সাইবার ক্রাইমের ঝুঁকিতে কিশোর-কিশোরীরা

প্রায় দেড় বছর বন্ধ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। খোলার পরেও ক্লাস সম্পূর্ণরূপে শুরু হয়নি। এখনো শিক্ষা কার্যক্রম চলেছে অনলাইনের মাধ্যমে। অর্থাত্ মোবাইল এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে। ফলে সবার হাতে পৌঁছে গেছে মোবাইল ফোন। এর প্রভাবে বাড়ছে সাইবার অপরাধের সংখ্যাও। এর মধ্যে কিশোর-কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন এবং জড়িয়ে পড়ছেন সাইবার ক্রাইমের সঙ্গে। বাবা-মা কিংবা শিক্ষক-শিক্ষিকারা আগে যেখানে পড়ার সময় মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকতে বলতেন, এখন সেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই চলছে পড়ালেখা। এমতাবস্থায় কৈশোরপ্রাপ্ত এই ছেলেমেয়েদের ওপর পড়ছে এর বিরূপ প্রভাব। শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু; কিন্তু এই সব ছোট ছেলেমেয়ের ধারণা নেই প্রযুক্তির অপব্যবহার সম্পর্কে। জেনে না জেনে তারা জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে।

সাইবার ক্রাইম বর্তমান সময়ে অন্যতম একটি গুরুতর অপরাধ; কিন্তু অনেক ছেলেমেয়েই জানে না সাইবার ক্রাইম কী, কোন কোন কাজ সাইবার ক্রাইমের মধ্যে গণ্য এবং এর হাত থেকে রক্ষা পেতে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। সেই সঙ্গে হঠাত্ বিপদে পড়লে কোথায় সাহায্য চাইতে হবে—এই সম্পর্কেও নেই তাদের কোনো ধারণা।

অপরাধের উদ্দেশ্যে কিছু করাই যে সাইবার ক্রাইম এটি একটি ভুল ধারণা। অনেক সময় না বুঝে লাইক-শেয়ার কিংবা কমেন্ট করাও সাইবার ক্রাইমের মধ্যে পড়ে। সাইবার ক্রাইমের মাধ্যমে কিশোর অপরাধীর সংখ্যা বাড়ছে। হঠাত্ মোবাইল ফোন হাতে পেয়ে কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন রকম গেইম, লাইকি, টিকটক—এগুলোর মাধ্যমে খ্যাতি পাওয়ার চেষ্টা করছে। এতে করে সৃষ্টি হচ্ছে দ্বন্দ্ব ও কিশোর গ্যাং। এছাড়াও ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে কাউকে বুলিং করা কিংবা অপত্তিকর বার্তা পাঠানোর মতো ঘটনা ঘটছে। আবার অনেক সময় তারা না জেনেই অপরাধ করে ফেলছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ সহজলভ্য হয়ে উঠেছে এবং এর ব্যাপ্তিও বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ করোনাকালীন সময়ে মাদক বিক্রির অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো, বিশেষ করে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপের মতো যোগাযোগমাধ্যম। অল্প বয়সের ছেলেমেয়েদের সহজেই যে কোনো বিষয়ে প্রভাবিত করা যায়। মোবাইল এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও রয়েছে আমাদের দেশে, পর্নোগ্রাফি থেকে মানব পাচার—কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না। অপরাধ করার চেয়ে এর শিকার হচ্ছে বেশির ভাগ কিশোর-কিশোরী। টিকটকে খ্যাতি আর লোভের ফাঁদে পড়ে নারী পাচারের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এর সবচেয়ে বেশি শিকার তরুণ-তরুণীরা, আবার তারাই সবচেয়ে বেশি জড়িত এ অপরাধের সঙ্গে। 

এমতাবস্থায়, শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর উদ্দেশ্যে যেই মোবাইল ফোন হাতে দেওয়া হয় তার মাধ্যমে যাতে কিশোর-কিশোরীরা অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে সে বিষয়ে নজরদারির পাশাপাশি তাদের সম্মিলিতভাবে জানাতে হবে, সচেতন করতে হবে। অনেক সময় কিশোর-কিশোরীরা সাইবার ক্রাইম-সম্পর্কিত কোনো বিপদে পড়লে পরিবার কিংবা শিক্ষকদের ভয়ে জানাতে চায় না। তাদের মধ্য থেকে এ ভীতি দূর করতে হবে। এই ভয়ের কারণেও অনেক সময় হতাশায় ভুগে এবং আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কেউ যদি ভুলে বা না বুঝে অপরাধ করে ফেলে, তাহলে তাদের বুঝাতে হবে, শুধরানোর সময় দিতে হবে। তাদের কাউনসিলিং করতে হবে। আর এসব কিছুর জন্য চাই সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে তাদের ধারণা ও এর কুপ্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান। শাস্তির চেয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিকতা পরিবর্তন বেশি প্রয়োজন কিশোর-কিশোরীদের জন্য। শিক্ষকদের মাধ্যমে, বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে এবং অনলাইনে বিভিন্ন সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে তাদের সচেতন করতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়