প্রায় ২০ মাস ধরিয়া বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা বিরাজ করিতেছে। যদিও চলতি বত্সর বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরিয়া দাঁড়াইবার আশাবাদ ব্যক্ত করিয়াছেন বিশ্বের বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ। কিছুদিন পূর্বে রয়টার্সের এক জরিপে জানা গিয়াছে, এই বত্সর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পালে এতটাই হাওয়া লাগিবে যে, ১৯৭০ সালের পর যাহা নাকি আর দেখা যায় নাই! ৫০০ জন অর্থনীতিবিদের উপর এই জরিপ পরিচালনা করা হইয়াছিল। তবে একই সঙ্গে অনেকে মনে করিতেছেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথ অতটা সহজ-সরল হইবে না হয়তো। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচাইতে বড় খবর হইতেছে চীনের সংকট-পূর্বকালে ফেরত যাইবার সম্ভাবনা। যেই গতিতে চীন করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনিয়াছে, একই গতিতে তাহারা অর্থনীতিকে প্রাক্-কোভিড পর্যায়ে লইয়া যাইতেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘুরিয়া দাঁড়াইবার চিত্র ক্রমশ স্পষ্ট হইতেছে। বাইডেন প্রশাসনের প্রণোদনা প্যাকেজের কল্যাণে ১৯৮৪ সালের পর ২০২১ সালে দেশটির সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হইবে পূর্বাভাস দিয়াছেন দেশটির অর্থনীতিবিদেরা।
তবে এই সকল ভালো খবরের পাশাপাশি আমরা দেখিতে পাইতেছি মূল্যবৃদ্ধির দুষ্টক্ষত। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যান চেজ তুলিয়া ধরিয়াছে মূল্যবৃদ্ধির কারণ। তাহারা বলিতেছে, করোনা ভাইরাস বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যেই মন্দা তৈরি করিয়াছিল, টিকা আসিয়া যাওয়ায় তাহা হইতে ঘুরিয়া দাঁড়াইবার বড় সম্ভাবনা তৈরি হইয়াছে এবং ইহার ফলে পণ্যবাজারও ঘুরিয়া দাঁড়াইয়াছে বটে। তবে উত্পাদনের তুলনায় চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্যের সহিত যুক্ত হইয়াছে বাড়তি মূল্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির উপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে দেখা দিয়াছে বাড়তি জাহাজভাড়া। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এখন চীনের সাংহাই হইতে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত ২০ ফুটের একটি কনটেইনারের ভাড়া লাগিতেছে ১ হাজার ৭৮০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত, যাহা করোনার আগে ছিল মাত্র ৮০০ ডলারের আশপাশে। এই অবস্থায় এই দেশের শিল্পকারখানার মালিকরা কী করিয়া তাহাদের উত্পাদন সাযুজ্যপূর্ণ করিবেন? আরো বড় প্রশ্ন হইল—বিনিয়োগের এত বিচিত্র সমস্যা এই দেশে রহিয়াছে যে, একজন বিচক্ষণ বিনিয়োগকারী কেন এই দেশে কলকারখানা করিবেন? কারণ, এই দেশের বিনিয়োগকারীরা কেবল এই দেশের নিজস্ব কাঁচামালের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিয়া কলকারখানা চালাইতে পারেন না। তাহাদের নানাবিধ মালামাল বিদেশ হইতে আমদানি করিতেই হয়। স্পষ্ট করিয়া বলা যায়, যাহারা সকল ক্ষেত্রে বাহিরের উপর নির্ভরশীল, তাহারা একরকম জিম্মি হইয়া থাকেন। সুতরাং শিল্পোন্নত দেশগুলি যত সহজে করোনার মন্দা হইতে বাহির হইয়া আসিতে পারিবে, আমরা ততটা সহজে পারিব না।
এখন বাজারে কোনো কোনো পণ্যমূল্যে আগুন লাগিলে তাহা প্রশমিত করিবার জন্য দেশের শীর্ষ ব্যবস্থাপকদের সমাধানের পথ বাহির করিতে হইবে। রেমিট্যান্সসহ এক-আধটি বিষয় ছাড়া আমাদের পাত্রটি এক অর্থে শূন্য। সেই শূন্য পাত্রে বাতাস শিস কাটিয়া শব্দ তুলিতে পারে বটে। তখন মনে হইতে পারে উহাতে অনেক কিছু রহিয়াছে, উহা শূন্য নহে। কিন্তু সত্য স্বীকার করিবার মধ্যে সমাধানের সদিচ্ছা লুকাইয়া থাকে। সুতরাং সত্যকে স্বীকার করা জরুরি। ১৯২৯ সালের অক্টোবর হইতে ১৯৩৪ পর্যন্ত যখন আমেরিকায় মহামন্দা দেখা দিয়াছিল এবং তাহার ঢেউ ছড়াইয়া পড়িয়াছিল বিশ্বব্যাপী, তখন আমেরিকার তাবড় তাবড় অর্থনীতিবিদ ইহার কারণ ও তাহার সমাধানের পথ নির্ণয় করিয়াছিলেন। এই জন্য মহামন্দার সংকটজালে আমেরিকাকে বেশি দিন আটকাইয়া থাকিতে হয় নাই। মনে করা হয়, আমাদের দেশেও অনেক জ্ঞানীগুণী অর্থনীতিবিদ রহিয়াছেন। কেবল সমালোচনা করা তাহাদের কাজ হইতে পারে না। আমাদের বর্তমান বিদ্যমান সংকটের উত্তরণের পথও তাহাদের বাতলাইয়া দিতে হইবে। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হইবে। একই সঙ্গে আমাদের ধৈর্যশীল হইতে হইবে। তাড়াহুড়ায় কখনো সঠিক সমাধান হয় না।