ইরান-আইএইএ নতুন সমঝোতা

২০১৫ সালে সম্পাদিত ইরান পরমাণু চুক্তির সম্ভাব্য পরিণতির ব্যাপারে বৈশ্বিক উদ্বিগ্নতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পাচ্ছে। নানা ধরনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে ইরান পরমাণু চুক্তি টিকিয়ে রাখার পথটি। সর্বশেষ এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে ইরানের চলমান বিবাদ আরো বিস্তৃত হচ্ছে। এর আগে আমেরিকাকে চুক্তিতে ফিরিয়ে এনে এ সংক্রান্ত অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে শুরু হয় বহুপক্ষীয় ভিয়েনা সংলাপ। কিন্তু কয়েক দফা আলোচনা সম্পন্ন হলেও আমেরিকার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। যদিও ঐসব আলোচনায় কিছু কিছু বিষয়ে অগ্রগতি অর্জিত হলেও কার্যত কোনো ধরনের স্পষ্ট অঙ্গীকার ছাড়াই ভিয়েনা সংলাপের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এরপর এই ইস্যুতে ইরানের কট্টর বিরোধী ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় বসেন তেহরানের পরমাণু প্রকল্পের সহযোগী দেশ রাশিয়ান ফেডারেশন। দুই দেশের শীর্ষ পরমাণু কূটনীতিকদের ঐ আলোচনায় ভিয়েনা সংলাপ পুনরায় শুরুর ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভিয়েনা সংলাপ পুনরায় শুরু না হওয়ায় ইরান পরমাণু চুক্তির ভবিষ্যত্ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে। এক্ষেত্রে আমেরিকা ও ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার শর্ত হিসেবে নিজ নিজ দাবির প্রতি অনড় আছেন। আমেরিকা ও ইরানের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের সূত্র ধরে ইরান-আইএইএ সম্পর্কেও সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বেশ কিছু অভিযোগ উত্থাপন করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অভিযোগ হচ্ছে, গোপন স্থানে ইরানের পরমাণু কার্যক্রমের উপস্থিতি। যদিও ইরান এই দাবিকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের পরমাণুকেন্দ্রসমূহের ওপর আইএইএর নজরদারি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। উল্লেখ্য, পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবিত না করার শর্ত হিসেবে তেহরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চায় ইরান। এতদুদ্দেশ্যে গত এপ্রিলে শুরু হয় ভিয়েনা সংলাপ। ঐ সংলাপ কার্যকর ফলাফল আনতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে আলোচনার নামে পশ্চিমারা সময়ক্ষেপণ করছে, এমন অভিযোগ তোলে ইরান। এরপর দেশটি আমেরিকার পক্ষ থেকে চুক্তিতে ফেরার প্রতিশ্রুতি না পাওয়ায় নিজের পরমাণু স্থাপনাসমূহে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার নজরদারি সীমিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ পর্যায়ে শুধু এনপিটি চুক্তির আওতায় আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থাকে সহযোগিতার কথা ঘোষণা করে তেহরান। ইরান এই উদ্যোগ প্রায় তাত্ক্ষণিকভাবেই বাস্তবায়ন করায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। ইরান আইএইএর মতবিরোধের এই ধারাবাহিকতায় ইরানের পরমাণুকেন্দ্রসমূহ থেকে অপসারিত হয় আইএইএর পর্যবেক্ষণ ক্যামেরা। এটি স্পষ্টত আইএইএর জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয়ে পরিণত হয়। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরিভাবে আন্তর্জাতিক নজরদারির বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই তেহরান সফরে আসেন আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি। এ সময় ইরানের পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রধানের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন আইএইএ প্রধান। দুই কর্মকর্তার আলোচনার ভিত্তিতে ইরান আপাতত নিজের পরমাণুকেন্দ্রে আইএইএর পর্যবেক্ষণ ক্যামেরা ও মেমোরি প্রতিস্থাপনে সম্মত হয়েছে—এমন খবর দিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। এ ব্যাপারে এখনো বিস্তারিত কিছু  জানা যায়নি। ইতিমধ্যে ইরান-আইএইএর এই নতুন সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও রাশিয়া। অন্যদিকে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র মুখপাত্র মারিয়া জাকারোভা গতকাল মস্কোতে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, আইএইএ ও ইরানের নতুন এই সমঝোতা পরবর্তী দফার ভিয়েনা সংলাপ শুরুর পথটি সহজ করবে। এ ব্যাপারে সম্ভব সবকিছু করতে রাশিয়া প্রস্তুত বলেও জানান মারিয়া জাকারোভা। যদিও আইএইএর সঙ্গে ইরানের সমঝোতা হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই পক্ষ কথার লড়াইয়ে জড়িয়েছে। তেহরান সফর শেষে ভিয়েনা ফিরেই রাফায়েল গ্রোসি ইরানের গোপন পরমাণু স্থাপনা থাকার পূর্বতন অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করেন। এ নিয়ে  অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতত্সত্ত্বেও উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন এই সমঝোতা পারস্পরিক সম্পর্কের তিক্ততা কিছুটা হলেও প্রশমিত করবে বলেই ধরে নেওয়া যায়। এই সমঝোতা ইরান পরমাণু চুক্তির অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে সব পক্ষের সাধারণ বিভ্রান্তি দূর করে পরবর্তী আলোচনার ক্ষেত্র সৃষ্টির জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনা করা যাচ্ছে। এদিকে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে আইএইএর নির্বাহী বোর্ড সভা। বেশ কিছুদিন থেকেই চলতি সম্মেলনের এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা চলছিল আন্তর্জাতিক মহলে। কেননা আইএইএর  চলতি সম্মেলনে ইরানবিরোধী নতুন প্রস্তাব উত্থাপনের ব্যাপারে পশ্চিমারা প্রায় এককাট্টা হয়ে আছে। যদিও এ ধরনের প্রস্তাব পাশের ব্যাপারে রাশিয়া কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। উল্লেখ্য, রাশিয়া ও চীন—এই দুই পরাশক্তি বরাবর ইরানের পরমাণু চুক্তিতে আমেরিকাকে নিঃশর্ত ফেরার তাগিদ দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে তারা ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যাপারেও সোচ্চার। তবে ভিয়েনা সংলাপ আবার শুরু না হলে কাজের কাজ হচ্ছে না কিছুই। যে কারণে ইরান পরমাণু চুক্তির ভবিষ্যত্ প্রশ্নে জরুরি ব্যাপার হচ্ছে আপাতত ভিয়েনা সংলাপ পুনরায় শুরু করা।

আমরা সবাই জানি, ২০১৫ সালে সম্পাদিত ইরান পরমাণু চুক্তি এই মুহূর্তে প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। বস্তুত আমেরিকা চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর এই বাস্তবতার সৃষ্টি। অন্যদিকে এই অচলাবস্থার অবসান করতেই গত এপ্রিলে শুরু হয় বহুজাতিক ভিয়েনা সংলাপ। কিন্তু সংলাপে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত না হওয়ায় পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পথটি কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষত ইরানের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কোনো ধরনের বাস্তবসম্মত ফলাফল ভিয়েনা সংলাপে লক্ষ করা যায়নি। উলটো ইরানের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টির উপলক্ষ্য ভিয়েনা সংলাপে পরিলক্ষিত হয়েছে। ঐ সূত্র ধরে ইরান আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা সীমিত করায় সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সব পক্ষই নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ার শঙ্কায় পড়ে। এমন প্রেক্ষাপটে ইরানের পরমাণু স্থাপনাসমূহের ওপর আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার নজরদারি কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ায় সবার মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্থিতাবস্থা কত দিন বহাল থাকবে। ইতিমধ্যে ইরানের নতুন সরকার এ ব্যাপারে অভ্যন্তরীণ আলোচনা চালিয়ে নিচ্ছে। এর আগে দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রায়িসি ভিয়েনা সংলাপে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এর পূর্বশর্ত হিসেবে ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞার প্রত্যাহার দাবি করেছেন তিনি। তাই পরিশেষে বলা যায়, ইরান আইএইএর মধ্যকার চলমান বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যাপারে আমেরিকার মনোভাব স্পষ্ট হতে হবে। কূটনৈতিক চাতুর্য প্রদর্শনপূর্বক আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণের অশুভ ফাঁদে ইরান আবার পা দেবে বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার ভূমিকা নিয়ে ইরানের মধ্যে যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে, সেটিও সবাইকে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। তাই পরিশেষে যে কথাটি বলা যায়, তা হচ্ছে হয়তো আমেরিকাকে এই চুক্তিতে ফিরতে হবে নতুবা ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ঘোষণা করতে হবে। অন্যথায় আবার ভিয়েনা সংলাপ শুরু হলেও তা খুব বেশি কার্যকর হবে না। এমনটি চলতে থাকলে ইরান-আইএইএর সম্পর্ক তলানিতে ঠেকবে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। এ ধরনের শূন্যতা শেষ পর্যন্ত ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচিকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে পারে।

n লেখক :আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক