পরিবেশনে বিধিনিষেধ আরোপ বাতিল এবং বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং ১১. মানবাধিকারের সাংবিধানিক ‘অধিকার’ রক্ষা করতে হবে।