যে কোনো দেশে বা অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অনুঘটক হিসাবে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। ইহাকে কর্মসংস্থান, নূতন প্রযুক্তি হস্তান্তর, অভিনব ব্যবস্থাপনা কৌশল রপ্তকরণ, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধি, নূতন বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত এবং অভ্যন্তরীণ বাজার কার্যকারিতা বৃদ্ধির অন্যতম বড় উত্স হিসাবে বিবেচনা করা হয়। আমরাও আমাদের দেশে বিনিয়োগের জন্য বিদেশে গিয়া আহ্বান জানাইতেছি নিয়মিত। কিন্তু ইতিমধ্যে দেশে যাহারা বিনিয়োগ করিয়া নানান দুর্বিপাকে পড়িয়াছেন, তাহাদের সমস্যা সমাধানে কি নজর দেওয়া হইয়াছে?
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের পূর্বে সেই দেশের কার্যকর বিনিয়োগ পরিবেশ ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করিয়া থাকেন। আর এই যাচাই-বাছাইয়ের অন্যতম বড় মাধ্যম হইতেছে বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ বা সহজে ব্যবসায় করিবার সূচক। বিশ্বব্যাংক ২০২০ সালে যে ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচক প্রকাশ করিয়াছে, সেইখানে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৮তম। প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে ভারত ৬৩, ভিয়েতনাম ৭০, ইন্দোনেশিয়া ৭৩, ভুটান ৮৯, নেপাল ৯৯, শ্রীলঙ্কা ৯৯ এবং পাকিস্তানের অবস্থান ১০৮তম। সুতরাং ইহা স্পষ্ট যে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে আমরা এখনো শত যোজন দূরে রহিয়াছি। মনে রাখিতে হইবে, ব্যাংকগুলি ২ লক্ষ ৩১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগযোগ্য তহবিল লইয়া বসিয়া আছে; কিন্তু বিনিয়োগের সার্বিক পরিবেশ যাচাইয়ের পর উদ্যোক্তারা পিছাইয়া যাইতেছেন। আর যাহারা ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করিয়া ফেলিয়াছেন, তাহাদের বেশির ভাগের অবস্থা দেখিয়া আতঙ্কিত হইতে হইবে। এক কথায় বলা যায়—দেশের বিনিয়োগকারীদের দম বন্ধ হইয়া যাইতেছে। শিল্প-কলকারখানার মালিক ও শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুত্ সরবরাহ ব্যতীত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হইবে না। বিগত দুই দশকে গ্যাস-বিদ্যুত্সংকটে বেশির ভাগ শিল্পকারখানা তাহার উত্পাদন-সক্ষমতার সম্পূর্ণটুকু কাজে লাগাইতে পারে নাই। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে কেহ কেহ বিকল্প জ্বালানি হিসাবে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করিতে বাধ্য হইয়াছে। তাহাতে বৃদ্ধি পাইয়াছে শিল্পের উত্পাদন খরচ। বিশ্ববাজারে যে তুমুল প্রতিযোগিতা রহিয়াছে, উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি পাইলে তাহাতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হইতে হয়। এমনিতেই সুদের উচ্চহার এবং ব্যাবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হইলে নিয়মিত ঋণের কিস্তিও স্বাভাবিকভাবেই পরিশোধ করা দুঃসাধ্য হইয়া পড়ে। তাহার সহিত গ্যাস-বিদ্যুত্ ঘনঘন আসা-যাওয়া ও দীর্ঘসময় বিদ্যুত্ না থাকিবার সংকটে কলকারখানা সক্ষমতা অনুযায়ী চালু রাখা অসাধ্য। অথচ নির্দিষ্ট সময়ের পর হইতে উদ্যোক্তার সুদসহ ঋণের কিস্তি পরিশোধের শিডিউল চালু হইয়া যায়। এই ধরনের নানান কারণে উদ্যোক্তারা খেলাপি হইয়া পড়িলে ইহার দায় কিন্তু উদ্যোক্তার ঘাড়ে আসিয়াই পড়ে। এই অনিচ্ছাকৃত খেলাপিরা যখন কিস্তি দিতে ব্যর্থ হন, তখন দণ্ডসুদ আরোপ করিয়া তাহাকে আরো চাপে ফেলিয়া দেওয়া হয়।
বিনিয়োগের আরেকটি বড় সমস্যা হইল প্রশাসনিক জটিলতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি। আনুষ্ঠানিক নিবন্ধনপ্রাপ্তি হইতে শুরু করিয়া ব্যবসায় পরিচালনা পর্যন্ত—সকল ক্ষেত্রেই প্রশাসনের দিক হইতে প্রতিটি টেবিলে প্রক্রিয়াগত জটিলতা থাকে। প্রশ্ন হইল বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির যদি সদিচ্ছা থাকে, তাহা হইলে এত টেবিল কেন থাকিবে? ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অদক্ষ সরকারি প্রশাসনকে উল্লেখযোগ্য বড় সমস্যা বলিয়া মনে করেন দেশের ব্যবসায়ীরা। ৭২ শতাংশ ব্যবসায়ী অদক্ষ সরকারি প্রশাসনকে শীর্ষ সমস্যা হিসাবে দেখিতেছেন। এই ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বড় সমস্যা হইল যথাক্রমে দুর্নীতি ও অর্থায়নের পরিবেশ। সার্বিকভাবে লুটেরা দুর্নীতিবাজদের শায়েস্তা করিতে লাল ঘোড়া ছুটাইবার হুঁশিয়ারিও এখন আর কাজ করিতেছে না।
সুতরাং ইতিমধ্যে যাহারা শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ করিয়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ ও গ্যাসের সরবরাহের অভাবে বিভিন্নভাবে ক্ষতির শিকার হইয়াছেন, তাহাদের বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশ এবং স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অবস্থাও বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখেন। কাজেই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করিতে হইবে সর্বাগ্রে।