মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম চিকিৎসা। এ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হিমসিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। সরকারের স্বাস্থ্যবিভাগসহ চিকিৎসকরা পড়েছেন নানা আলোচনা-সমালোচনায়। আবার করোনা মহামারিকালীন চিকিৎসাসেবায় কেউ কেউ চিকিৎসার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছেন, দেশজুড়ে কুড়িয়েছেন সুনাম। দেশের এই চিকিৎসাসেবার হালচাল নিয়ে ইত্তেফাক অনলাইনের চার পর্বের বিশেষ প্রতিবেদন। আজ থাকছে শেষ পর্ব।
চিকিৎসক রোগীর পক্ষে অবস্থান নিবেন, বেসরকারি হাসপাতালের পক্ষ নিবেন, ওষুধ কোম্পানির অনুরোধ রাখবেন না কি নিজের হয়ে অবস্থান নিবেন। তাই প্রশ্ন জাগতেই পারে চিকিৎসক আসলেই কার?
মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর খুব কাছের মানুষজনরা যখন চলে যায়, তখন পাশে থাকেন চিকিৎসকরা। গত এক বছরে হাসপাতালগুলোয় তারা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজেরা আক্রান্ত হয়েছেন, পরিবারকেও আক্রান্ত করেছেন। তবু দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি চিকিৎসকরা। অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএর) সর্বশেষ (২৮ আগস্ট পর্যন্ত) তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে মারা গেছেন ১৮৬ জন চিকিৎসক।
গত এক বছরের বেশি সময় করোনার ভয়াবহতা চলছে তার আপন গতিতে, তাণ্ডবলীলা চালিয়ে যাচ্ছে সারাবিশ্বে। যেহেতু করোনা সম্পূর্ণ একটি নতুন রোগ, তাই শুরুতে এর চিকিৎসা এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক এবং জনগণের মাঝে ভয়-ভীতি ছিল।
শুরুতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিরুদ্ধে রোগী এবং তার স্বজনদের অভিযোগ ছিল অনেক। যেমন চিকিৎসকরা রোগীর কাছে যান না, গায়ে হাত দেন না, রোগের কথা শোনেন না, ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন না, টেলিফোনে চিকিৎসা দেন ইত্যাদি। নার্সরা রোগীর সেবা পরিচর্যা ঠিকভাবে করেন না, ওষুধ খাওয়ান না, এমনকি অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী রোগীর খাবার-দাবার ঠিকমত দেন না।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি অনেক উন্নত। ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রথম সারির যোদ্ধা, তারা সব ভয় জয় করে জীবন বাজি রেখেই আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে, করোনাকালের পুরো সময় অভাবনীয় সেবা দিয়েছেন এবং দিয়ে চলেছেন। করোনার চিকিৎসায় বর্তমানে চিকিৎসকরা যথেষ্ট দক্ষ, অভিজ্ঞ, তাদের পারদর্শিতা সব মহলে প্রশংসিত।
করোনা সংক্রমণের শুরুতে ও গেল বছরের জুনে সংক্রমণ প্রতিরোধে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ছিল। পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাসামগ্রী (পিপিই) ও মানসম্মত মাস্কের সংকট ছিল। পাশাপাশি এগুলো ব্যবহারেও অসচেতনতা ছিল। যে কারণে বেশিসংখ্যক চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুর ঘটনাও বেশি ঘটেছে।
বিএমএর তথ্য ২০২১ সালের সর্বশেষ (২৮ আগস্ট পর্যন্ত) তথ্যানুযায়ী সারাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ১০৮ জন চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে দেশে ২ হাজার ২৭১ জন নার্স এবং ৪ হাজার ১৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাবেক অধ্যক্ষ বশির আহমেদ জানান, মহামারি করোনাভাইরাসে মানুষের সেবা দিতে গিয়ে নিজে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছি। আমার স্ত্রীও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এমনকি আমাদের একমাত্র মেয়ে আমাদের থেকে সংক্রমণ হয়ে সেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু আমরা মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি এবং যাব। এরপরও কিছু মানুষ আমাদের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ করে তা খুবই দুঃখজনক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চিকিৎসক জানান, মানুষের সেবা দিতে গিয়ে আমরা নিজেরা এবং আমাদের পরিবারের সদস্যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এরপরও আমরা মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। করোনাভাইরাসে চিকিৎসা দিতে গিয়ে আমাদের অনেক চিকিৎসক প্রাণ হারিয়েছেন। সরকার করোনাভাইরাসে প্রাণ হারানো এবং আক্রান্তদের বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করে কিন্তু বাস্তবে দেশে করোনায় প্রথম চিকিৎসক মৃত্যুবরণকারী সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মঈন উদ্দীন আহমদ ছাড়া আর কেউ প্রণোদনা পায়নি। অমরা এই প্রণোদনা আদৌ পাব কি না তা জানি না।
করোনা চিকিৎসায় চিকিৎসকদের প্রণোদনা নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসে এত চিকিৎসকের মৃত্যু স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। চিকিৎসকদের যেসব প্রণোদনা প্রাপ্য ছিল, তা পাননি। তবে সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন খুব শিগগিরই চিকিৎসকদের যেসব প্রণোদনা প্রাপ্য তা প্রদান করবে।’
চিকিৎসকদের কমিশন বাণিজ্য ও রোগীদের সেবা বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব লেজার সার্জারি এন্ড হসপিটালের মেডিকেল অফিসার ডা. সাদেক আল মাহমুদ বলেন, ‘সাধারণত কোন ওষুধের বিজ্ঞাপন গণমাধ্যমে প্রকাশ করা যায় না। তাই মেডিকেল প্রমোশন অফিসাররা আমাদের কাছে আসে তাদের কোম্পানির উৎপাদিত ওষুধের প্রমোশন করাতে। কিন্তু দিন শেষে প্রায় চিকিৎসক দেশের ভালো ওষুধগুলোই রোগীদের প্রেসক্রিপশনে লিখে থাকেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমারা এত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করি আমাদেরও পরিবার আছে। অনেকেই আমাদের নিয়ে অনেক কথা বলে যা ব্যথিত করে। যে যা বলুক রোগীর সেবাই আমাদের ধর্ম।’
চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা সাদিয়া ফারহানা বলেন, আমাদের যেমন পরিবার আছে। তেমনি চিকিৎসকদেরও পরিবার আছে। আমাদের যেমন অনেক কিছুতে বাধ্যবাধকতা আছে তেমনি চিকিৎসকদেরও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই আমাদের সবাইকে সমন্বয় করে চলতে হবে। পরিশেষে ডাক্তাররা আমাদের শেষ ভরসাস্থল।
স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) সভাপতি ডা. ইকবাল আর্সলান ইত্তেফাক অনলাইনকে জানান, ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন বাজি রেখেই আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে। করোনাকালের পুরো সময় সেবা দিয়েছেন এবং দিয়ে চলেছেন।
তিনি বলেন, ‘করানোর মহামারিতে সবার চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে আমাদের যত ডাক্তার মারা গেছেন তা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এতজন চিকিৎসক প্রাণ হারাননি। সমাজে সব পেশাতেই ভালো খারাপ আছে। স্বল্প সংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসকসমাজকে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।’
ইত্তেফাক/এসজেড/এমআর