বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম বিপ্লবী নারী, মাত্র ২১ বছর বয়সে যিনি তত্কালীন চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করে সারা ব্রিটিশ রাজশক্তির ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। আজ ২৪ সেপ্টেম্বর সেই বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মৃত্যুদিবস।
৫ মে, ১৯১১ সালে জন্ম চট্টগ্রামের বর্তমান পটিয়া থানার অন্তর্গত ধলঘাট গ্রামে মামার বাড়িতে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে প্রীতিলতা দ্বিতীয়। বাবা জগত্বন্ধু ছিলেন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালটির হেড ক্লার্ক ও গৃহশিক্ষক, মা ছিলেন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার ও গৃহিণী। ডা. খাস্তগীর স্কুলে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার সময় প্রীতিলতার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন ঊষাদি। তিনি প্রীতিলতাকে পাঠ্যবই পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বীর নারীর জীবনী পড়তে দিতেন। একদিন দিলেন ‘ঝাঁসির রানী’ বইটি। পুরুষের বেশে ঘোড়ায় চড়ে খোলা তরবারি হাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ বলেছিলেন, ‘মেরি ঝাঁসি নেহি দুঙ্গি’। ঝাঁসির রানীর এই কথাটি প্রীতিলতাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯৩১ সালের ৪ আগস্ট চাঁদপুরের তারিণী মুখার্জী হত্যা মামলায় বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসির ঘটনা প্রীতিলতাকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়।
ঢাকা ইডেন কলেজে পড়ার সময় তিনি লীলা নাগ (রায়) প্রতিষ্ঠিত ‘দীপালি সংঘ’-এ যোগ দিয়ে লাঠি খেলা ও ছুরি চালানো শেখেন। নিয়মিত ব্যায়ামচর্চাও করতেন। ১৯৩০ সালে বেথুন কলেজে পড়ার সময় তিনি বিপ্লবীদের গৌরবময় জীবনাদর্শ ও বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিপ্লবী দলে আত্মনিবেদিত হন। এতে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায় তিনি ইংরেজিতে অনার্স পড়া বাদ দিয়ে ১৯৩২ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাশ করেন। এরপর চট্টগ্রাম এসে নন্দকানন বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
প্রীতিলতার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের বর্ণনাতে মাস্টারদা সূর্য সেন লিখেছেন, ‘তার চোখেমুখে একটা আনন্দের আভাস দেখলাম। এতদূর পথ হেঁটে এসেছে, তার জন্য তার চেহারায় ক্লান্তিকর কোনো চিহ্নই লক্ষ করলাম না। যে আনন্দের আভা তার চোখেমুখে দেখলাম, তার মধ্যে আতিশয্য নেই, ফিকলেন্স নেই, সিনসিয়ারিটি শ্রদ্ধার ভাব তার মধ্যে ফুটে উঠেছে। একজন উচ্চশিক্ষিত কালচার্ড লেডি একটি পর্ণকুটিরের মধ্যে আমার সামনে এসে আমাকে প্রণাম করে উঠে বিনীতভাবে আমার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। মাথায় হাত দিয়ে নীরবে তাকে আশীর্বাদ করলাম। তার অ্যাকশন করার আগ্রহ সে পরিষ্কারভাবেই জানাল।’
পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, ‘ডগ অ্যান্ড ইন্ডিয়ান প্রহিবিটেড’। সন্ধ্যা হতেই ইংরেজরা এ ক্লাবে এসে মদ খেয়ে নাচ-গান ও আনন্দ উল্লাস করত। মাস্টারদা ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিপ্লবী কল্পনা দত্তের নেতৃত্বে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু ৭ দিন আগে পুরুষবেশী কল্পনা দত্ত গ্রেফতার হলে দায়িত্ব পড়ে প্রীতিলতার ওপর। এজন্য চৌকস ও সাহসীদের নিয়ে ৭ জনের একটা দল গঠন করে কাট্টলীর সমুদ্রতীরে প্রীতিলতাসহ অন্যান্য বিপ্লবীকে অস্ত্রশিক্ষা দেওয়া হয়।
রাত ১০টা ৪৫ মিনিট। রিভলবার, রাইফেল, বোমা ও ভেজালি নিয়ে দলনেতা প্রীতিলতার বাঁশির হুইশেল শোনার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাবের তিনদিক থেকে আক্রমণ শুরু করেন বিপ্লবীরা। ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ক্লাব প্রচণ্ড কেঁপে উঠছিল। সফলভাবে অভিযান শেষ করে দলের নেতা হিসেবে প্রীতিলতা সবাইকে বের করে নিজে বের হলেন শেষে। সবাই নির্বিঘ্নে চলে গেলেন। হঠাত্ ক্লাবের ভিতর থেকে একটা গুলি এসে প্রীতিলতার বুকে লাগে। রক্তাক্ত অবস্থায় শত্রুর হাতে বন্দি এড়াতে ‘সায়ানাইড’ (বিষ) খেয়ে আত্মাহুতি দেন।
গোপাল নাথ বাবুল