চলতি বছর এসেছে ২২টি
নির্মল রক্ষিত, পটুয়াখালী প্রতিনিধি
কুয়াকাটার সৈকতে একের পর এক ভেসে আসছে মৃত ডলফিন। চলতি মাসে পাঁচটিসহ এবছরে কমপক্ষে ২২টি মৃত ডলফিন সাগরে ভেসে এসে কুয়াকাটা এলাকার সৈকতে আটকা পড়ে। যার অধিকাংশ লেজে জাল প্যাঁচানো ছিল কিংবা ক্ষতবিক্ষত অর্ধগলিত অবস্থায় এগুলো ভেসে আসে।
স্থানীয় লোকজন সাগর পাড়ে গর্ত করে ডলফিনগুলোকে মাটি চাপা দেয়। গত বছরে এই ডলফিন মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটি সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ উল্লেখ করলেও, সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। এমনকি ঐ তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির সদস্য আবুল হোসেন রাজু ও কে এম বাচ্চু জানান, গত বৃহস্পতিবার সকালে কুয়াকাটার গঙ্গামতি তেত্রিশকানি পয়েন্টে একটি মৃত ডলফিন ভেসে আসে। এ নিয়ে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে পাঁচটিসহ এবছরে ২২টি মৃত ডলফিন সাগরে ভেসে কুয়াকাটা ও আশ-পাশের এলাকায় আসে।
এদিকে, জেলা প্রশাসন পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলে ডলফিন ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী মারা যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে গত বছরে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক ও জেলা মত্স্য কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করে আট সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তারা সরজমিন পরিদর্শন শেষে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। ঐ প্রতিবেদনে সম্ভাব্য মোট পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—মেকানাইজড ভ্যাসেলের বেহুন্দি জালে আটকা পড়ে, মেকানাইজড জাহাজের ফ্যানে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে, রাক্ষুসে সামুদ্রিক প্রাণীর আক্রমণে, সামুদ্রিক দূষণ এবং প্রাকৃতিক কারণে। এর মধ্যে ‘মেকানাইজড ভ্যাসেলের বেহুন্দি জালে আটকা পড়ে ও মেকানাইজড জাহাজের পাখায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে’ ডলফিন মারা যাওয়ার বিষয় বেশি গ্রহণযোগ্য বলে দাবি করা হয়।
এ ব্যাপারে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও তদন্ত কমিটির সদস্য আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, বন বিভাগ ডলফিনসহ সামুদ্রিক প্রাণীর কাস্টডিয়ান। ডলফিন সাধারণত গভীর সমুদ্রে বিচরণ করে। তবে ইরাবতি ও বটল নোস প্রজাতির ডলফিন অগভীর পানিতে দেখা যায়। কুয়াকাটার সাগরে ভেসে আসা মৃত ডলফিনের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, যান্ত্রিক ট্রলার ও বড় জাহাজের পাখায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে এবং মত্স্যজীবী জেলেদের জালে আটকা পড়ে এগুলোর মৃত্যু ঘটছে। পরে জোয়ারে ভেসে সাগর তীরে আসছে। এর বাইরে অন্য কোনো কারণ আছে কি না তা নির্ধারণের জন্য আগে একটি ডলফিনের পোস্টমর্টেম করে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং গত বৃহস্পতিবার জোয়ারে ভেসে কুয়াকাটা সৈকতে আসা আরো একটি মৃত ডলফিনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে। গত দুই মাসে ১১টি মৃত ডলফিন সাগরে ভেসে কুয়াকাটা সৈকতে এসেছে। তিনি আরো জানান, গত আগস্ট মাসে ডলফিন মৃত্যুর বিষয়টি পটুয়াখালী জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির সভায় আলোচিত হয়। এ ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে জানতে চেয়ে জেলা প্রশাসক বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও তদন্ত কমিটির সদস্য সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল হক সাগরে ভেসে আসা মৃত ডলফিন সম্পর্কে বলেন, ডলফিন জলজ প্রাণী হলেও সে পানির ওপরে উঠে অক্সিজেন গ্রহণ করে। সাগরে ফিসিং ট্রলারের জালে ডলফিন আটকা পড়লে পানির নীচে কয়েক মিনিটের মধ্যে অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায়। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেলে সঠিক কারণ জানা যাবে।
পটুয়াখালীর জেলা মত্স্য কর্মকর্তা ও গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব মোল্লা এমদাদুল্যাহ ইত্তেফাককে বলেন, কুয়াকাটার সাগরে ভেসে আসা ডলফিনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। সমুদ্রের কিছু মাছ প্রজনন মৌসুমে বিষাক্ত হয় সেগুলো খেয়ে এবং সাগরে কিছু বিষাক্ত শ্যাওলা আছে, যা শামুক ও ঝিনুকের খাদ্য। ঐ শামুক-ঝিনুক খেয়েও ডলফিন মারা যেতে পারে। শেষোক্ত কারণটির (টকসিক) সম্ভাবনা বেশি বলে তিনি মনে করেন। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ডলফিনগুলো মারা যাচ্ছে। জেলেদের জালে আটকা পড়ে, যান্ত্রিক ট্রলার ও জাহাজের পাখার আঘাতেই যদি মারা যেত তাহলে শীতকালেও একইভাবে মারা যেত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তিনি আরো বলেন, আমার জানামতে গত চার মাসে কুয়াকাটা সাগরে ভেসে এসেছে ১৮টি মৃত ডলফিন।