বাংলাদেশে মত্স্য উত্পাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। মাগুর, শিং, কই, পাবদা, ট্যাংরা, বাইন, শোল, বোয়াল আরো অনেক ধরনের প্রায় বিলুপ্ত মাছ এখন চাষ হচ্ছে এবং তা বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। চাষের মাধ্যমে মত্স্য উত্পাদন বিশ্বের ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। মিঠা পানির মত্স্য চাষে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে মত্স্য খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.১০ শতাংশ। এই মহামারি পরিস্থিতিতে এ অর্জন এক কথায় অসাধারণ। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মত্স্য উত্পাদন আহরণ এবং সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে জড়িত অর্থাত্ কর্মসংস্থান হয়েছে। ইলিশ থেকে ১ শতাংশ জিডিপি জোগান আসে। ৮৬ শতাংশ ইলিশ বাংলাদেশে উত্পাদন হয়। গ্রহণকৃত আমিষের ৬০ শতাংশ গ্রহণ করা হয় মত্স্য থেকে। দেশের মোট আয়কৃত বৈদেশিক মুদ্রা ৪.৯ শতাংশ আসে রপ্তানিকৃত মত্স্য খাত থেকে। করোনার বছরেই ৪ হাজার কোটি টাকা আয় হয়েছে মাছ রপ্তানি থেকে। বিগত দুই দশকে আহরণকৃত মত্স্য উত্পাদন বৃদ্ধি ৬ শতাংশ। সেখানে চাষকৃত মত্স্য উত্পাদনের বৃদ্ধি হয়েছে ২২ শতাংশ। এটা প্রমাণ করে যে আর্থসামজিক উন্নয়নে বাংলাদেশের জনগণের মত্স্য চাষের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার পরও দেশে জনপ্রতি মাছের বার্ষিক চাহিদা হলো ১৮ কেজি এবং জনপ্রতি মাছ গ্রহণ করা হয় ১৬.৬২ কেজি অর্থাত্ চাহিদা অনুযায়ী বার্ষিক মাছ গ্রহণের ঘাটতি রয়েছে জনপ্রতি ১.৩৮ কেজি।
যদি সদিচ্ছা থাকে, মত্স্য চাষের মাধ্যমে ও অতি সহজে বেকারত্ব দূর করা যায়। তাই সরকার মত্স্য চাষের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশের বরেন্দ্রভূমি, পাহাড়ি অঞ্চল, মঙ্গা এলাকা, প্লাবিত এলাকা, ক্ষুদ্র পুকুর, খাল বিলে হরেক রকমভাবে মত্স্য চাষ করা যায়। মত্স্য বিশেষজ্ঞরা গবেষণা করে মত্স্য চাষে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বৈচিত্র্য এনেছেন। সে গবেষণার ফল হলো ‘দাউদকান্দি মডেল’। দাউদকান্দিতে ১৯৮৬ সালে প্রথম প্লাবনভূমিতে মত্স্য চাষ শুরু হয়। এ পদ্ধতিতে ধানখেতে বর্ষা মৌসুমে মাছ এবং শুকনো মৌসুমে ধান চাষ করা হয়। দাউদকান্দিতে মহাসড়ক এর পার্শ্বে বিস্তৃর্ণ এলাকা বেশ কয়েকটি গ্রাম নিয়ে প্লাবিত জমিতে গড়ে উঠেছে বহু মত্স্য প্রকল্প। জলাবদ্ধতার কারণে দাউদকান্দিতে এক ফসলের বেশি হয় না। ফসল খুবই কম হতো। ক্ষুধাদারিদ্র্য এদের নিত্যসঙ্গী ছিল। এ জলাবদ্ধতা কাজে লাগিয়ে কীভাবে মত্স্য চাষ করা যায় এ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। জলাবদ্ধতার স্থায়িত্বকাল পাঁচ-ছয় মাস। সাধারণত বড় আকারের জলাভূমি, যেখানে বর্ষাকালে পানি প্রবেশ করে, যে পানি বেশ কয়েক মাস স্থায়ী হয়—অমন জমি মত্স্য চাষের জন্য নির্ধারিত হয়। বিরাট এলাকার প্লাবিত ফসলি জমিকেই বাছাই করে নেওয়া হয়। জমির চারদিকে উঁচু করে বাঁধ দেওয়া হয়। যা মানুষের চলাচলের জন্য সড়ক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বাঁধ দেওয়ার ফলে পানি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
প্লাবনভূমিতে মাছ চাষ করার জন্য সাধারণত কোনো কৃত্রিম খাবারের প্রয়োজন হয় না। প্রাকৃতিকভাবে যে খাবার উত্পাদিত হয়, তা-ই মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহূত হয়। তুলনামূলকভাবে এ প্রক্রিয়ায় মত্স্য উত্পাদনে খরচ কম। মত্স্য উত্পাদন লাভজনক হওয়ায় বৃহত্ আকারে ৭০টি মত্স্য খামার সেখানে হয়েছে। এ মত্স্য খামারে রুই, মৃগেল, কাতল, সিলভার কার্প, পাঙাশ সরপুঁটি, তেলাপিয়া চাষ হয়। এ মাছ ক্রয় করার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকার আসে। খুব ভোরবেলা থেকে এদের হাঁকডাক শুরু হয়। প্লাবনভূমিতে মত্স্য চাষের পাশাপাশি হাঁস চাষ করে ও স্বল্পতায় পুঁজিতে বেশ লাভবান হওয়া যায়। প্রত্যেকটি খামারে ধনী-গরিব সমন্বয়ে শেয়ারের মাধ্যমে খামারে অংশগ্রহণ থাকে। শেয়ারহোল্ডাররা আনুপাতিক হারে খরচ বহন করে থাকে। লাভের অংশ শেয়ারহোল্ডাররা আনুপাতিক হারে পেয়ে থাকে। প্লাবন ভূমিতে মত্স্য চাষ এরই মধ্যে আরো আটটি জেলায় শুরু হয়েছে। তা ছাড়া ভারত, লাইবেরিয়া, মালয়েশিয়া ফিজি, পাপুয়া নিউগিনি, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্গার রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের লোকজন অভিজ্ঞতা বিনিময় করার জন্য প্রকল্পটি পরির্দশন ও করেছেন।
আরেকটি মত্স্য চাষের পদ্ধতি হলো ‘সমন্বিত মত্স্য খামার’। সমন্বিত মাছ চাষ বলতে হাঁস-মুরগি, গবাদি পশু, এবং অন্যান্য কৃষিজাত ফসলের মিশ্র চাষপদ্ধতিকে বোঝায়। সমন্বিত মত্স্য চাষে সার প্রয়োগ না করে ও পুকুর-দিঘিতে আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা যেতে পারে। সমন্বিত মাছ পদ্ধতিতে গবাদি পশুর গোবর এবং হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা সার হিসেবে ব্যবহার করে পুকুরে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য সরবরাহ করা যায়। গবাদি পশু পালন ছাড়া ও মাছের সঙ্গে পুকুর পাড়ে শাকসবজি ও রেশমকীটের চাষ করা যায়। এ পদ্ধতি সহজে অধিক লাভবান হওয়ার আশা ও করা যায়। প্লাবনভূমিতে মত্স্য চাষ এবং সমন্বিত মত্স্য চাষ ছাড়া ও আর ও অনেক আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের পদ্ধতি আছে। যেহেতু মত্স্য রপ্তানি হয় চাহিদা ও বেশ আছে, তাই তরুণ ও যুবসমাজ বেকারত্ব এর মধ্যে না থেকে যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মত্স্য চাষে নিজেকে আত্মনিয়োগ করা অতি উত্তম। মত্স্য চাষের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও সহজ। মত্স্য উত্পাদন বাড়লে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’—এ ধারাটিও অব্যাহত থাকবে।
n লেখক :ব্যাংকার