মাদক আইনের অস্পষ্টতায় বিপাকে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আমদানিকারকরা

সারা দেশে হোমিও চিকিৎসায় ওষুধ সংকটে চিকিৎসক ও রোগীরা

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১০

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ফিনিশড ডোজেজ ডাইলিউশন আমদানি করা হলেও সংশোধিত মাদক আইনে অস্পষ্টতার কারণে বিপাকে পড়েছেন আমদানিকারকরা। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়াই এসব ওষুধ আমদানিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ায় আমদানি কার্যক্রম প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে। এতে প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে পড়েছেন চিকিৎসক ও রোগীরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত জটিলতা নিরসন না হলে দেশের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দেশের ওষুধ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স নেওয়ার নির্দেশ দেয়। চিঠিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধিত-২০২৬)-এর ১০ ধারার উপধারা ১-এর দফা 'গ' এবং ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর ৭৪ ধারা উল্লেখ করা হয়। তবে আমদানিকারকদের দাবি, ফিনিশড ডোজেজ ফর্মের ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি আইনে স্পষ্ট নয়। ফলে বিভিন্ন স্থানে লাইসেন্সের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ রাজস্ব দিতে হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে ১৬টি প্রতিষ্ঠান হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আমদানি করছে এবং প্রায় ২৬টি কোম্পানি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গত দুই বছর ধরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপে আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। উচ্চ আদালতে মামলা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে আবেদন করেও সমস্যার সমাধান হয়নি।

বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে প্রতিদিন চার শতাধিক রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন। কিন্তু সরবরাহ-সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন দোকানে ঘুরেও ওষুধ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন অনেক রোগী।

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন সেখ বলেন, '২০২৩ সালের ঔষধ ও কসমেটিকস আইনের ৭৪ ধারা অনুযায়ী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দেওয়া নির্দেশনায় হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ও ডোজেজ ফর্ম আমদানির বিষয়টি স্পষ্ট নয়। হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ও এর কাঁচামাল ইথাইল অ্যালকোহল চিকিৎসায় স্বল্পমাত্রায় ব্যবহৃত হলেও এগুলোকে মাদক হিসেবে গণ্য করে লাইসেন্স নেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। এই আইনের কারণে টিউমার, কিডনি ও হার্টের মতো জটিল রোগের বহু অত্যাবশ্যকীয় হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আমদানি প্রায় বন্ধ রয়েছে, যা চিকিৎসা সেবা ব্যাহত করছে। আইনে হোমিওপ্যাথিক ওষুধকে অব্যাহতি দেওয়া হলে চিকিৎসকরা সঠিকভাবে ওষুধ আমদানি করতে পারবেন এবং সাধারণ মানুষ কম খরচে নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাবে।'

গত ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ এবং স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবদের কাছে চিঠি পাঠান। এতে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংজ্ঞায় 'হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ব্যতীত' বাক্যটি সংযোজনের অনুরোধ জানানো হয়।

ডিএইচএমএস ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যান্ড মেডিসিনাল প্লান্ট ইমপোর্টার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. মো. মজিবুল্যাহ মজিব বলেন,

'হোমিও ওষুধকে মাদকদ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত করে জারিকৃত পত্র হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন ও ওষুধ আইনের পরিপন্থি। তাছাড়া ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অধীনে নিবন্ধিত এই চিকিৎসার ওপর পৃথকভাবে মাদক আইনের প্রয়োগ প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করবে এবং চিকিৎসা সেবা চরমভাবে ব্যাহত করবে।' হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এইচড্যাব) যৌথ প্রতিবাদ লিপিতে বলা হয়, হোমিওপ্যাথিক ফার্মাকোপিয়া অনুযায়ী মাদার টিংচার ও তরল পটেন্সি তৈরিতে অ্যালকোহল দ্রাবক ও সংরক্ষণকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরিমিত মাত্রায় ব্যবহৃত এসব ওষুধকে 'মাদক' হিসেবে গণ্য করা যায় না বলে সংগঠনটির দাবি।

অন্যদিকে, হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যান্ড মেডিসিনাল প্লান্ট ইমপোর্টার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ডা. মোস্তাক বিন হোসাইন বলেন, 'হোমিওপ্যাথিক ফিনিশড ডোজ ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে ড্রাগ রুলস, ১৯৪৬, ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ১৯৮২ এবং ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক। ভুলবশত মাদক আইনের তপশিলে অ্যালকোহলযুক্ত হোমিওপ্যাথিক ওষুধের উল্লেখ থাকায় হয়রানির সুযোগ তৈরি হয়েছে।' অবিলম্বে এ কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানান তিনি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, 'আইনগত বিধান ও বিধিমালা মেনেই আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করছি। গেজেট ও তপশিলে যা রয়েছে, তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে এ বিষয়ে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি অস্পষ্টতা বা যৌক্তিক জটিলতা থেকে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'

ইত্তেফাক/এএইচপি