একটি যুদ্ধবিহীন বিশ্ব প্রতিষ্ঠার (যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই স্লোগানে) লক্ষ্যে ১৯৮১ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত নম্বর ৩৬/৬৭ প্রস্তাব অনুসারে প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের ‘তৃতীয় মঙ্গলবার’ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ২০০১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত ৫৫/২৮২ নম্বর প্রস্তাব অনুসারে ২০০২ সাল থেকে প্রতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ‘আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস’ হিসেবে উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ‘আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস’ উপলক্ষ্যে প্রথমে জাতিসংঘের মহাসচিব ‘শান্তির ঘণ্টা’ বাজান এবং বিশেষ বাণী প্রদান করেন। এরপর থেকে জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বিশ্বের সব দেশ ও সংগঠন কর্তৃক যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ২০০৭ সালে জাতিসংঘের তত্কালীন সেক্রেটারি জেনারেল বান কি মুন এই দিনে ২৪ ঘণ্টার জন্য সারা পৃথিবীতে সব রকমের অশান্তিমূলক কাজ বন্ধ রাখার ডাক দেন এবং এই দিন উপলক্ষ্যে প্রতিটি দেশকে দুই মিনিটের নীরবতা পালন করার আর্জি করেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা, ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে সুরক্ষা দেওয়া এবং অশান্তি থেকে দূরে রাখার জন্য অঙ্গীকার নেওয়া হয়। এই দিন উদ্যাপনের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো শান্তি বজায় রাখা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, একে অপরের প্রতি বিশ্বাস এবং সহনশীল মনোভাব গড়ে তোলা ইত্যাদি।
দিবসটির সূচনালগ্নে এই সুবিশাল বসুন্ধরার কোণে কোণে নিপীড়িত ও নির্যাতিত জাতিরা একটি সবুজ স্বপ্ন দেখেছিল, সোনালি আশায় বুক বেঁধেছিল যে, আজ থেকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরকালের জন্য বিদায় নিতে চলেছে অন্যায়-অবিচার, মিটতে চলেছে ধর্ম আর বর্ণের বিদ্বেষ, ঘুচে যাবে ধনী-গরিবের ব্যবধান, মুছে যাবে ক্ষমতার দাম্ভিকতা আর আধিপত্যবাদের দাপট, থেমে যাবে সংঘাত আর হানাহানি, ভুলে যাবে যুদ্ধ-বিদ্রোহ, তালা পড়বে অস্ত্র উত্পাদনকারী সংস্থাগুলোতে। এর পরিবর্তে শান্তির অজস্র ধারা প্রবাহিত হবে, বহু কাঙ্ক্ষিত সুখ-শান্তিতে পৃথিবী ভরপুর হয়ে উঠবে, প্রতিষ্ঠিত হবে বহুপ্রত্যাশিত শান্তি ও সম্প্রীতি, স্থাপিত হবে বিভিন্ন জাতি-ধর্মের মানুষের মধ্যে হূদ্যতা ও সৌহার্দ, গড়ে উঠবে একটি নিরাপদ, সংঘাতমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ প্রথিবী। অথচ আজকের পৃথিবী সংঘাত ও অশান্তিতে পরিপূর্ণ। উত্পীড়িতের ক্রন্দন-রোলে ভারাক্রান্ত হচ্ছে আকাশ-বাতাস। মা ও শিশুদের আর্তনাদে ফেটে যাচ্ছে পৃথিবীর বুক। বিশেষ করে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশে অশান্তির উত্তাল তরঙ্গ শান্তির স্বপ্নকে ভেঙেচুরে চুরমার করে দিয়েছে। সেখানে শান্তি একটা দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কী হতে পারে?
বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি নানা কারণেই স্বাভাবিক নয়। বছরটি শুরু হয়েছে আমাদের জীবনের জন্য এক হুমকি মহামারির মধ্য দিয়ে। বিশ্ব সম্প্রদায় একটি অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে, যা অদৃশ্য এবং বিশ্বে এমন কোনো শক্তিশালী অস্ত্র নেই, যা একে ধ্বংস করতে সক্ষম। সমগ্র পৃথিবীটাই কোভিড-১৯ নামের এমন এক ভয়াবহ শত্রুর মুখোমুখি, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিরল। আমরা উন্নয়নশীল দেশের জনগণই শুধু নই, উন্নত দেশের জনগণও কমবেশি একই ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এ কথা বলা যাবে না, পৃথিবীতে কোনো যুদ্ধবিগ্রহ নেই, যদিও জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সব যুদ্ধরত দেশকে তাদের অস্ত্রশস্ত্র রেখে বর্তমান বৈশ্বিক মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এ কথা সত্যি, মহাসচিব মহোদয় যুদ্ধরত দেশগুলোকে উদ্দেশ্য করেই ঐ কথা বলেছেন। কিন্তু এ আহ্বান সবার জন্য। বিশ্বসম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই মহামারির বিরুদ্ধে অবশ্যই একসঙ্গে লড়তে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে বিশ্বশান্তি ও সম্প্রীতি। সারা বিশ্বের অনুন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিশ্বে কাঙ্ক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এটাই প্রত্যাশা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম