শেষের সত্যটা কেউ জানে না

মার্কিন রহস্য ও সায়েন্স ফিকশন লেখক ফ্রেডরিক ব্রাউন পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট গল্পটি লিখছেন এভাবে—‘পৃথিবীর শেষ মানুষটি ঘরে বসে আছে। হঠাত্ সে শুনতে পেল দরজায় কেউ নক করছে!’

খুব অদ্ভুত একটা চিন্তা রেখাপাত করতে পারে কপালে। আরে! কেউ তো বেঁচে নেই একজন ছাড়া। তার পরও দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে? যদি তর্কের খাতিরে ধরেই নেওয়া যায় কেউ কড়া নাড়ছে, তবে সে কে হতে পারে? কোথা থেকে এলো? এমন নানা ভাবনার ঘোর ঝিমধরা মাথায় ভর করতে পারে। লেখকেরাও যেন কেমন, মানুষকে চিন্তার সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে শেষটা আর বলতে চায় না। মানুষের ভেতরে শেষটা না জানার অস্থিরতা তৈরি করে। আবার মানুষকে নিজের মতো করে শেষটা ভাবার সুযোগ করে দেয়। তার পরও শেষটা অধরাই থেকে যায়। এমন করে শেষটা হয়তো আর কখনোই বলা হয় না। বিশাল জনসমমুদ্রে দাঁড়িয়ে উচ্চাঙ্গসংগীত উত্সবে বক্তব্য দিচ্ছিলেন শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী। তাঁর শেষ বাক্য ছিল, ‘আমার আর একটি কথা আছে।’ কিন্তু সেই শেষ কথাটি বলার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন তিনি। আলোঝলমল মূল মঞ্চে দাঁড়িয়ে জীবনের অনেক গভীর কথা বললেও কী যেন বলতে গিয়েও আর বলা হলো না। শেষটা এমন করেই রহস্য হয়ে অসমাপ্ত উপসংহার টানতে দেয় না কখনো। আহা! সেটা যদি জানা যেত! একটা অতৃপ্ত আত্মা এভাবেই মানুষের জীবনকে তাড়িয়ে বেড়ায় সারা জীবন। মানুষের জীবনটা বুঝি এমনই, যেখানে জীবনের ছায়াটা অনেক বড় হয়ে মানুষের ছায়াকে খেয়ে ফেলে। যে ছায়ায় লুকোচুরির খেলা থাকে, আলো-আঁধারের জাদু থাকে। একটা শেষের কবিতা থাকে। যেমন কেউ কেউ ভেবেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ একটি অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প! যেখানে প্রেম আছে, বিরহ আছে, বিচ্ছেদ আছে। তবে শেষটা কী, তা জানা নেই। কেমন যেন গোলকধাঁধার মতো সবকিছু। মনে হয় সব আছে, অথচ কিছুই নেই। শেষটা যত অপূর্ণ থাকবে, মানুষের চিন্তাও তত পূর্ণতা পাবে। সীমার মাঝে অসীমতাকে দেখার গভীর তত্ত্ব পাবে। যে তত্ত্বটা খোলা বইয়ের মতো, অথচ তার কালো অক্ষরগুলো ঘুমন্ত থাকে। যেটা অনেকটা ডিমের ভেতরের নরম অংশের মতো। সেটা কখন ডিমের কঠিন আবরণ ভেদ করে বেরিয়ে আসবে বলা খুব অনিশ্চিত। মৃত্যুর আগে অনেকেই শেষ কথা বলেছেন। তবে শেষটা কি বলতে পেরেছেন? কারণ শেষের শেষ থাকে, তারও শেষ থাকে। এমন করে শেষ হবে করে শেষটা কোথায় গিয়ে থামবে, সেটা কখনো জানা হয়ে ওঠে না। তার পরও তার একটা রেশ থাকে, যেটা মনকে ব্যাকুল করে, মনের ভেতরের মনকে পাগল করে, কিন্তু সেটা সারানোর মতো ওষুধ দিতে পারে না।

মৃত্যুর পূর্বে চিত্রশিল্পী সালভাদর দালির শেষ কথা ছিল, ‘আমার ঘড়িটি কোথায়?’ আমেরিকান কবি এমিলি ডিকিনসন তার শেষ বাক্যে বলেছিলেন, ‘কুয়াশা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমাকে যেতে হবে।’ চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি মৃত্যুর পূর্বে বলেছিলেন, ‘আমি স্রষ্টা ও মানুষকে অসন্তুষ্ট করেছি। কারণ আমার কাজ যতখানি চমত্কার হওয়া উচিত ছিল, ততখানি হয়নি।’ মৃত্যুর আগে সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘আমার মৃত্যুর সময় হয়েছে... আপনারা বেঁচে থাকবেন। কিন্তু আমি, নাকি আপনারা, কে যে ভালো জায়গায় থাকবেন, সেটা ঈশ্বর বাদে কেউ জানেন না।’ খুব অদ্ভুত শেষের কথাগুলো। যারা কথাগুলো বলে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, তারা হয়তো জানেন কেন তারা এমন কথাগুলো বলেছেন। মানুষ সেই কথাগুলো নিয়ে গবেষণা করতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে। তবে সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে যারা মৃত্যুর আগে কথাগুলো বলেছিলেন তাদের ব্যাখ্যা মিলবে কি না, তা বলা কঠিন।

জীবনের অনেক ছোট ছোট বাস্তব ঘটনা থাকে, যেগুলোর শেষ সমীকরণটা মেলানো যায় না। মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। খুব বিচিত্র হয় জীবনের খেলা। জীবনসংসারে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা না ঘটলেই হয়তো ভালো হতো। তার পরও ঘটে। যখন বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ থাকে, তখন সবকিছু যেন উলটো হয়ে যায়। ঘড়ির কাঁটাও বুঝি উলটো ঘোরে। তার পরও শেষের সত্যটা সামনে এসে পেছনের সত্যটাকে আঘাত করে।

একটা ক্যানসার আক্রান্ত মানুষ জানে সে আর বেশি দিন বাঁচবে না। তার পরও বাঁচার স্বপ্ন দেখে সে, নিজের জন্য নয়, সংসারের জন্য। কখনো কখনো এমন সময় আসে, যখন মানুষ নিজের জন্য বেঁচে থাকে না, অনেকগুলো মায়াবী মুখকে বাঁচিয়ে রাখবে বলে তারা বেঁচে থাকতে চায়। মায়ার বন্ধনটা বুঝি এমনই, যেটা বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। সেই স্বপ্ন, স্বপ্নের অসমাপ্ত উপসংহার টানাটা বোধ হয় খুব কঠিন। তার পরও পর্দা তো টানতে হয়। খোলা জানালা বন্ধ করতে হয়। নিভিয়ে দিতে হয় মহাজাগতিক আলো। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাত।

একজন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা, যিনি বয়সের ভারে বিছানায় দীর্ঘদিন পতিত জমির মতো পড়ে আছেন। তিনি জানেন এই বিছানায় তার একদিন মৃত্যু হবে। মানুষ যখন এমন অসহায় হয়, তখন মানুষ কল্পনা করে—যদি সে আবার নতুন করে জীবন ফিরে পেত, তবে ফেলে আসা যাপিত জীবনটা নতুন করে সাজাত। আবার শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যকে আগুনের মতো করে জ্বালিয়ে স্বপ্নের তারাবাতি ওড়াত। শেষের উপন্যাসটা নতুন করে লিখত। কিংবদন্তি কথাশিল্পীর মতো। জীবন্ত সমুদ্রের মতো।

যে মা একটা অবুঝ শিশুকে রেখে মারা যান, সেই মায়ের স্বপ্নকে কেউ কখনো মনে রাখে না। যে বাবা সন্তানের মুখ চেয়ে আগামী দিনের স্বপ্ন দেখেন, সেই বাবা যখন হারিয়ে যান, তখন স্বপ্নগুলোও মরে যায়। যে স্বামী তার প্রিয়তমাকে বলেছিল, তুমি ছাড়া আমি বাঁচব না, সেই প্রিয়তমা যখন মরে যায়, তখন আরেক প্রিয়তমা বেনারসি শাড়ি পরে সংসারে আসে। আগের প্রিয়তমা হারিয়ে যায় নতুন প্রিয়তমার আগমনে। নতুন প্রিয়তমা তখন আবার প্রাণপ্রিয় হয়ে ওঠে। সব যেন সময়ের খেলা। যে খেলায় এর ঠিক উলটোটাও ঘটে, উলোটপালট হয় সবকিছু। নদী ভাঙে, নদী গড়ে। সয়েল এরোশন নিয়ে গবেষণার পর গবেষণা হয়। খাতার পর খাতা ভরে যায়। শেষটাকে তার পরও ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। শেষটা শেষের মতোই থেকে যায়। এখন তো পৃথিবী আরো রঙিন হয়েছে। সেই পৃথিবীর রং শেষটা কারারুদ্ধ করে একটা ঝাপসা দেওয়াল তৈরি করেছে। যে দেওয়ালে ইট-পাথরের গাঁথুনি নেই, আছে মানুষের ভোগ, বিলাসিতা, অবৈধতা, অনৈতিকতা। যেখানে সম্পর্কের কোনো নাম নেই, ঠিকানা নেই।

খুব কঠিন এই পৃথিবী, যেখানে শুরুর গল্পটা সবাই দেখে, শেষের গল্পটা কেউ দেখতে চায় না। মানুষের কাছে মানুষ মূল্যবান হয় তার অর্জনে, ত্যাগে নয়। অথচ অর্জনের আগে ত্যাগের সত্যটাকে মানুষ যদি দেখতে পেত, তবে শেষটা শেষের সব রহস্য ভেদ করে চিরসত্য হয়ে উঠত। সেটাও বলি কী করে? সত্যের খেলাও যে খুব কঠিন আর নির্মম। অনেকটা দাবার ঘুঁটির মতো, যেখানে রাজার চেয়ে মন্ত্রীর শক্তি অনেক বেশি, যেখানে সত্যের চেয়ে মিথ্যার শক্তি অনেক বেশি। শেষটাকে দেখাবে না বলে সেখানে সত্য-মিথ্যাকে আড়াল করে রাখে। শেষ হয়েও শেষ হয় না কিছুই। এমন করেই শেষের সত্যটা কেউ জানবে না কোনো দিন। শেষটা আর বলা হবে না কখনো।

n  লেখক: অধ্যাপক,  ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর