সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়েছে। দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতি দমন কমিশন কাজ করছে। দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ করার জোর কার্যক্রম চলছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে। কর্মচারীদের জন্য শুদ্ধাচার অনুসরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ব্যক্তিবিশেষকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এত কিছু করার পরও দেশ ও জাতি দুর্নীতিমুক্ত থাকতে পারছে না। দিনে দিনে দুর্নীতির করালগ্রাসে ডুবে যাচ্ছে। এখানে সাধারণ জনগণের বিবেচনার সঙ্গে সরকারের বিবেচনা একই অবস্থানে আছে বলে মনে হয় না। সাধারণ জনগণের বিবেচনায় যা দুর্নীতি, তা সরকারি বিবেচনায় দুর্নীতি কি না, সে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকারি ভাষ্যে দুর্নীতির সংজ্ঞা প্রকাশ্যে এলে সাধারণ জনগণের বুঝতে সহজ হয়ে যেত।
দেশের সাধারণ জনগণ খুব ভালো করেই জানে, সর্বত্র জনবলের সংকটে ধুঁকে ধুঁকে আমরা এগিয়ে চলেছি। মন্ত্রণালয়গুলো কর্মচারীর সংকটে আছে বলে সাধারণ মানুষের পাঠানো কোনো চিঠির জবাব পায় না। সব সময় রেডি রেফারেন্স নিয়ে চিঠির খোঁজ করতে হয়। অধিদপ্তর-পরিদপ্তরগুলোরও একই অবস্থা। কোথায় কী হচ্ছে, তার সঠিক খোঁজ তারা রাখতে পারছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিনরাত পরিশ্রম করেও জনবলের সংকটে জনসেবা করতে পারছে না। একদিকের নালা বন্ধ করতে গেলে অন্যদিকে সমুদ্র হয়ে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশন-পৌরসভাগুলো অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। ব্যাংকে জনবল কম থাকায় লুটপাট, জালিয়াতি দিনে দিনে বাড়ছে। হাসপাতালের জনবলের সংকটে সেবা সোনার হরিণ। কারিগরি কর্মক্ষেত্রে জনবলের সংকটে নির্মাণের জীবনকাল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুত্-পানি-গ্যাস-টেলিফোন ইত্যাদির সেবা ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল অবস্থা’। কৃষি-শিল্প জনবলের সংকটে বেহাল। শিক্ষায় জনবলের সংকটে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। রাজস্ব বোর্ড জনবলের সংকটে, জেলা প্রশাসন জনবলের সংকটে, ভূমি প্রশাসন জনবলের সংকটে। এভাবে যদি জনবলের সংকটের খোঁজ করা যায়, তবে দেশের একটা জায়গাও পাওয়া যাবে না, যেখানে সংকট নেই। এই সংকটের কারণে দেশের সর্বত্র সাধারণ জনগণের দৃষ্টিতে অরাজকতার সৃষ্টি হয়েছে। এখন সরকারকেই অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে কোনটা অরাজকতা আর কোনটা নয়। তাহলেই সাধারণ জনগণের মনের কষ্ট দূর হবে।
জনবলের সংকটের ফলে দেশ ও জাতি বিশাল ক্ষতির মুখে। সর্বক্ষণ এবং সর্বত্র ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ সাধারণ জনগণের সামনে আসছে। জনগণ শুনছে বর্তমান সরকার ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও চলছে পুরাতনী গান। প্রশ্ন থেকে যায়, এই ১০ বছর দুর্নীতির পরিচর্যা করল কে বা কারা? ব্যাংক কুমিরের বাচ্চা দেখছে আর বিশাল বিশাল ঋণ দিয়ে যাচ্ছে, যা সময়ের ব্যবধানে খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। জালিয়াতি হয়েছে বলে ধরা পড়ছে। আমদানি-রপ্তানিতে কালো বিড়ালের লাফালাফি চলছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় সম্রাটদের ক্যাসিনো বাণিজ্য বা পাপিয়াদের ব্যবসার কোনো খোঁজ যেমন বছরের পর বছর দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানতে পারে না, ঠিক তেমনি বিডিআর হত্যাকাণ্ড বা হলি আর্টিজানের কোনো খবরও অগ্রীম তারা জানতে পারে না। আসলে ১০ জনের কাজ একজন করতে গিয়ে সব দিকে নজর রাখা সম্ভব হয় না। এই সুযোগ চরমভাবে কিছু মানুষ ব্যবহার করছে। দেশ এখন উন্নত দেশের কাতারে শামিল হওয়ার দৌড়ে আছে। তাই প্রায় সর্বত্র ১ টাকার পণ্য ১০০ টাকায় ক্রয়ের প্রস্তাব হচ্ছে। অনুমোদন হচ্ছে, ক্রয় করা হচ্ছে এবং এসব আলোচনায় আসলে তদন্ত কমিটি করে সামাল দেওয়া হচ্ছে। বিচিত্র সব বিষয়ের অনুমোদন নিয়ে বিদেশ সফর চলছে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের কাতারে যেতে জনগণের মানসিকতার পরিবর্তনের জন্য সস্তায় কোনো পণ্য ক্রয় বা প্রকল্প তৈরি করলে সম্মান থাকে না। দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিবেদিত বহুমূল্য ক্রয় ও প্রকল্প তৈরির কাজে আর পি কে হালদার গংরা একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হাজার হাজার কোটি টাকা পকেটে নিয়ে সপরিবারে বিমানে উঠে কানাডায় গিয়ে বসবাস করতে শুরু করে দেয়। দায়িত্বপ্রাপ্তরা ঘুম থেকে উঠে দেখে, পাখি উড়ে গেছে।
শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ নাটকে হ্যামলেট যখন তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে মাকে মারতে গিয়েছিল, তখন হ্যামলেটের মা বলেছিল, ‘Don’t be cruel my child, only to be kind’। প্রত্যুত্তরে হ্যামলেট বলেছিল, ‘I must be cruel.’ আমাদের জনকল্যাণের সরকারগুলো হ্যামলেটের প্রত্যুত্তর শোনেনি, তারা মায়ের কথাটাই শুনেছে। তাই দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রতি দয়া করতে গিয়ে প্যানেল কোড করে রেখেছে ‘সরল বিশ্বাসে কৃতকর্ম কোনো অপরাধ নয়।’ তবে এখানে শর্ত আছে, সরল বিশ্বাসটা যেন উইথ কেয়ার অ্যান্ড কসাস হয়। সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্তরা সরল বিশ্বাসের ‘উইথ কেয়ার অ্যান্ড কসাস’ শব্দটিকে মাথায় নিয়ে কার্যক্রম করে চলেছে। তার ওপর আছে ‘সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮’। এক যুগ সময় নিয়ে যা শেষ পর্যন্ত অনুমোদন হয়েছে, তা সার্বিক বিচারে দায়িত্বপ্রাপ্তদের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী। সেখানে মতাদর্শগত মিল হলেই ছুটে চলার গতি রোধ করার মতো ক্রুয়েল হওয়ার সুযোগ সীমিত। প্রজাতন্ত্রের মালিকদের যে কোনো সময় যে কোনো একটা কারণে গ্রেফতার করা গেলেও এদের তা করা যায় না। বাকি দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে পড়ে থাকে জনপ্রতিনিধিরা। এরা যতক্ষণ ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকে, ততক্ষণ অপ্রতিরোধ্য। সর্বপ্রকার কাইন্ডের মধ্যে বসবাস করে। ক্ষমতার বাইরে এলেই ক্রুয়েলের মধ্যে পড়ে যায়।
দেশের জনগণ একটা বাণী পেয়েছে, ‘জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব দিতে বাধা নেই’। বাণী প্রদানকারী জনগণকে নিজের হিসাবটা দিয়ে বাণী দিলে অন্যরা উত্সাহিত হতে পারত। এতে করে দেশের জনগণ জানতে পারত একজনের বার্ষিক আয় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর কীভাবে ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি বা ১০ কোটি হয়ে যায়। এই আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার রহস্য জানা গেলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্স দেখাতে কাইন্ড না ক্রুয়েল হতে হবে, তা পরিষ্কার করার জন্য জনগণের দায়িত্ব গ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা প্রকাশ্যে আনা প্রয়োজন। শুধু বাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তিক্ত হয়ে উঠবে পরিবেশ। কিছুদিন আগের এক বাণীতে দেখা গিয়েছিল, সেকেন্ড হোমের মালিক সরকারি কর্মচারীরাই বেশি। যদিও কাজটি বেশ কঠিন বলে দীর্ঘদিনেও এই সেকেন্ড হোমের তালিকা পূর্ণতা পায়নি। যদিও করোনাকাল ও জনবলের সংকটের কারণে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়িত হচ্ছে না। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণকারী জনপ্রতিনিধিদের পরিবারের খোঁজে সেকেন্ড হোমে গমন জনগণ দেখছে। সেকেন্ড হোমের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ্যে আনা হলেই কমবেশি কারা তা জানা যেত। তাই ‘দূতাবাসেও জনবলের সংকট, রুটিন কাজ করার জনবল নেই, নতুন কাজ কখন করবে?’—এই বাণীর মধ্যেই ঘোরাঘুরি করছে দুর্নীতির জিরো টলারেন্স।
শুদ্ধাচার চর্চা করে, পুরস্কৃত করে কোনো লাভ হয়েছে এমনটা সাধারণ মানুষ খুঁজে পায় না। আজ মন্ত্রী যে প্রজেক্টের সমালোচনা করছেন, কাল সেই প্রজেক্টের বিভাগীয় প্রধান শুদ্ধাচার পুরস্কার পাচ্ছেন। সরকার যেখানে শুদ্ধাচার চর্চার ব্যবস্থা করেছেন সেখানে একজনকে তো পুরস্কার দিতেই হবে!
n লেখক :প্রাবন্ধিক ও সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স,
বাংলাদেশ (আইডিইবি)