বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়তে আসা আনারুল (২২) নামের এক ছাত্রের এক হাতের দুইটি আঙুল কেটে নেওয়ার অভিযোগে তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত দু’দিন ধরে এই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলেও থানায় কোন মামলা হয়নি। এমনকি ওই শিক্ষার্থীর আঙুল অন্য কেউ কেটে দিয়েছে নাকি নিজেই কেটেছে কেউ পরিষ্কার বলতে পারেনি।
বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে এ ব্যাপারে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রশাসনের এক জরুরি বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ঘটনাটি পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়েছে।
বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পঞ্চম পর্বে বদলি শিক্ষার্থী হিসেবে আনারুলের ভর্তি হওয়ার কথা ছিল। তিনি জয়পুরহাট টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে বগুড়া পলিটেকনিক থেকে বদলির ছাড়পত্র নিয়ে এসেছিলেন। ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবরের মধ্যে তার ভর্তির সময় বেঁধে দেওয়া আছে।
এখানে ভর্তি হওয়ার জন্যই ১১ সেপ্টেম্বর বাড়ি থেকে এসে বগুড়া শহরের চকফরিদ এতিমখানা–সংলগ্ন ইঞ্জিনিয়ার ছাত্রাবাসে উঠেছিলেন আনারুল। ২১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে আটটার দিকে সন্ত্রাসীরা দিনের বেলা মেসে ঢুকে চাঁদা না পেয়ে তার হাতের আঙুল কেটে দেয় বলে দাবি করে আনারুলের। পরে স্থানীয় এক নারী অজ্ঞান অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সন্ত্রাসীদের ভয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে মেসে না ফিরে নওগাঁর ধামইরহাটে বাড়িতে গেছেন তিনি। মঙ্গলবার রাতে ফেসবুকে তার আঙুল কাটা হাতের ছবি ও সংক্ষিপ্ত ভিডিও ক্লিপের পোষ্ট দেখে সবাই বিষয়টি জানতে পারেন। পরে ফেসবুকে ধামইরহাটের এক সাংবাদিক লেখেন হলের বড়ো ভাইরা তার কাছে চাঁদা চেয়ে না পেয়ে তার হাতের তিনটি আঙুল কেটে নিয়ে তাকে চিকিৎসার জন্য শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয় ।
বিষয়টি নিয়ে তখন থেকেই ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে। কারণ বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে আনারুলকে নেওয়ার পথে সে দাবি করে মেসের সামনেই তার ওপরে হামলা হয়। পরে হাসপাতালে ভর্তির পর পুলিশকে জানায় মেসের ভেতরে বাথরুমে ঢুকে সে নিজেই নিজের আঙুল কেটেছে। আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি গিয়ে দাবি করেছে তারই কলেজের ওপরের ক্লাসের দুই ছাত্র তার কাছে দাবি করা টাকা না পেয়ে তার মুখে কাপড় গুজে দিয়ে হাতের দুই আঙুল কেটে দিয়েছে।
আনারুল যে মেসে থাকতো সেই মেসের পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম বাচ্চু জানান, গত ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে আনোয়ারুল হাতের আঙুল কাটা অবস্থায় হাসপাতালে যাওয়ার সময় স্থানীয়রা তার রক্তাক্ত হাত দেখে চিৎকার শুরু করে। পরে মেসের অন্যান্য ছাত্র ও বাসার মালিক বের হন। সে সময় আনোয়ারুল জানায়, সামনের দোকানে ওষুধ কিনতে গেলে কয়েকজন যুবক তার মোবাইল ছিনিয়ে নিতে গিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলে আঙুল কেটে যায়। তাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়ে ওষুধের দোকান ও আশপাশে খোঁজ নিতে গেলে দেখা যায় তেমন কোন ঘটনার বিষয় কেউ জানে না, এমনকি রাস্তায় কোন রক্তও নেই। বিষয়টি জানার পর হাসপাতালের পথে তার সাথে থাকা অন্য ছাত্রদের বিষয়টি জানালে তাকে পুনরায় ওই ছাত্ররা জিজ্ঞাসা করে, তখন সে জানায় মেসের গেটে তার ওপরে হামলা হয়েছে। কিন্তু মেসের গেটেও রক্তের কোন দাগ ছিলো না।
পরে বিষয়টি বনানী পুলিশ ফাঁড়িকে অবহিত করা হয়। তখন পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে তার কাছে ঘটনা জানতে চাইলে সে পুলিশকে জানায়, বাড়ি থেকে কয়েক দফা স্মার্ট ফোন কিনতে চেয়েও তা না পাওয়ায় সে হতাশা থেকে নিজেই মেসের ওয়াশ রুমে ঢুকে নিজের আঙুল কেটে ফেলেছে।
মুঠোফোনে আনারুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, জয়পুরহাট থেকে বদলির কাগজপত্র নিয়ে বগুড়া ১১ সেপ্টেম্বর বগুড়ায় আসেন। ওঠেন বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পাশে চকফরিদ এতিমখানাসংলগ্ন ‘ইঞ্জিনিয়ার ছাত্রাবাস’ নামে একটি মেসে। ২১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে মেসের দোতলায় ডাইনিংয়ে খেতে যান তিনি। খাওয়াদাওয়া সেরে বারান্দায় সবে দাঁড়িয়েছেন, এ সময় দুজন যুবক তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মুখ চেপে ধরে দোতলার একটি বাথরুমে নিয়ে যান। এরপর তারা চাঁদা ও মুঠোফোন দাবি করেন। কিন্তু চাঁদা না দেওয়া তারা ধারালো চাকু দিয়ে তার ডান হাতের দুই আঙুল কেটে দেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে মেসের বাইরে ফেলে রেখে তারা পালিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন জড়ো হওয়ার পর একজন নারী তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে দেন।
এ বিষয়ে বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী জয়নাল আবেদীন বলেন, বিষয়টি নিয়ে বুধবার একাডেমিক কাউন্সিল ও প্রশাসনিক কমিটির সভা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনা খতিয়ে দেখতে ইনস্টিটিউটের মেকানিক্যাল বিভাগের প্রাণ শফিউল আল আজিজকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা বাড়িতে গিয়ে ওই শিক্ষার্থী এবং তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, বিষয়টি নজরে আসার পর বুধবার ওই মেসে গিয়ে শিক্ষার্থী ও মেসমালিকের সঙ্গে কথা বলে এবং সিসিটিভির ফুটেজ পরীক্ষা করে কেউ তার (আনারুল) আঙুল কেটে নিয়েছে, এমন ঘটনার সত্যতা মেলেনি। বিষয়টি অধিকতর তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ইত্তেফাক/এসজেড