সুমন্ত গুপ্ত
ভ্রমণ নেশার মতো। কি শীত কি-বা বসন্ত, বর্ষা। ভ্রমণের মজাটাই আলাদা। তাই আমি সময় পেলেই বেরিয়ে পরি কখনো জানা, কখনো অজানার উদ্দেশ্যে। সিলেটের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দর্শনীয় একটি স্থান। এটি প্রকৃতিপ্রেমী আর ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য আদর্শ এক স্থান বলা চলে। আমরা আজ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের দিকে যাচ্ছি। ঘড়ির কাঁটায় সকাল আটটা। আমার সঙ্গী হিসেবে আছে আনান্দ, পৃথু, পিকু, অনিক ও সপ্তক। আর গন্তব্যে পৌঁছানোর দায়িত্বে রয়েছে ফরহাদ। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে আমরা এসে পৌঁছালাম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রবেশদ্বারে। টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা পেলাম গাছের সারির। গাছের ফাঁকে ফাঁকে চলছে সূর্যদেবের লুকোচুরি খেলা।
বলে রাখা ভালো, লাউয়াছড়া উদ্যানটি বহু পূর্বে আসামের কাছাড়ের জঙ্গলের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। ১৯৯৬ সালে এটিকে সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পাহাড়ি টিলার মাঝে দিয়ে এ বনে চলার পথ। বনের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে বেশ কয়েকটি পাহাড়ি ছড়া। আমরা দেখা পেলাম তেমনি একটি ছড়ার। আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। কিছুদূর চলার পর দেখা পেলাম ঢাকা-সিলেট রেললাইন। এর পরেই মূলত জঙ্গল শুরু। এখানে দেখা পেলাম বিখ্যাত ছবি ‘Around the World in 80 days’র শুটিং স্পট। আমরা মূল সড়ক ছেড়ে জঙ্গলের ভেতরে প্রবেশ করলাম। সাইরেনের মতো একধরনের শব্দ কানে আসছিল। এটি আসলে বনে থাকা ঝিঁঝি পোকার ডাক।
উদ্যানে বেড়ানোর তিনটি পথ দেখতে পেলাম আমরা। উদ্যানে রয়েছে একটি খাসিয়া পল্লি। প্রথম পথটির শুরু রেললাইন পেরিয়ে হাতের বাঁ দিক থেকে। নানা রকম গাছগাছালির ভেতর দিয়ে তৈরি করা এ পথে চলতে চলতে জঙ্গলের নির্জনতায় শিহরিত হবেন যে-কেউ। নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে চলতে এই পথ শেষ হবে ঠিক শুরুর স্থানে। আর এক ঘণ্টার পথ হেঁটে একটু ভেতরে গেলে শুরুতেই চোখে পড়বে বিশাল গন্ধরুই, ঝাওয়া, জগডুমুর, কাঁঠালিচাঁপা, লেহা প্রভৃতি গাছ। ডুমুর গাছের ফল খেতে আসে উল্লুক, বানর, হনুমান ছাড়াও আরও অনেক বন্য প্রাণী।
ঘুরতে ঘুরতে আমরা একসময় পৌঁছে গেলাম খাসিয়াদের বসতি মাগুরছড়া পুঞ্জি। এ পুঞ্জির বাসিন্দারা মূলত পান চাষ করে। ১৯৫০ সালের দিকে বন বিভাগ এ পুঞ্জি তৈরি করে। পথেই দেখা মিলল বিশাল বাঁশ-বাগান। এখানে নানা ধরনের বানরের খেলা দেখে মজা পাবে যে-কেউ। পথের শেষে দেখতে পেলাম বনের অন্যতম আকর্ষণ উল্লুক পরিবারের। এরা বনের সবচেয়ে উঁচু গাছগুলোতে দলবদ্ধভাবে বাস করে। তথ্যকেন্দ্র থেকে জানা যায়, এ পার্কে রয়েছে ১৬৭ প্রজাতির গাছপালা। রয়েছে ৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৬ ধরনের সরীসৃপ, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ২৪৬ প্রজাতির পাখি। এদের মধ্যে ভালুক, বানর, লজ্জাবতী বানর, হনুমান, ধনেশ, শ্যামা, অজগর, মেছোবাঘ, হরিণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। প্রকৃতির সব সৌন্দর্য উপভোগ করে আমরা ফিরলাম আগের পথেই। এ যাত্রা বেশ আনন্দের ছিল।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে যেতে ট্রেন হচ্ছে সবচেয়ে ভালো মাধ্যম। ঢাকা থেকে ট্রেনে করে শ্রীমঙ্গল যেতে কমলাপুর কিংবা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন হতে উপবন, জয়ন্তিকা, পারাবত অথবা কালনী এক্সপ্রেস বেছে নিতে পারেন। জনপ্রতি ভাড়া শ্রেণিভেদে ২৬৫ থেকে এক হাজার টাকা। সময় লাগে ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টা। বাসে ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল যেতে ফকিরাপুল অথবা সায়দাবাদ থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ভাড়ায় হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, সিলেট এক্সপ্রেস, এনা ইত্যাদি নন এসি বাস পাওয়া যায়। যেতে সময় লাগে ৪ ঘণ্টার মতো। শ্রীমঙ্গল পৌঁছে সেখান থেকে আপনার চাহিদা অনুযায়ী কোনো গাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন উদ্যানে। ইজিবাইক/ সিএনজি/ জীপ/ মাইক্রোবাস— যে কোনো বাহনেই যাওয়া যায়। যাওয়া আসা ও সেখানে ঘুরে বেড়ানোর সময়সহ সিএনজি রিজার্ভ নিলে ৪০০-৫০০ টাকায় হবে। দিনে এসে দিনেই ফিরতে না চাইলে থাকতে হবে শ্রীমঙ্গল শহরে গিয়ে।