বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা নিশ্চিত করতে ২০২৩ সাল থেকে বদলে যাবে শিক্ষাব্যবস্থা। এরই মধ্যে নতুন শিক্ষাক্রমের খসড়া রূপরেখার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে পরীক্ষানির্ভরতা কমিয়ে শিখনকালীন মূল্যায়নে জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাত্ শ্রেণিকক্ষেই একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করবেন। মুখস্থ ও পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শিক্ষায় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাকাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের জীবনে দুটোর বেশি পরীক্ষা থাকা উচিত নয়। বর্তমানের পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি থেকে শিক্ষাকে বের করে আনতে চাইছে সরকার। পরীক্ষার পরিবর্তে শ্রেণিকক্ষে দক্ষতাভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন চালু হতে যাচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পালটে যাচ্ছে শিক্ষাক্রম। বিষয় ও পরীক্ষা কমানোর পাশাপাশি বইয়েও আনা হচ্ছে পরিবর্তন। ফলে সিলেবাসভিত্তিক মুখস্থ বিদ্যার চর্চাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের ‘অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন ফল’ অর্জনের জন্য পড়াশোনা করতে হবে। অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনের মধ্যে থাকছে— প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট ও গ্রুপভিত্তিক শিক্ষা; কিন্তু কিছু শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুগোপযোগী করা না গেলে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। নতুন এ শিক্ষাক্রমের মূল লক্ষ্য পড়াশোনাকে আনন্দময় করে তোলা। একই সঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকে পড়ার চাপ কমানো। পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলা বা অন্যান্য বিষয়ের সুযোগ কমে গেছে, এটা যেন না হয়। ক্লাস শেষে যেন শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো সময় কাটাতে পারে। মুখস্থনির্ভরতার বিষয়ের বদলে অভিজ্ঞতা ও কার্যক্রমভিত্তিক শেখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীর দৈহিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলা এবং অন্যান্য কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সাল থেকে এ শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্য হলেও সে অর্থে হাতে সময় সীমিত। আগামী বছর থেকে ‘পাইলটিং’ এবং পরবর্তী দুই বছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের লক্ষ্য অর্জন করতে আগেই শিক্ষাক্রম পুরো সম্পন্ন করতে হবে। আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীরা যেন দেশীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি শিখন ও লালনে অভ্যস্ত হয়, সেটিই শিক্ষাক্রমে রাখতে হবে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনে সর্বাগ্রে দৃষ্টি দেওয়া চাই। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিক্ষায় বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে। আর এই বিনিয়োগ ব্যবহারে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। শিক্ষায় এই পরিবর্তনের আগে যথেষ্ট গবেষণা করা প্রয়োজন। পাঠদানে পরিবর্তন আনতে হবে। পাঠদানের সঙ্গে প্রযুক্তি যুক্ত করতে হবে। শিক্ষকদের মান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বাড়াতে হবে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের বন্দিশালা থেকে মুক্ত হয়ে দেশের মাটিতে পা রাখার সাত মাসের ভেতরে তিনি জাতীয় শিক্ষা কমিশন তৈরি করেছিলেন। সেই শিক্ষা কমিশনের দায়িত্ব একজন বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদাকে দিয়েছিলেন। শিক্ষার ব্যাপারে একজন বিজ্ঞানী কী স্বপ্ন দেখেন, বঙ্গবন্ধুর কাছে সেটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা সবাই জানি আমাদের লেখাপড়ার বিষয়টিতে এখনো নানা ধরনের সমস্যা আছে। দেশের সবাইকে নিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষাবিদরা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা ও অষ্টম শ্রেণি শেষে পাবলিক পরীক্ষার বিরোধিতা করে আসছিলেন। নতুন শিক্ষাক্রমে এ দুইটি পরীক্ষা বাদ পড়ার দিকটিও ইতিবাচক ও আশাপ্রদ। নতুন শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে শিশুদের আনন্দময় শিখন, বিষয়বস্তু ও পাঠ্যপুস্তকের বোঝা ও চাপ কমিয়ে অভিজ্ঞতা ও কার্যক্রমভিত্তিক শিক্ষাকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ পাঠগ্রহণ শেষ নিশ্চিত করা। অর্থাত্ পুরো শিক্ষাক্রম হবে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। সমসাময়িক ঘটনার অংশ হিসেবে নতুন শিক্ষাক্রমে ঢুকছে ‘করোনা’ নামের অতিসংক্রামক রোগের আদ্যোপান্ত। দেশের বর্তমান শিক্ষাক্রম মূলত উদ্দেশ্যভিত্তিক। এখানে পরীক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে; কিন্তু নতুন শিক্ষাক্রমে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ধারাবাহিক মূল্যায়ন। এটি স্বীকার করে নেওয়া প্রয়োজন যে, নির্দিষ্ট সময় পরপর শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক নির্দেশিকায় পরিবর্তন আনা খুবই জরুরি। সময়ের সঙ্গে আপডেট থাকার জন্য এটি যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেদেরকে অন্যদের সমপর্যায়ে রাখার প্রয়াসেও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। অপরদিকে, যখনই নতুন বই তৈরি করা হয়, তখন এর পাশাপাশি শিক্ষক নির্দেশিকা তৈরির কাজটিও করতে হয়। অর্থাত্ পাঠ্য পুস্তককে শুধু আলাদাভাবে বদলে ফেললেই হয় না; এর সঙ্গে শিক্ষাক্রম ও শিক্ষক নির্দেশিকাও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আরো বেশ কিছু বিষয় জড়িত, তবে সেগুলো উহ্য থাকলে কোনো সমাধান নেই। আমাদের এই উপমহাদেশে মা-বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে খুব কম সন্তানই নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী পড়তে পারে। কেননা আজকাল সন্তানের রেজাল্ট, সাফল্যের ওপর সোশ্যাল স্ট্যাটাস নির্ভর করে! সবাই হয়তো সমান মেধাবী নয়; কিন্তু সবাই কিছু না কিছুতে নিশ্চয়ই মেধাবী। কেউ ভালো ছবি আঁকে, কেউ ভালো গান গায়, কেউ তুখোড় বক্তা, কেউ ভালো খেলাধুলায়, কেউ ডিজাইনে দারুণ, কেউ নাচে দুর্দান্ত। আমাদের মা-বাবা ও শিক্ষকদের লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মেধার দিকটা খুঁজে বের করতে হবে।
সব বাবা-মা চান তাদের সন্তান যেভাবে হোক পরীক্ষায় ভালো নম্বর নিয়ে আসু্ক, ভালো নম্বর না পেলে ভালো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না। ভালো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশি নম্বর নিয়ে পাশ না করলে বা মেধা তালিকায় না থাকলে ভালো চাকরি পাবে না। অর্থাত্ ভালো চাকরিই হয়ে ওঠে মূল কথা। ভালো বেতনের চাকরি দেবে সন্তানকে সচ্ছল জীবন। সন্তানের নিরাপদ-সচ্ছল জীবন চাওয়া এই বাবা-মাকে দোষ দেওয়া যায় না সন্তানের ভালো ফলাফলের জন্য, দায়ী আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। বর্তমান শিক্ষাক্রমে একজন শিক্ষার্থীকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পরই প্রচণ্ড চাপ নিতে হয়। পঞ্চম শ্রেণিতে ছয়টি বই পড়লেও ষষ্ঠ শ্রেণিতে তার বিষয়সংখ্যা দাঁড়ায় ১২টিতে। এরপর নবম শ্রেণিতে ওঠার পর পড়তে হয় মহাসমুদ্রে। বিজ্ঞান, বাণিজ্য নাকি মানবিক—কোন বিভাগে পড়বে তা ঠিক করতে হয়; কিন্তু মাত্র ১৪ বছর বয়সে ঐ শিক্ষার্থী এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ফলে অভিভাবক বা শিক্ষকরা যে কোনো একটি বিভাগ তার ওপর চাপিয়ে দেন। এতে দেখা যায়, ঐ শিক্ষার্থী হয়তো জোর করে বিজ্ঞান বা বাণিজ্যের বিষয়গুলো পড়ছে। মুখস্থের ওপর ভর করে নম্বর পেলেও প্রকৃত অর্থে সে বিষয়গুলো আত্মস্থ করতে পারে না। এ ছাড়া একটি বিভাগে সীমাবদ্ধ থাকায় সামগ্রিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হয় না। গভীর শিখনে গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীর দৈহিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলা ও অন্যান্য কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরপর শিক্ষার্থীরা যেন নিজেদের মতো সময় কাটাতে পারে। বর্তমানে পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলা বা অন্যান্য বিষয়ের সুযোগ কমে গেছে, এটা যেন না হয়। জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
আমাদের দেশের আয়তন বাড়বে না, প্রাকৃতিক সম্পদ বাড়বে না; কিন্তু আমাদের জনসংখ্যা আরো বাড়বে। এই জনসংখ্যাকে শক্তি করেই আমাদের এগোতে হবে। শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। ভবিষ্যতে তাহলে এটাই আমাদের মূল শক্তি হয়ে দাঁড়াবে। মূল শিক্ষাব্যবস্থাতেই পরিবর্তন আনা সময়ের চাহিদা। সৃজনশীলতা সবার মধ্যেই আছে। সেটাকে বের করে আনতে হবে। সবার আগে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করতে হবে। ছেলেমেয়েদের জন্য এমন বই প্রণয়ন করতে হবে যেগুলো তাদেরকে আনন্দ দেবে। সেটা বইয়ের মলাট থেকে শুরু করে লেখা পর্যন্ত। তাদেরকে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কারিকুলাম হলো শিক্ষার মূলরেখা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য উপযুক্ত হয়ে গড়ে ওঠার মূলরেখা অনুসরণ খুবই জরুরি। পরীক্ষার চাপমুক্ত পড়াশোনা ও জ্ঞানার্জনটা আসলে শিক্ষার্থীদের সময়ের দাবি। শিশুদের সুন্দর, সুষম ও সৌহার্দপূর্ণ বিকাশে এটি সত্যিই জরুরি। সুন্দর জীবনধারণও শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য। নতুন শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও যথাযথ দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে যোগ্যতা অর্জন করবে। এর মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রতিযোগিতার নতুন বিশ্বে আমাদের শিক্ষার্থীরাও নিজেদের প্রমাণ করবে এবং তারা সত্যিকারের বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। এটি বাস্তবায়ন কঠিন হলেও মেধাবী জাতি গঠনে যুগের সঙ্গে তথা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।
n লেখক :ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়