২৩ মে ২০২১ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক খবরের শিরোনাম ছিল—থমকে আছে চাকরির বাজার, বিসিএসেও জট, অনিশ্চয়তা ও হতাশায় চাকরিপ্রত্যাশীরা। সংবাদের মোদ্দা কথায়, করোনা মহামারির কারণে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানেই কার্যত জনবল নিয়োগ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ ছিল—সেই বিষয়টিই উঠে আসে। এর বাইরে নয় সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও। অন্যদিকে, করোনার তাণ্ডব শুরুর পরপরই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন থেকেই শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নানা ধরনের মত দিয়ে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। গত দেড় বছরে করোনার থাবাকে মাড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু রাখা হয় গার্মেন্টস, ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। সেইসঙ্গে করোনা রোগীদের যথাযথ চিকিত্সা দিতে এবং চিকিত্সকসংকট কাটাতে মহামারির মধ্যেই পিএসসি ৩৯তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে চিকিত্সক নিয়োগদান কার্যক্রম শেষ করে।
দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। সব বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলের ৫৪ হাজারেরও বেশি পদে শিক্ষক নিয়োগ সুপারিশ করতে এ বছরের ৪ এপ্রিল থেকে অনলাইনে আবেদন নেওয়া শুরু করে এনটিআরসিএ। নিবন্ধনধারী প্রার্থীরা যথাসময়ে অনলাইনে আবেদন করলেও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক তাদের নিয়োগ সুপারিশ আটকে যায়। পরে, আইনি সব ঝামেলা কাটিয়ে এ বছরের ১৫ জুলাই ৩৮ হাজার ২৮৬ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে এনটিআরসিএ। চলমান করোনা পরিস্থিতির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা সত্ত্বেও এই ৩৮ হাজার শিক্ষককে নিয়োগে সুপারিশ করার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে প্রশংসা করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বোদ্ধারা। কিন্তু, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে এ পর্যন্ত কখনো পুলিশ ভেরিফিকেশন না হলেও এই ৩৮ হাজার শিক্ষকের পুলিশ ভেরিফিকেশন করার সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরে, এ বছরের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও এখনো পুলিশ ভেরিফিকেশন শুরু হয়নি এ ৩৮ হাজার শিক্ষকের। যার ফলে, শিক্ষকসংকটের বোঝা মাথায় নিয়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চালাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা।
এর আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশের সরকারি হাইস্কুলে শিক্ষক নিয়োগের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পিএসসি। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আবেদনকারীদের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায় পিএসসি। মৌখিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর এই ২ হাজার ১০০ প্রার্থীর চলমান পুলিশ ভেরিফিকেশন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় সাড়ে আট মাস অতিবাহিত হলেও আজও প্রতিষ্ঠানে যোগদান করতে পারেনি উক্ত শিক্ষকরা। অপর পক্ষে, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় প্রতিদিনই অবসর, মৃত্যু এবং পদত্যাগসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষকের পদ শূন্য হচ্ছে। এতে শিক্ষকসংকট বাড়ছে। গত দেড় বছরে আরো প্রায় লক্ষাধিক শিক্ষকের পদ শূন্য হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ঘোষিত সর্বশেষ কারিকুলাম অনুযায়ী মাধ্যমিকে আরো নতুন চারটি বিষয়কে সংযুক্ত করা হয়। বিষয়গুলো হলো—তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি), কর্মমুখী শিক্ষা, শারীরিক শিক্ষা, চারু ও কারুকলা। দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি এবং কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষকের সংকট এখনো চলমান।
ভুক্তভোগী নির্বাচিত এসব শিক্ষকদের করোনার কারণে চলা অর্থনৈতিক সংকট, নিয়োগ দীর্ঘসূত্রতায় জীবনকে আরো দুর্বিসহ করে তোলার সঙ্গে সঙ্গে বেকারত্বের জীবনকে দীর্ঘায়িত করে ফেলছে। মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদে করোনাকালে যেভাবে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ডাক্তার এবং নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, একইভাবে করোনায় বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে টেনে তুলতে এবং শিক্ষার ক্ষতি পোষাতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সময়ের দাবি। নির্বাচিত শিক্ষকদের দাবি, উক্ত ৩৮ হাজার ২৮৬ জন প্রার্থীর মধ্যে যদি কোনো প্রার্থী রাষ্ট্রবিরোধী, ফৌজদারি বা অন্য কোনো মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে থাকে এবং তার বিরুদ্ধে যদি যথোপযুক্ত প্রমাণ মিলে, তাহলে তত্ক্ষণাত্ চাকরিচ্যুত করার শর্তে সুপারিশপত্র দিয়ে যোগদানের ব্যবস্থা এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি ব্যাংক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের নিয়োগ পদ্ধতির ন্যায় পরে পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হোক।
মহামারি করোনার তাণ্ডব একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা শৃঙ্খলকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে, সেইসঙ্গে শিক্ষকসংকট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে চলা শিক্ষার ক্ষতি পোষাতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দানের মাধ্যমে শিক্ষকসংকট কিছুটা লাঘব করে পরবর্তীকালে নবনিযুক্ত শিক্ষকদের অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সরকারের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিকতা কাম্য।
n লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়