আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনা, ব্যক্তিগত পরিচয় ও তথ্যের ব্যবহার, অর্ডার ও রিভিউ ব্যবস্থাপনা, কর্মী ও ফ্রিল্যান্সারদের অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কেটপ্লেসের নীতিমালা লঙ্ঘনসহ বিটোপিয়া গ্রুপ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিয়ে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)।
শনিবার (২৬ আগস্ট) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত বেসিস কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এই আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বেসিস সহায়ক কমিটির সদস্য ও ট্রাস্ট-আইটি (বিডি) লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইঞ্জি. মোহাম্মদ জুয়েল।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিটোপিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা যথাযথ তদন্ত ছাড়া চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, অভিযোগগুলোর প্রকৃতি ও সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের কারণে দেশের সামগ্রিক ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা বেসিস চায় না।
বেসিস জানায়, প্রতারণা, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, ভুয়া অর্ডার, কৃত্রিম রিভিউ, মার্কেটপ্লেস ম্যানিপুলেশন কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা লঙ্ঘনকে সংগঠনটি সমর্থন করে না। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বেসিসের সদস্য হলে সংগঠনের গঠনতন্ত্র, সদস্য আচরণবিধি ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি যাচাই করা হবে। প্রাথমিকভাবে গুরুতর অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য উপাদান পাওয়া গেলে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করার বিষয় বিবেচনা করা হবে। সংশ্লিষ্ট সদস্য বা প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া এবং বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে বলে উল্লেখ করে জানানো হয়, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেসিস সহায়ক কমিটির সদস্য মোহাম্মদ জুয়েল বলেন, সরকারের যেকোনো বৈধ তদন্ত বা অনুসন্ধানে সংগঠনটি সহযোগিতা করবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অন্যান্য কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় তথ্য বা সহযোগিতা চাইলে বেসিস তার আইনগত এখতিয়ার ও সীমার মধ্যে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে। প্রাসঙ্গিক তথ্য, সদস্যসংক্রান্ত রেকর্ড বা প্রাতিষ্ঠানিক নথি থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সরবরাহ করা হবে।
অভিযোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ফ্রিল্যান্সার, সাবেক কর্মী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কারও এনআইডি, পাসপোর্ট, ব্যক্তিগত তথ্য বা আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস অ্যাকাউন্ট অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হয়ে থাকলে কিংবা অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ অন্য কোনো পক্ষের হাতে চলে গিয়ে থাকলে, তা জানানোর জন্য Complaint & Evidence Collection ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তথ্যদাতাদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের কাঠামোগত বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একজন ফ্রিল্যান্সারের নামে তৈরি মার্কেটপ্লেস অ্যাকাউন্টের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার কাছে থাকবে, কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মী বা ফ্রিল্যান্সারের এনআইডি, পাসপোর্ট ও ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে ব্যবহার করতে পারবে, কর্মসংস্থান শেষ হলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ও ডিজিটাল পরিচয়ের মালিকানা কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং কোনো কোম্পানি বা এজেন্সি কতগুলো ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারবে-এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে।
এ লক্ষ্যে বেসিস সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি National Freelancing & Marketplace Governance Framework তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব করবে বলেন জানান তিনি। একই সঙ্গে ফ্রিল্যান্সারদের পেমেন্ট গ্রহণের জটিলতা, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের সীমাবদ্ধতা, ব্যাংকিং সমস্যা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, করসংক্রান্ত অস্পষ্টতা এবং ডিজিটাল পরিচয় সুরক্ষার মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয়গুলোর সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলন থেকে বলা হয়, একজন বা কয়েকজনের অনিয়মের দায় দেশের লাখো সৎ ফ্রিল্যান্সারের ওপর বর্তানো উচিত নয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ ফ্রিল্যান্সার দক্ষতা, সততা ও আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে কাজ করছেন-এই বার্তাটি আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস ও বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছেও পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে বেসিসের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, কোনো পক্ষ নেওয়া নয়, কোনো অভিযোগ ধামাচাপা না দেওয়া এবং তদন্তের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা না করা। স্বচ্ছ তদন্ত, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া, ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা এবং বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের আন্তর্জাতিক সুনাম রক্ষার লক্ষ্যেই সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস, গণমাধ্যম এবং ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে চায় বেসিস।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বেসিসের সহায়ক কমিটির সদস্য ও সলিউশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জি. আব্দুল্লাহ ইবনে নূরুল ইসলাম, বেসিসের সহায়ক কমিটির সদস্য ও এজিস কোয়ালিটি অ্যাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আহসান হাবিব, বেসিসের সহায়ক কমিটির সদস্য ও এটোভা টেকনোলজির ফাউন্ডার ও সিইও ইঞ্জি. ফেরদৌস আলম, বেসিসের সহায়ক কমিটির সদস্য ও রেড স্প্যারো লিমিটেডের পরিচালক মো. ফুয়াদ হাসান এবং বেসিসের সহায়ক কমিটির সদস্য ও লেমিসে লিমিটেডের সিইও মো. রাশেদ উল হক সরকার।
