রেসিং কার ও পাটের ব্যবহার প্রসঙ্গ

একসময়ের সোনালি আঁশ পাটের আবার সুদিন ফিরিতেছে—এই কথা বহুদিন ধরিয়াই বলা হইতেছে। তবে পাটশিল্পের পুনর্জাগরণ এখন দিনদিন সুস্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ পাট উত্পাদিত হয় ফরিদপুর জেলায়। সেইখানে এখন ধানের জমিতেও পাট চাষ করা হইতেছে। কেননা, এখন চাউলের চাইতে দাম অধিক পাটের। এক মণ মোটা চাউলের দাম যেখানে ১ হাজার ৬০০ হইতে ২ হাজার টাকা, সেইখানে ভরা মৌসুমে এক মণ পাটের দাম ৩ হাজার টাকারও অধিক। ইহার দাম গত বত্সর ৬-৭ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠিয়াছিল। চাষিরা এখন তাই আবার পাট চাষে মনোযোগী হইতেছেন। পরিবেশ সচেতনতার কারণে সমগ্র বিশ্বে এখন প্লাস্টিক বা সিনথেটিক ফাইবার বাদ দিয়া ন্যাচারাল ফাইভারের ডিমান্ড বা চাহিদা বাড়িয়াছে। সেই ক্ষেত্রে পাটজাত পণ্যই প্রধান ভরসা হইয়া উঠিতেছে। বাংলাদেশের জন্য ইহা একটি বড় সুখবর বটে। গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্সের পর নূতন করিয়া পাটজাত পণ্য রপ্তানি আমাদের জন্য আশীর্বাদের কারণ হইয়া উঠিতে পারে। এমন ভালো খবরের মধ্যে দেশে আরেকটি খুশির খবর হইল কুয়েট শিক্ষার্থীদের পাট দিয়া তৈরি রেসিং কার। আন্তর্জাতিক বিশ্বে তাহারা ইতিমধ্যেই হইচই ফেলিয়া দিয়াছে।

পাট দিয়া কত বিচিত্র পণ্য যে তৈরি হইতে পারে, তাহা স্বচক্ষে না দেখিলে বিশ্বাস করা কঠিন। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা ‘কিলোফ্ল্যাইট আলফা’ নামের একটি রেসিং কার উদ্ভাবন করিয়া ইহারই প্রমাণ দিল। এই গাড়ির বডিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবেশবান্ধব পাট দিয়া তৈয়ারি। গাড়িটি ফর্মুলা স্টুডেন্ট ইউকে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় এবং বিশ্বের ৬৪টি দেশের মধ্যে ৩৩তম স্থান অর্জন করে। গাড়িটিতে উন্নতমানের ইঞ্জিন, গিয়ার, ব্রেক, মিটার ইত্যাদি দেওয়া হইয়াছে। আমাদের দেশে মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীসহ জনসাধারণের মধ্যেও বিভিন্ন আবিষ্কার বা উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। পত্রপত্রিকায় তাহা ফলাও করিয়া ছাপাও হয়; কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই আবিষ্কার সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। যেমন—ইহার উত্পাদন, বাজারজাত ইত্যাদি সম্পর্কে আমরা অন্ধকারে থাকিয়া যাই। এই সকল নব উদ্ভাবন লইয়া স্বপ্রণোদিতভাবে উত্সাহ-উদ্দীপনা দেওয়ার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আগাইয়া আসা উচিত। ইহার সম্ভাবনা লইয়াও ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত। পাটের জিন আবিষ্কার এবং সামগ্রিকভাবে ইহা লইয়া যে অজুত সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে তাহারও সদ্ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন।

বাংলাদেশে পাট খাতে বেসরকারিভাবে অনেক বিনিয়োগ করা হইতেছে। রাজশাহী তথা উত্তরাঞ্চলে বেসরকারি উদ্যোগে গড়িয়া উঠিতেছে অনেক পাটকল। পাট দিয়া বিভিন্ন পণ্য উত্পাদন করিয়া তাহা বিদেশে রপ্তানি করা হইতেছে। এভাবে পাটশিল্পে যে গতি সঞ্চার হইতেছে তাহা আশাব্যঞ্জক। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই বত্সর সাড়ে ৮ লক্ষ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হইয়াছে এবং উত্পাদন হইয়াছে কমবেশি ৯০ লক্ষ বেল পাট (১৮২ কেজিতে এক বেল)। গত বত্সরের তুলনায় পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়িয়াছে ৩১ শতাংশ। পাট দিয়া এখন সুতা, দড়ি, বস্তা, প্যাকিং সরঞ্জাম, ব্যাগ বা থলে তৈরির পাশাপাশি টব, খেলনা, জুট ডেনিম, জুয়েলারি, ম্যাটস, জুতা-স্যান্ডেল, বাস্কেট, শাড়ি, পাঞ্জাবি, গৃহস্থালির নানা সরঞ্জামসহ কত কী যে তৈরি হইতেছে তাহার ইয়ত্তা নাই। পাটখড়ি দিয়া পার্টিকেল বোর্ড, কম্পোজিট, সেলুলয়েডও তৈরি করা হইতেছে। ইহারই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলি লইয়া নূতন করিয়া ভাবিতে হইবে। পাট চাষ ও পাটজাত শিল্পপণ্য উত্পাদনে ঋণসুবিধা সম্প্রসারণ করিতে হইবে। পাটবীজ সরবরাহ ও সেচে ভর্তুকি দেওয়া যাইতে পারে। পাটশিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানিতেও কর ছাড় দেওয়া বাঞ্ছনীয়। আমরা মনে করি, প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের পুনর্জাগরণকে আগাইয়া লইতে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।