মেল্টিং পট: যুক্তরাষ্ট্রের মহাসমৃদ্ধির রসায়ন

ধাতুবিদ্যার ভাষায় ‘মেল্টিং পট’ হলো এমন একটি পাত্র, যেখানে বিভিন্ন ধাতু একসঙ্গে গলে একটি নতুন সংকর ধাতু তৈরি করে । আমেরিকার সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাসে এই উপমার অর্থ আরো গভীর । এখানে ইংরেজ, আইরিশ, জার্মান, ইতালীয়, ইহুদি, পোলিশ, চীনা, জাপানি, ভারতীয়, মেক্সিকান, কিউবান, ভিয়েতনামি কিংবা আফ্রিকান—সকলেই নিজের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সঙ্গে নিয়ে এসেছেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা মিলে গড়ে তুলেছেন একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়—আমেরিকান

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৪

পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্রের জন্ম একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, ভাষা কিংবা জাতিগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্মকাহিনি ভিন্ন। এই রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কোনো একক জাতি নয়, কোনো একক ভাষাও নয়। বরং এটি এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ নিজেদের অতীতের একটি অংশ হারিয়ে এবং ভবিষ্যতের একটি অংশ নির্মাণ করে নতুন এক জাতিসত্তার জন্ম দিয়েছে।

এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়—'মেল্টিং পট'। ধাতুবিদ্যার ভাষায় ‘মেল্টিং পট' হলো এমন একটি পাত্র, যেখানে বিভিন্ন ধাতু একসঙ্গে গলে একটি নতুন সংকর ধাতু তৈরি করে। আমেরিকার সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাসে এই উপমার অর্থ আরো গভীর। এখানে ইংরেজ, আইরিশ, জার্মান, ইতালীয়, ইহুদি, পোলিশ, চীনা, জাপানি, ভারতীয়, মেক্সিকান, কিউবান, ভিয়েতনামি কিংবা আফ্রিকান— সকলেই নিজের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সঙ্গে নিয়ে এসেছেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা মিলে গড়ে তুলেছেন একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়— আমেরিকান।

এই পরিচয়ের ভিত্তি রক্তের বিশুদ্ধতা নয়; নাগরিকত্বের চুক্তি। স্বাধীনতার পরপরই ইউরোপ থেকে অভিবাসনের নতুন ঢেউ শুরু হয়। ১৮৪০-এর দশকে আয়ারল্যান্ডের ভয়াবহ আলুর দুর্ভিক্ষ লক্ষ লক্ষ মানুষকে মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য করে। একই সময়ে জার্মানির রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যর্থ বিপ্লব বহু শিক্ষিত মানুষকে আটলান্টিকের ওপারে ঠেলে দেয়। উনিশ শতকের শেষ ভাগে ইতালি, পোল্যান্ড, রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের অসংখ্য মানুষ আমেরিকায় এসে পৌঁছান। কেউ ক্ষুধা থেকে পালিয়ে, কেউ ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে, কেউ আবার স্বাধীন জীবনের আশায়।

তাদের অনেকেই প্রথম যে স্থাপনাটি দেখতেন, সেটি ছিল নিউইয়র্ক বন্দরের এলিস আইল্যান্ড। কোটি কোটি অভিবাসীর কাছে এটি ছিল যেন পৃথিবীর পুরোনো জীবন থেকে নতুন জীবনের সেতুবন্ধ। পেছনে রয়ে যেত দারিদ্র্য, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ কিংবা স্বৈরতন্ত্র; সামনে অপেক্ষা করত অনিশ্চয়তা, কিন্তু সেই অনিশ্চয়তার নামই ছিল সম্ভাবনা।

অবশ্য এই ইতিহাস একরৈখিক নয়।
যে রাষ্ট্র অভিবাসীদের হাতে গড়ে উঠেছিল, সেই রাষ্ট্রই কখনো কখনো নতুন অভিবাসীদের জন্য দরজা বন্ধ করেছে। ১৮৮২ সালের Chinese Exclusion Act প্রথম বারের মতো নির্দিষ্ট একটি জাতিগোষ্ঠীর অভিবাসন প্রায় নিষিদ্ধ করে। ১৯২৪ সালের জনসন-রিড আইন আবার জাতিগত কোটার মাধ্যমে দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপ এবং এশিয়া থেকে অভিবাসন কঠোরভাবে সীমিত করে। অর্থাৎ আমেরিকার ইতিহাসে উদারতা যেমন আছে, তেমনি আছে ভয়, সংকীর্ণতা এবং আত্মবিরোধও। কিন্তু ইতিহাসের চাকা শেষ পর্যন্ত অন্যদিকে ঘুরেছে।

১৯৬৫ সালের “Immigration and Nationality Act” পুরোনো জাতিগত কোটা বাতিল করে দেয়। সেই এক সিদ্ধান্ত যেন আমেরিকার দ্বিতীয় নবজন্ম। এরপর এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকা থেকে নতুন অভিবাসনের ঢেউ শুরু হয়। ভারতীয় প্রকৌশলী, চীনা গবেষক, কোরীয় উদ্যোক্তা, ভিয়েতনামি চিকিৎসক, নাইজেরীয় অধ্যাপক, বাংলাদেশি ব্যবসায়ী—পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সমাজের প্রতিনিধিরা নতুন করে আমেরিকার মানচিত্রে নিজেদের নাম লিখতে থাকেন।

আজকের যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের পেছনেও এই অভিবাসনের গভীর ছাপ রয়েছে। সিলিকন ভ্যালির অসংখ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বা প্রধান নির্বাহীদের মধ্যে অভিবাসী কিংবা অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের সংখ্যা বিস্ময়কর। নোবেল পুরস্কারজয়ী গবেষকদের একটি বড় অংশও বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হার্ভার্ড, এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড কিংবা নাসার গবেষণাগারে পৃথিবীর নানা ভাষার উচ্চারণ একসঙ্গে মিশে যায়—কারণ প্রতিভার কোনো পাসপোর্ট নেই।

এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সম্পদ হয়তো তার তেল, গ্যাস বা উর্বর ভূমি নয়; বরং পৃথিবীর সেরা মেধাকে আকর্ষণ করার বিরল ক্ষমতা।

তবু অভিবাসন প্রশ্নে বিতর্ক আজও থামেনি। সীমান্ত, নাগরিকত্ব, অবৈধ অভিবাসন কিংবা জাতীয় পরিচয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত রাজনৈতিক সংঘাত দেখা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিতর্ক আরো তীব্র হয়েছে। কিন্তু সেই বিতর্কের মধ্যেও ইতিহাস নীরবে একটি প্রশ্ন তুলে ধরে—যে রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনো সময়ে অভিবাসী ছিল, সে রাষ্ট্র কি কখনো সম্পূর্ণভাবে অভিবাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে?

সমাজবিজ্ঞানীরা অবশ্য আজ আর শুধু ‘মেল্টিং পট' শব্দটি ব্যবহার করেন না। তাদের অনেকেই বলেন, আধুনিক আমেরিকা বরং একটি 'স্যালাড বোল'—যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি একেবারে গলে যায় না; বরং নিজস্ব স্বাদ ও রং বজায় রেখেই একটি বৃহত্তর সমাজের অংশ হয়ে ওঠে। নিউ ইয়র্কের চায়নাটাউন, লিটল ইতালি, কুইন্সের দক্ষিণ এশীয় পাড়া কিংবা লস অ্যাঞ্জেলেসের লাতিন আমেরিকান সম্প্রদায় তারই উদাহরণ।

তবু একটি বিষয় অপরিবর্তিত রয়েছে। ভাষা, ধর্ম, বর্ণ কিংবা খাদ্যাভ্যাসে যত পার্থক্যই থাকুক, সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং স্বাধীনতার আদর্শই শেষ পর্যন্ত তাদের একত্র করে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীকের ওপর উৎকীর্ণ লাতিন বাক্যটি—E Pluribus Unum, অর্থাৎ 'বহুর মধ্য থেকে এক’—শুধু একটি রাষ্ট্রীয় মন্ত্ৰ নয়; এটি আমেরিকার আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা।

সম্ভবত এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস পড়লে মনে হয়, এই দেশটি কেবল একটি ভূখণ্ড নয়; এটি এক চলমান নির্মাণপ্রক্রিয়া। প্রতিটি নতুন অভিবাসী যেন সেই নির্মাণের আরেকজন স্থপতি। কেউ নিয়ে আসে শ্রম, কেউ পুঁজি, কেউ শিল্প, কেউ বিজ্ঞান, কেউ আবার শুধু একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নগুলোর সম্মিলিত রূপই আজকের আমেরিকা।

এক অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাস এখনো শেষ হয়নি। কারণ দেশটি প্রতিটি নতুন প্রজন্মের হাত ধরে নিজেকে আবারও নতুন করে আবিষ্কার করে। তাই তার প্রকৃত শক্তি কেবল সামরিক ক্ষমতায় নয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতেও নয়; তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—পৃথিবীর বিচিত্র মানুষকে এক অভিন্ন ভবিষ্যতের কল্পনায় বিশ্বাস করানোর অসাধারণ ক্ষমতা।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন