জয়া ফারহানা
না, প্রতি বছর সড়কে কত হাজার মানুষ হত্যা হয়, আজ সে পরিসংখ্যান দেব না। পরিসংখ্যান সড়কে হত্যার দুঃখ বোঝাতে অক্ষম। যখন আমরা বলি, প্রতি বছর সড়কে পাঁচ হাজার দুর্ঘটনা ঘটে, চার হাজার মানুষ হত্যা হয়, আহত হয় তারও দ্বিগুণ, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এত হাজার কোটি টাকা তখন আমরা কিছু সংখ্যাকেই উপস্থাপন করতে পারি মাত্র। সড়ক হত্যার ক্ষতি বোঝাতে পারি না। কোনো পরিবারে একজন সদস্যের মৃত্যু মানে সেই পরিবারটির মৃত্যু। আর সেই সদস্যটি যদি হয় শিশু তাহলে ক্ষতির ব্যথা এবং আঘাতের পরিমাণ টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না। প্রত্যেকটি শিশু তার পরিবারে স্বপ্নের সলতে জ্বালিয়ে রাখে। সুচিও তেমন এক শিশু যে উত্তরার খোলা মাঠে প্রাণ ভরে খেলতে চেয়েছিল, শুনতে চেয়েছিল পাখিদের ডাক। কিন্তু এদেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা এমনই বর্বর এমনই অমানবিক যা একটি শিশুর খুব ছোট্ট এই স্বপ্নটুকুও পূরণ হতে দেয় না। ঘাতক মাইক্রোবাসের ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ার পর বাঁচার সম্ভাবনা থাকলেও বাঁচতে দেয় না। সড়কের এই বর্বর সংস্কৃতি কি অপ্রতিরোধ্য? হয়ত তাই।
কারণ, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যত লেখা হয়েছে, যত বক্তৃতা, যত সভা সেমিনার গবেষণা, গোলটেবিল বৈঠক, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ, মানববন্ধন হয়েছে অন্য আর কোন সমস্যা নিয়ে তা হয়নি। কিন্তু সড়ক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। না কমেছে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা, না প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সড়কের শৃঙ্খলা, না কমেছে সড়কে হত্যার উত্সব। সড়কে যা চলে তাকে বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্য বললে খুব কম বলা হয়। প্রকৃত অর্থে সড়কে যা চলে তার নাম বর্বরতা। সুচির কথাই ধরা যাক। ১০ বছরের শিশু সুচিকে ধাক্কা দেয়া মাইক্রোবাসটি যদি ন্যূনতম মানবিকতার পরিচয় দিত বেঁচে যেত একটি জীবন, একটি পরিবার। কিন্তু হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিবেক বোধ থাকে না, মানবিকতা থাকে না, কাণ্ডজ্ঞানও থাকে না। নইলে কেমন করে একটি জীবন্ত শিশুকে পুনর্বার চাকার তলে পিষ্ট করা যায়?
দুই :বহুবার শুনেছি, সড়কের তুলনায় যানবাহন বেশি, শুনেছি রাস্তাঘাটের নানান ত্রুটিবিচ্যুতির কথা, ভুয়া লাইসেন্সধারী ১০ লাখ চালকের কথা। আবার বৈধ লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে এমন চালকদের ৩১ শতাংশের কোনো অনুমোদিত ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করার কথাও শুনেছি। অতএব, এই তালিকায় যখন তখন আমাদের যে কারো নাম যুক্ত হয়ে যেতে পারে। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের যেসব সদস্য দেশ সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে, বাংলাদেশও আছে সে তালিকায়। সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও, কীভাবে সেটা সম্ভব তার কোনো পরিকল্পনা নেই অথবা পরিকল্পন হয়তো আছে কিন্তু তার সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়।
তিন :প্রতিকার ও প্রতিরোধ নেই জেনে এবং সেই আশঙ্কা নিয়েই আমরা সড়কে নামি প্রতিদিন। প্রতিদিন কেউ না কেউ এই নৈরাজ্যের বলি হয়। কিছু ক্ষেত্রে স্থবির নাগরিক টনক নড়ে ওঠে। দুর্ঘটনা বিশ্লেষকরা সংক্ষুব্ধ প্রশ্ন তোলেন। তারপর সব আগের মতোই চলতে থাকে।
রাজধানীর তিনটি প্রধান করিডোরের অন্যতম রামপুরা থেকে কুড়িল সড়কের দুইপাশে আলাদা লেন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে রিকশাসহ অযান্ত্রিক যান চলাচলের জন্য। পরীক্ষামূলকভাবে চালুও হয়েছে এই লেন। কুড়িল রামপুরা সড়কের পাশের অংশ পার্কিং ও অন্যান্য কারণে প্রায় অব্যবহূত থাকে। কিন্তু এখন ওই অংশ অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচলের জন্য নির্ধারণ করে দেয়ায় যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল বন্ধ হয়েছে। তাতে যান্ত্রিক যানবাহনের গতি বেড়েছে। আলাদা লেন চালুর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আশাজাগানিয়া সাফল্য অর্জিত হয়েছে। যেখানে-সেখানে রাস্তা পারাপার বন্ধ এবং ফুটপাত দখলমুক্ত হয়েছে। ট্রাফিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে সেখানে, সিগন্যালে অথবা মোড়ে এখন নাকি ট্রাফিককে ঘুষ নিতে দেখা যায় না। বড় বড় রাস্তায় ডিভাইডার তৈরি হয়েছে। শ্লথ গতির যানবাহন নিষিদ্ধ হয়েছে। জেব্রা ক্রসিংয়ের সম্পূর্ণ ব্যবস্থাও হবে খুব শিগগির। মেট্রো রেলের ব্যবস্থা হচ্ছে। এতে প্রতিদিন ৬০ হাজার যাত্রী চলাচল করতে পারবে। উত্তরা থেকে মিরপুর, সায়েদাবাদ যেতে সময় লাগবে মোটে ৪০ মিনিট। যানজটও আর থাকবে না নাকি। ২০১৯ সালে চালু হবে র্যাপিড ট্রানজিট [এম.আর.টি-৬]। জমে ওঠে টক শো। তখন কারো কারো মনে হতে থাকে, বাহ্ সবাই তো বেশ তত্পর। সবই তো চলছে ঠিকঠাক। অনেকেই ভাবেন, উন্নয়নের মহাসড়কে তো পৌঁছেই গেলাম। কেউ কেউ অবশ্য হাই তোলেন। পরদিন টেলিভিশন পর্দায় আবার সড়ক দুর্ঘটনার ব্রেকিং নিউজ.. পত্রিকায় আবার দুর্ঘটনার সংবাদ... আবার কিছু মানুষের মৃত্যু.. আবার কিছু মানুষের সব হারিয়ে ফেলার করুণ ছবি.. কিছু আবেগময় সংবাদ শিরোনাম.. হা কপাল! আবার টক শো.. আবার সড়ক উন্নয়ন.. তারপর আবার যেই কে সেই.. এ এক অলঙ্ঘনীয় ভিসিয়াস সাইকেল...
n লেখক: প্রাবন্ধিক