ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী ভাবনা

 

দোকানে ওষুধ বিক্রি করেন বা ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন যারা তাদের বলা হয় ফার্মাসিস্ট। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটটা এর ভিন্ন কিছু নয়। খুব কম মানুষই জানেন এর বাইরেও ফার্মাসিস্টদের আরো বহুমুখী ক্ষেত্র আছে। দেশ এগোচ্ছে, এখন সময় আরেকটু বিশদভাবে জানার। ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস। পালিত হয়ে আসছে ২০১০ সাল থেকে। যদিও বাংলাদেশে সেটা হতে সময় লেগেছে আরো চার বছর অর্থাত্ বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে ২০১৪ সাল থেকে। এর আগে বিশ্বব্যাপী ফার্মাসিস্টদের পালনের জন্য বিশেষায়িত কোনো দিবস ছিল না। এ বছরের ফার্মাসিস্ট দিবসের থিম— ‘Pharmacy: Always trusted for your health’। বাংলায় আমরা বলতে পারি, ‘ফার্মেসি : আপনার স্বাস্থ্যের প্রতি সর্বদা বিশ্বস্ত’। ‘বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস’ উপলক্ষ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও মতামত তুলে ধরেছেন— মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ

ফার্মেসি সাবজেক্টটাকে একটা মধ্যবিত্ত সাবজেক্ট বলা চলে। মানে গ্র্যাজুয়েশন করতে করতে আমাদের অনেক স্বপ্ন থাকে কিন্তু দিন শেষে দেখা যায় আমাদের ফার্মাসিস্টদের চাকরির ক্ষেত্র খুবই সামান্য। ওষুধ কোম্পানিগুলোর চাহিদার তুলনায় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট কম থাকত। কিন্তু এখন ফার্মেসি সবার কাছে একটা সু-পরিচিত বিষয়। প্রতিবছর এক সঙ্গে অনেক গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট বের হচ্ছে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এজন্য পর্যাপ্ত চাকরি ক্ষেত্রের অভাবে বেকার ফার্মাসিস্টের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে আসলেই ওষুধের দোকান দিয়েই ফার্মাসিস্টদের চলতে হবে। পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার অভাবের জন্য ছেলে-মেয়েরাও আস্তে আস্তে ফার্মেসি সাবজেক্ট নিয়ে পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

—তানজিলুর রহমান

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ফার্মেসি বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

ফার্মেসিতে পড়াশোনা শুরু করার আগে থেকেই শুনতাম পড়াশোনা শেষ করার আগেই চাকরি হাতের মুঠোয় থাকবে। কিন্তু যখন পড়াশোনা শুরু করলাম দেখলাম অধিকাংশেরই ধারণা মেডিসিনের দোকানদার হব। বিষয়টা ভালো, গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনো অধিকাংশের চিন্তাভাবনায় অনেক গোড়ামি দেখেছি। ওষুধ নিয়ে জানাটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ এটা এখনো মানুষকে বুঝানো সম্ভব হয়নি। এই যে প্রতিবছর হাজার হাজার গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট বের হচ্ছে, দিন শেষে দেখা যাচ্ছে ফার্মাসিস্ট না হয়ে বাধ্য হয়ে অন্য সেক্টরে সুইচ করতে হচ্ছে। ফার্মেসি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হলেও, এই বিষয় নিয়ে পড়ার যতটা ঝোঁক, সুযোগ-সুবিধা ঠিকমতো না পাওয়ার কারণে এই আগ্রহ ঠিক ততটাই কমে যাচ্ছে।

—সোহানা ফেরদৌস

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ফার্মেসি বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

অচেনা যোদ্ধা ফার্মাসিস্ট। স্বাস্থ্য সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ ওষুধ শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ফার্মাসিস্টরা। ফার্মেসি পেশায় কর্মরতদের উত্সাহ প্রদান এবং সাধারণ মানুষকে এ পেশা নিয়ে সচেতন করতেই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় দিবসটি। মানসম্মত ওষুধ রোগীর কাছে সরবরাহ করতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যায় এ পেশার মানুষেরা। নিরলস পরিশ্রম ও চেষ্টার মাধ্যমে রপ্তানিকারক শিল্প হিসেবে ওষুধ শিল্পকে রপ্তানিকারক শিল্প হিসেবে সমাদৃত করেছে যে কারিগররা তারাই অনেক ক্ষেত্রে পর্দার আড়ালেই রয়ে যায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে হসপিটাল ফার্মাসিস্ট নেই যা আমাদের জন্য হতাশাজনক। অচেনা যোদ্ধার মতো করোনা কালীন সংকটপূর্ণ অবস্থাতেও তারা সেবা প্রদান করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই ‘বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস’ উপলক্ষ্যে প্রত্যাশা শুধু বছরের একটি দিনে নয় সার্বক্ষণিক ফার্মাসিস্টদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত হোক এবং স্বাস্থ সেবা খাতে সরাসরি গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট যুক্ত করা হোক, তাহলেই তাদের মাধ্যমে আরো বেশি সমাদৃত হবে দেশের স্বাস্থ্য সেবা।

—নাজিয়া আফরিন

শিক্ষার্থী, প্রথম বর্ষ, ফার্মেসি বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা এখন পর্যন্ত কেবল বিভিন্ন কোম্পানিতে ওষুধ উত্পাদন ও পরিকল্পনায় তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছেন। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ফার্মাসিস্টদের সরাসরি এদেশের স্বাস্থ্য সেবায় যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে প্রতি ১ হাজার মানুষের চিকিত্সায় একজন করে ডাক্তার এবং ফার্মাসিস্ট থাকা আবশ্যক। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক ‘হসপিটাল ফার্মাসিস্ট’ পদে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের ১ম শ্রেণির ৯ম গ্রেডে নিয়োগের জন্য গেজেট প্রকাশ করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন হাসপাতালে ফার্মাসিস্ট পদ শূন্য থাকায় প্রায়ই রোগীদের ভুল ওষুধ প্রয়োগের ঘটনা ঘটছে—যার ফলে দেশের স্বাস্থ্য খাত মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। নিরাপদ ও কার্যকরী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে দেশের প্রতিটি হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের নিয়োগে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছি। কেননা গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের মূল স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগ প্রদান জরুরি।

—লামিয়া তাসনিম এশা

শিক্ষার্থী, প্রথম বর্ষ, ফার্মেসি বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

একটি দেশের স্বাস্থ্য সেবা সম্পূর্ণ করার জন্য ডাক্তার নার্সদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে ফার্মাসিস্টদের। অজানা কোনো কারণে বাংলাদেশে সর্বদা ফার্মাসিস্টরা অবহেলিত হয়ে আসছে। শুধু ওষুধ শিল্পে ফার্মাসিস্টদের আটকে রেখে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি হয় না। হসপিটাল ও কমিউনিটি ফার্মাসিস্টরা যেভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অবদান রাখতে পারবে অথবা স্বাস্থ্য সেবার যে পরিবর্তন আনবে তা বর্তমানে বাংলাদেশে চলমান পদ্ধতিতে সম্ভব নয়। বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে ফার্মাসিস্টদের আরো সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানো হোক এটাই এবারের বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসে আমার চাওয়া।

—মেহেদী হাসান ভূঁইয়া

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ফার্মেসি বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

বর্তমানে দেশে ৪০ টিরও বেশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফার্মেসি বিভাগ চালু আছে এবং প্রতি বছর প্রায় ৬ হাজার ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছে। কিন্তু তারা তাদের সঠিক কর্মক্ষেত্রে যেতে পারছে না। যেখানে ফার্মেসি বলতে আমরা বুঝি ওষুধের দোকানদার কিংবা ওষুধ শিল্পকারখানায় কাজ করা। আর স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ এই পেশার প্রতি আমাদের এই অবহেলাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো ভবিষ্যত্ চিন্তা না করেই অ্যান্টিবায়োটিক এর মতো ওষুধগুলো আমরা প্রেসক্রিপশন ছাড়াই সেবন করছি, মানছি না কোনো স্বাস্থ্য উপদেশ। যার ফলে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্টেন্স ব্যাকটেরিয়াগুলো দিন দিন সক্রিয় হয়ে উঠছে।

—ববিতা মন্ডল সোমা

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ফার্মেসি বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।