কোভিডের তৃতীয় ঢেউ ও আগাম সতর্কতা

ভোট ও ভোট-প্রচারের সুযোগে পশ্চিম বাংলায় বিধ্বংসী রূপ নিয়েছিল কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ। ফের একই রকম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে শারদোৎসবকে ঘিরেও। অন্তত জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপার্ট তেমনই বলছে। রিপার্টে বলা হয়েছে, অক্টোবরে কোভিডের তৃতীয় ঢেউ সবচেয়ে বিধ্বংসী আকার নেবে। প্রতিদিন প্রায় ৪-৫ লাখ মানুষ সংক্রমিত হবে। সেই তালিকায় প্রাপ্তবয়সিদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যায় শিশুও থাকবে।

এই রিপোর্টে বাংলার আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখা দিতে শুরু করেছে। পুরো শরত্কাল জুড়েই বাংলায় উৎসবের আবহ চলে। গত বছরও কোভিড-আতঙ্কে নমঃ নমঃ করে দুর্গা, লক্ষ্মী, কালী, জগদ্ধাত্রীর আরাধনা হয়েছে। এবারও শরতের নীল আকাশে একই রকম কোভিডের মেঘ দেখা দিয়েছে।

এ বছরে বাড়তি আতঙ্ক শিশুদের নিয়ে। কারণ শিশুদের চিকিৎসার জন্য যত সংখ্যক চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসা-সরঞ্জাম ও পরিকাঠামো দরকার তা দেশের প্রায় কোনো রাজ্যেই নেই। এই বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশেষজ্ঞ কমিটি।

যদিও বিশেষজ্ঞ কমিটির সতর্কবার্তা পাওয়ার আগেই এ বিষয়ে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য দপ্তর। ইতিমধ্যে এই রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরে এই সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতি জেলায় পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, সিক নিওন্যাটাল কেয়ার ইউনিট, পেডিয়াট্রিক এইচডিইউতে বেড বাড়ানোর পাশাপাশি পরিকাঠামো, চিকিত্সাসামগ্রী, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার, নার্সের জোগান রাখার পরিকল্পনা তৈরি।

২-১১ বছর বয়সিরা কবে স্কুলে অথবা খেলার মাঠে যেতে পারবে, সে বিষয়ে এখনই কোনো আশার বাণী শোনাতে পারছেন না ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞরা। তবে অল্প কিছু দিনের মধ্যে ১২-১৮ অনূর্ধ্বদের জন্য সুখবর আসতে চলেছে। আর জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখা নয়, বরং ভ্যাকসিনের ডোজ শেষে হইহই করে করে বেরিয়ে পড়ার সময় চলে এসেছে। কারণ এই প্রথম দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে সঙ্গে ১২ বছরের ঊর্ধ্বে কিশোর-কিশোরীরাও কোভিড ভ্যাকসিন পাবে। করানোর বিরুদ্ধে লড়াই আরো জোরালো করতে ভারত সরকার অনুমোদন দিল তিন ডোজের ভ্যাকসিনকে।

এই ভ্যাকসিন সব দিক থেকেই স্বতন্ত্র, এমনই দাবি প্রস্তুতকারী সংস্থার। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, এটি বিশ্বের প্রথম DNA ভ্যাকসিন। জাইডাস ক্যাডিলার দাবি, এটি দেহে খুব তাড়াতাড়ি অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সাহায্য করবে। শুধু তা-ই নয়, ভ্যাকসিন নিতে কোনো সুচ ফোটানোর প্রয়োজন নেই। নিডল ফ্রি অ্যাপলিকেটরের মাধ্যমে শরীরে এই ভ্যাকসিন প্রবেশ করবে। তাই যাদের সুচে ভীতি রয়েছে তাদের কাছে এটাই হবে প্রথম চয়েজ। তবে অন্য ভ্যাকসিনের মতো দুটো ডোজে কাজ মিটবে না। ২৮ দিন অন্তর দিতে হবে মোট তিনটি ডোজ।

১২ বছরের ওপরে সব বয়সের মোট ২৮ হাজার মানুষকে নিয়ে এই ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হয়েছে। এখনো পর্যন্ত এফিকেসি রেট মিলেছে ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। পরীক্ষায় ১২-১৮ বছর বয়সিরা অংশ নিলেও এখনো পর্যন্ত তাদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি ভারত সরকার।

জোগানের অভাবে দু-তিন দিন কোভ্যাকসিনের টিকাকরণ বন্ধ থাকায় অনেকেরই কপালে ভাঁজ পড়েছিল। বিশেষ করে, যারা ইতিমধ্যেই ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নিয়েছেন। ২৮ দিন পরে দ্বিতীয় ডোজ পাবেন কি পাবেন না, সেই চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছিল। স্বাস্থ্য দপ্তরের সাম্প্রতিক নির্দেশিকায় এবার তাদের উদ্বেগ অনেকটাই কমবে। স্বাস্থ্য দফতরের তরফে বলা হয়েছে, কোভ্যাকসিনের সরবরাহ কম থাকায় আপাতত প্রথম ডোজ বন্ধ থাকবে। প্রথম ডোজ নেওয়ার পর যাদের ২৮ দিন পেরিয়ে গিয়েছে, আপাতত কোভ্যাকসিনে তাদের অগ্রাধিকার।

একে ভারত বায়োটেকের জোগানে ঘাটতি, তার ওপর দুটো ডোজের মধ্যে মাত্র ২৮ দিনের ব্যবধান। সব মিলিয়ে কোভ্যাকসিনের অভাব বেশ প্রকট চেহারা নিয়েছে। তবে যা-ই হোক, সমস্যার সমাধানে বলা হয়েছে, যত দিন না পরবর্তী নির্দশিকা জারি হচ্ছে, ততদিন কোভ্যাকসিনের স্বল্প জোগান থেকে কেবল দ্বিতীয় ডোজই দেওয়া হবে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইমিউনোলজি আরো স্পেসিফিক হয়েছে। ইন্টারফেরনকে আলফা, বিটা, গামা খ টাইপ-১, টাইপ-২, খ একাধিক ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। একেক রকম ইন্টারফেরনের কাজও ভিন্ন। সব সময় প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্যনির্বিশেষে যে কোনো ইন্টারফেরন যে কোনো ভাইরাসের রেপ্লিকেশনে ইন্টারফেয়ার করবে, এমনটা নয়।

এক্ষেত্রে কমন ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস আর করানো ভাইরাস এক গোষ্ঠীভুক্ত নয়। ফলে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসকে ঠেকাতে নির্গত ইন্টারফেরন সার্স কোভ-২ প্রতিহত করতে পারবে, এমন কোনো পরীক্ষিত তথ্য আমাদের হাতে নেই। বিজ্ঞান যেহেতু প্রামাণ্য তথ্য চায়, তাই নিছক অনুমানের ওপর নির্ভর করে এখনই আশাব্যঞ্জক কোনো কথা বলা যাচ্ছে না। কমন ফ্লুর বাড়বাড়ন্ত কোভিডের তৃতীয় ঢেউকে রুখে দেবে, তেমন ভরসাও নেই।

তবে সাধারণ করানো ভাইরাস, যা সর্দি-কাশি করায়, আগে সেই সংক্রমণ হলে পরবর্তীকালে নোভেল করোনা ভাইরাসের দাপট কিছুটা হলেও কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে শুধু ইন্টারফেরন নয়, দেহকোষ থেকে এমন কিছু নন স্পেসিফিক প্রোটিন (লাইসোজাইম, লেকটিনস, ট্রান্সফারিন, সি-রিয়্যাকটিভ প্রোটিন, ডিফেন্সিন) নির্গত হয়, যা সমগোত্রীর সার্স কোভ-২-এর রেপ্লিকেশনে নাক গলাতে পারে। তবে এর কোনোটা নিয়েই নির্দিষ্ট প্রামাণ্য তথ্য নেই। উলটোদিকে আরো একটা আশঙ্কা রয়েছে, যে কোনো (বিশেষত ভাইরাস) সংক্রমণে দেহের প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। সেই সুযোগে সার্স কোভ-২ সংক্রমণ হলে তা দুর্বল শরীরে অনেক বেশি আগ্রাসি হতে পারে। ইমিউনোলজি বলছে, স্বাভাবিক মানুষের ক্ষেত্রে এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ প্রথম সংক্রমণে শরীর দুর্বল হলেও রোগপ্রতিরোধী ক্ষমতা সজাগ হয়ে থাকে। যা আখেরে আমাদের হয়েই কাজ করবে।

তবে কমন ফ্লু নিয়ে যে আশার আলো মানুষ দেখতে চাইছেন, সে প্রসঙ্গে বলব, প্রকৃতিতে সব সময়ই ইনফ্লুরেঞ্জা ভাইরাস রয়েছে। সিজন চেঞ্জের সময় তাদের সক্রিয়তা বাড়ে। কিন্তু আমাদের অসাবধানতার কারণে কোভিড সংক্রমণ যখন বাড়ে তখন সেই চর্চার মধ্যে কমন ফ্লু থেকে মানুষের নজরটা সরে যায়। আবার লকডাউন বা অন্য সচেতনতার কারণে কোভিড সংক্রমণ একটু নিয়ন্ত্রণে থাকলে তখন কমন ফ্লু সংক্রমণ মানুষের চোখে পড়ে। মোটের ওপর এই মুহূর্তে প্রকৃতিতে কমন ফ্লু ও সার্স কোভ-২, দু-ই আছে। কেউই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি।

যদিও সবশেষে আবারও বলব, এই সবই ইমিউনোলজির সাধারণ ধারণা থেকে মনে করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট এই বিষয়গুলোর ওপর এখনো কোনো প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই সার্বিকভাবে একটা ধারণা করা গেলেও নিশ্চিতভাবে বলার মতো সময় এখনো আসেনি।

কোভিডের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধে জয়লাভের পর কিছুটা হলেও আত্মতুষ্টি দেখা দিয়েছিল দেশ এমনকি রাজ্যবাসীর মধ্যে। স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেও ঢিলেঢালা ভাব লক্ষ করা গিয়েছিল। সেই সুযোগ নিয়েই ছদ্মবেশে আরো শক্তিশালী হামলা চালায় অদৃশ্য শত্রু করোনা ভাইরাস। স্বাভাবিকভাবে ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে প্রচুর। এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নিতে চলেছে রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর। দ্বিতীয় যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই তৃতীয় যুদ্ধের সম্ভাব্য যুদ্ধপ্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিডের তৃতীয় ঢেউ মূলত আছড়ে পড়বে শিশুদের ওপর। প্রথম ঢেউয়ের তুলনায় দ্বিতীয় ঢেউয়ে শিশুদের সংক্রমিত হওয়া এবং একই সঙ্গে গুরুতর অসুস্থতার পরিসংখ্যান অনেকটাই বেশি। তৃতীয় ঢেউয়ে ঊর্ধ্বমুখী এই গ্রাফই নাকি অব্যাহত থাকবে। তাই ইতিমধ্যে এই রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরে এই সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, সিক নিওন্যাটাল কেয়ার ইউনিট, পেডিয়াট্রিক এইচডিইউতে বেড বাড়ানোর পাশাপাশি পরিকাঠামো চিকিত্সাসামগ্রী, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার, নার্সের জোগান রাখার পরিকল্পনা তৈরি।

লেখক: ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক

ইত্তেফাক/কেকে