টিকা নেওয়ার বয়স জটিলতা কাটবে কবে

করোনার টিকা নেওয়ার বয়স নিয়ে সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বিভিন্ন কর্মকর্তা একেক সময় একেক ধরনের কথা বলছেন। এরফলে বিভিন্ন বয়সী নাগরিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সমাজের জনস্বাস্থ্যবিদসহ বিভিন্ন স্তরের সচেতন ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে কারও সঙ্গে কারও সমন্বয় নেই। তাহলে টিকা নেওয়ার প্রকৃত বয়স আসলে কত?

দেশে টিকা নিবন্ধনের শুরুর দিকে ৫৫ বছর বয়সীদের টিকার জন্য নিবন্ধন করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরে নিবন্ধন কম হওয়ায় আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে টিকার আওতায় আনতে বয়সসীমা কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ওই সময় বয়স কমিয়ে ৪৪ বছর করা হয়। এরপর চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ২য় দফায় আবারও বয়স কমিয়ে ৪০ বছর করা হয়।

বয়স কমানোর ধারাবাহিকতায় গত ৮ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ড. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‌এখন থেকে ৩৫ বছর বয়সীরাও টিকার জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন।’ এরপর, গত ১৯ জুলাই করোনার টিকা নেওয়ার সর্বনিম্ন বয়স ৩০ বছর নির্ধারণ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। শুধু তাই নয়, এরপর  দেশে টিকার বেশকিছু চালান আসায় নিবন্ধনের বয়স আরও কমিয়ে আনা হয়। ২৯ জুলাই থেকে বয়স পঁচিশ হলেই টিকার জন্য নিবন্ধন করা যেতো। সুরক্ষা অ্যাপে ঢুকে টিকা নিবন্ধনের বয়সসীমা ২৫ বছর ও তদূর্ধ্ব দেখা যায়।
ড. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম

গত ২০ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম বলেন, ‘কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে সুরক্ষায় ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকার নিবন্ধন শুরু হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের করোনার টিকা নিবন্ধনের জন্য সুরক্ষা অ্যাপেও নতুন ক্যাটাগরি যুক্ত করা হয়েছে।’

এদিকে, স্কুল শিক্ষার্থীরা কোনো টিকা পাবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে ৪ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, তাদের বয়স ১৮ বছরের ওপরে হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী যেকোনো ধরনের টিকা দেওয়া যাবে। ১৮ বছরের নিচে যেসব শিক্ষার্থী আছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা ও অন্যান্য দেশে যেভাবে দেওয়া হচ্ছে, সেভাবেই তাদেরকে টিকা দেওয়া হবে।  

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক এ কথা বলার পর রবিবার (৫ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর ড. রোবেদ আমিন বলেন, ১৮ বছরের কম বয়সীদের আপাতত টিকা দেওয়া হবে না।  

একই দিন রবিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে শিক্ষা মন্ত্রী ডা. দিপু মনি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী আগে বলেছেন, ১৮ বছরের অধিক যারা তাদের সবাইকে টিকা দিয়ে দেই। সেই কার্যক্রম চলছে। ১২ বছরের অধিক যারা তাদেরও ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসি, সেটির ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কাজ করছে। যাদের এনআইডি আছে, তাদের নিবন্ধন করতে বলা হয়েছে। তারা পাবলিক, প্রাইভেট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাকি সাত কলেজের, সেটা দেখা হয়নি। কাজেই যেকোনো শিক্ষার্থীর বয়স যদি ১৮ বছরের ওপরে হয়, তার এনআইডি থাকলে এখনই তিনি নিবন্ধন করতে পারবেন। এখন তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা নিতে পারবেন। যার এনআইডি নেই, তার জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’


ডা. লেলিন চৌধুরী

টিকা প্রাপ্তির বয়স নির্ধারণ ও ভোগান্তি নিয়ে টিকাপ্রার্থী জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে টিকা নিবন্ধনের শুরুর দিকে ৫৫ বছর করা হলো, তারপর পর্যায়ক্রমে ৪০ বছর, ৩৫ বছর, ৩০ বছর, ২৫ বছর, এখন শুনি ১৮ বছর। টিকা নিয়ে দেশের একেক মন্ত্রী একেক কথা বলে যাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডে বোঝা যায়, কতটা সমন্বয়হীনতা চলছে দেশের স্বাস্থ্যখাত। টিকার বয়স নিয়ে ভোগান্তি আর সহ্য করা যাচ্ছে না।’

করোনা টিকা পাওয়ার বয়স নিয়ে একেক মন্ত্রী ও কর্মকর্তার একেক বক্তব্য সম্পর্কে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘করোনার টিকা নিয়ে শুরু থেকে সমন্বয়ের অভাব দেখা গেছে।  এমনকি জাতীয় সংসদের সংসদীয় কমিটিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। শুরু থেকেই টিকার মজুদ কত আছে, তার সঠিক সমন্বয় করে টিকা দিলে মানুষের ভোগান্তি হতো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন সরকারের মন্ত্রী-কর্মকর্তারা  করোনার টিকা নিতে নিবন্ধন করতে হচ্ছে সুরক্ষা ওয়েবসাইটে। তাতে দেখা দিচ্ছে জটিলতা। অনেকেই বুঝতে পারছেন না, ওটিপি (ওয়ানটাইম পাসওয়ার্ড) কিভাবে কোথায় বসাবেন। বিশেষ করে প্রযুক্তিতে যারা পিছিয়ে, তাদের অনেকেই নিবন্ধন জটিলতায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন টিকা থেকে।’

করোনার টিকার ভোগান্তি নিয়ে সংবাদকর্মী তাহসিন আহমেদ বলেন, ‘করোনার টিকার বয়স নিয়ে শুরু থেকে সাপ-লুডু খেলা হচ্ছে। বয়স নিয়ে একেক সময় একেক কথা বলছেন সরকারের একেক মন্ত্রী-কর্মকর্তা।  এতে আমরা বিভ্রান্ত হচ্ছি বার বার।’ তিনি বলেন, ‘এক মাস আগে টিকার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছি। কিন্তু এখনো কোনো ম্যাসেজ পাইনি। আমার পরিচিত অনেকেই করোনায় আক্রান্ত। এমন পরিস্থিতিতে নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে শঙ্কায় আছি। কবে, টিকা দিতে পারবো, তাও জানি না।’

টিকা প্রাপ্তির বয়স নিয়ে জটিলতা, ভোগান্তি সমন্বয় নিয়ে ইত্তেফাক অনলাইনকে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি ডা. ইকবাল আর্সনাল বলেন, ‘শুরু থেকে টিকা কার্যক্রম ঠিক ছিল বলা যায়। কিন্তু দিন যত যেতে থাকে, মানুষের ভোগান্তিও তত বাড়তে থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের ভোগান্তি কমাতে যার কাজ তাকে করতে হবে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কাজে যারা পারদর্শী, যারা এখানে মেধা শ্রম দেয়, তাদের পরামর্শ শুনতে হবে। মানতে হবে। ভোগান্তি কমাতে সব কাজের সমন্বয় করতে হবে।’
ডা. ইকবাল আর্সনাল
টিকাপ্রাপ্তির বয়স নির্ধারণ নিয়ে একেক মন্ত্রী-কর্মকর্তার একেক ধরনের বক্তব্য সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব লোকমান হোসেন মিয়াকে মোবাইলফোনে একাধিকবার কল দিলেও তারা রিসিভ করেননি।

ইত্তেফাক/এনই/এসজেড