স্বয়ং শিক্ষকই শিক্ষার্থীর বাড়ি যাইবেন!

একজন মানুষের শৈশবে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শুরু হইয়া থাকে তাহার পরিবারে। আর প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শিক্ষাদানের মহান দায়িত্ব অর্পিত হয় শিক্ষকের ওপর। শিক্ষক তাহার নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও অর্জিত শিক্ষা দিয়া গড়িয়া তুলেন শিক্ষার্থীদের। এই শিক্ষা দান ও গ্রহণের মধ্য দিয়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়িয়া উঠে এক সুনিবিড় সম্পর্ক। শিক্ষাকে ফলপ্রসূ ও কল্যাণপ্রদ করিয়া তুলিবার জন্য ছাত্র ও শিক্ষকের পারস্পরিক বুঝাপড়ার সম্পর্ক অপরিহার্য। অতীতকাল হইতেই আমাদের দেশে ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে একটি সুন্দর ও অকৃত্রিম সম্পর্কের বন্ধন ছিল। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সম্মান ও শ্রদ্ধা করিত আর শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের সন্তানের মতো ভালোবাসিতেন। শিক্ষকগণ প্রয়োজন হইলে শিক্ষার্থীর উপর অভিভাবকসুলভ কঠোরতা ও শাসন আরোপ করিতেন। পেশাগত দায়িত্বের বাহিরেও শিক্ষকগণ ছাত্রছাত্রীদের খোঁজখবর রাখিতেন, কোনো শিক্ষার্থী দুই দিন স্কুলে না আসিলে কিংবা পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল অর্জনে ব্যর্থ হইলে শিক্ষার্থীদের বাড়িতে যাইয়া তাহাদের পরামর্শ, উত্সাহ দিতেন এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা দিতেন। কিন্তু সময় পরিবর্তন হইয়াছে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সেই সুমধুর সম্পর্ক আজিকার বাস্তবতায় কেবলই পেশাভিত্তিক হইয়া পড়িয়াছে। কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে না আসিলে কিংবা পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল অর্জনে ব্যর্থ হইলে তাহা শুধু রেজিস্টার খাতাতেই লিপিবদ্ধ হইয়া থাকে।

মহামারির কারণে দীর্ঘ দেড় বছর ধরিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকিবার পর সম্প্রতি তাহা খুলিয়া দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু বিদ্যালয় খুলিয়া দেওয়া হইলেও অনেক শিক্ষার্থী রহিয়াছে অনুপস্থিত। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক পর্যায়ের স্কুলগুলিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করিতে শিক্ষকদের ১১ দফা নির্দেশনা দিয়াছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। নির্দেশনায় বলা হইয়াছে, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের নাম, শ্রেণি, রোল, ঠিকানা, মোবাইল ফোন নম্বর, কী কারণে অনুপস্থিত, গৃহীত পদক্ষেপ ইত্যাদি বিস্তারিত তথ্য রেজিস্টারে সংরক্ষণ করিতে হইবে। শিক্ষকগণ অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ স্থাপন করিয়া উপস্থিতি নিশ্চিত করিবেন। প্রয়োজনে হোম ভিজিট করিতে হইবে। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করিয়া কিংবা শিক্ষার্থীদের বাড়িতে যাইয়া খোঁজখবর লইবার সরকারি এই সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও অর্থবহ। এমনিতেই করোনা মহামারিকালে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকিবার কারণে বহু শিক্ষার্থী ঝরিয়া পড়িয়াছে। বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমে নিযুক্ত হইয়া শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটাইতে বাধ্য হইয়াছে। দরিদ্রতা ও পারিবারিক বেকারত্বের কারণেও অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে ফিরিয়া আসিতে পারে নাই। এমতাবস্থায় সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাড়ি বাড়ি যাইয়া শিক্ষকগণ যদি ছাত্রছাত্রীদের ব্যাপারে খোঁজখবর লইয়া তাহাদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হন, তাহা হইলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার বাড়িবে বলিয়া আশা করা যায়। ইহা ছাড়াও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্থাপন হইবে পূর্বের ন্যায় সুমধুর সম্পর্ক, যাহা বিদ্যাদান ও বিদ্যার্জন প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা পালন করিবে।

শিক্ষকতা এমনই একটি পেশা, যাহা পেশাগত দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের নিকটেই শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা সম্মান ও মর্যাদা পাইয়া থাকেন এবং এই পেশায় নিয়োজিত ও নিবেদিত ব্যক্তিবর্গের শিক্ষাদানের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডে ‘শিক্ষক’ শব্দটি পাইয়াছে শ্রুতিমধুর ও মর্যাদার আসন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যাইতে পারে, জাপানের জনৈক শিক্ষক ক্লাসে একজন ছাত্রের লেখাপড়ার সরঞ্জামাদি পেনসিল, গ্রাফ পেপার ইত্যাদি অনুপস্থিত পাইয়া নিজেকে দুঃখের সহিত ভর্ত্সনা করিয়া বলিলেন, ‘বাছা, আমি অত্যন্ত দুঃখিত, পূর্ব ক্লাসে তোমাকে আমি হয়তো কোনো তাগাদা দিতে পারি নাই, যাহাতে তুমি এই ক্লাসে প্রয়োজনীয় লেখাপড়ার সামগ্রী লইয়া উপস্থিত হও।’ ইহাই শিক্ষকতা, ইহাই শিক্ষকতার মহানুভবতা। আমরা আশা করিব, দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ মানবিকতার সহিত শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ব পালন করিবেন এবং অতীতের ন্যায় পেশাগত দায়িত্বের বাহিরেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়িয়া তুলিবেন।