মোহম্মদ বায়েজিদ
হরহামেশাই দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা সোশ্যাল মিডিয়াতে কোনো না কোনো জিনিস হঠাত্ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, সবাই তা নিয়ে কথা বলছে, সেই বিষয় নিয়ে অনেকেই নিজেদের স্ট্যাটাস আপডেট করছে, নিজেদের মাঝে তা নিয়ে আলোচনা করছে, ট্রল করছে ইত্যাদি। ভার্চুয়াল জগতের ভাষায় এটাকে ভাইরাল হওয়া বলে। গত এক বছরের হিসাব করলেই দেখা যাবে এরকম অসংখ্য জিনিস ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা ইউটিউবে এবং এর ব্যবহারকারীরা তা নিয়ে মাতামাতি করেছে। হঠাত্ করেই বিশেষ কোনো কথা বা ছবি ফেসবুকের নিউজফিড সয়লাব হয়ে গিয়েছে বা কোনো ভিডিও ইউটিউব এ আপলোড দেওয়ার পরে মুহূর্তের মাঝে তার ভিউয়ার হাজার হাজার বেড়ে যাচ্ছে। একটু ক্ষতিয়ে বিচার করলেই দেখা যায় যেই জিনিসগুলো সাধারণত ভাইরাল হয় সেগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যথেষ্ট নিম্নরুচিকর অপ্রয়োজনীয় এবং কিছু ক্ষেত্রে তা নেতিবাচক হয় যা আমাদের নির্মল সাংস্কৃতির পরিপন্থি। ইংরেজিতে shallow নামক একটা টার্ম আছে, এর আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ হচ্ছে ভাসা ভাসা বা এমন জিনিস যার গভীরতা কম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যেই জিনিসগুলো ভাইরাল হয়ে যায়, সেই জিনিসগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় খুব হালকা ধাঁচের। ফেসবুক বা টুইটার স্ক্রল করে আমরা যে-সকল জিনিস দেখি সেগুলোও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় অগুরুত্বপূর্ণ, তবুও এর ব্যবহারকারীরা স্ক্রল করে যায়, এর কারণটা হচ্ছে এটা করতে তাদের কোনো প্রকার আলাদা শ্রম প্রয়োজন হয় না। অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায় একবার ফেসবুকে ঢুকে স্ক্রল করা শুরু করলে নিউজফিড এমনভাবে ঘুরিয়ে বেড়ায়, কীভাবে কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে যায় সেটা সে নিজেও জানে না। অথচ নিউজফিডে যে সকল তথ্য বা ছবি ঘোরাফেরা করে তা হয় অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয়। অনেকে সারাদিন অযথাই ফেসবুকে কী খাচ্ছেন, কী করছেন এরকম একান্ত, অন্যের জন্য অপ্রয়োজনীয় বিষয় ফেসবুকে পোস্ট করতে থাকেন। এসব করে অনেকে আবার অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজের জন্য অহেতুক স্বীকৃতি আদায় করতে চান।
কীভাবে মস্তিষ্কে অভ্যাস তৈরি হয় এবং অভ্যাস কীভাবে কাজ করে এটা জানার জন্যে ৯০-এর দশকে এমআইটি-তে ‘অভ্যাস’ নিয়ে একটা গবেষণা শুরু করে।
তারা একটা ‘ঞ’ আকৃতির আবদ্ধ মেজ (maze) তৈরি করল অর্থাত্ এর শেষ মাথায় ডানে এবং বামে দুটি জায়গা। এরপর এই মেজ-এর মধ্যে কিছু ইঁদুর প্রবেশ করিয়ে গবেষণা শুরু হলো। মেজের শেষে বামপাশে পুরস্কার হিসেবে রাখা ছিল চকোলেট এবং ডানপাশে কিছুই না। ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ বোঝার জন্য সেখানে যন্ত্রপাতি আর তার লাগানো ছিল। গবেষকরা তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে এদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।
এখানে মেজ-এর শুরুতে একটা গেট লাগানো থাকে। একটা সুইচ টিপলে ক্লিক শব্দ করে গেট খুলে যায় এবং সেখানে থাকা ইঁদুরটা বেশ কৌতূহলী হয়ে মেজের ভিতর এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। শুরুর দিকে কিছু ইঁদুর মেজের শুরু থেকে এদিক-ওদিক ঘুরে একসময় শেষ মাথায় পৌঁছাল। কিছু ডান দিকে গিয়ে কিছুই পেল না, আর কিছু ইঁদুর বাম পাশে গিয়ে চকোলেট জিতে নিল। কিছু ইঁদুর ডানে গিয়ে কিছু না পেয়ে আবার ঘুরে বামে গিয়ে চকোলেট পেয়ে গেল। গবেষকরা বারবার ওই কাজটা ইঁদুরদের করতে দিল। আর এদের মস্তিষ্কে বসানো প্রোবগুলো কিছু রোমাঞ্চকর তথ্য দিল। যখন ইঁদুরগুলো এই মেজটাতে চরে বেড়াচ্ছিল তাদের মস্তিষ্ক ক্ষিপ্তভাবে কাজ করছিল। কারণ এই গোলকধাঁধা সমাধান করে চকোলেট যেতার জন্য তাদের মস্তিষ্কে নতুন দর্শন, শ্রবণ এবং ঘ্রাণ সম্পর্কিত তথ্য প্রসেস হচ্ছিল। কিন্তু এই কাজ মোটামুটি একশবার করার পর দেখা গেল মেজের শেষে এই ইঁদুরদের ভুল দিকে মোড় নেওয়া একেবারে থেমে গেছে এবং ইঁদুরগুলো অতিদ্রুত মেঝের শুরু থেকে চলতে চলতে চকোলেটের কাছে পৌঁছতে পারছে। এই সময় গবেষকদের বিস্ময়কর ব্যাপারটা চোখে পড়ল। ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কের কার্যক্রম অনেক কমে গেছে, কারণ এদের খুব বেশি চিন্তা করতে হচ্ছিল না। একই কাজ বারবার করার ফলে মস্তিষ্কে এটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে শুরু করেছে।
একজন মানুষের সমস্ত জীবনটাকে যদি একটা ঝুড়ির সঙ্গে তুলনা করা হয় তবে সেই ঝুড়িতে সে কী কুড়িয়ে রাখবে সেটা নির্ভর করে তার রুচিশীলতার ওপরে। তাই আমাদের রুচিশীলতার পরিপক্বতা ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেটেই হোক বা আমাদের ব্যক্তিজীবনে আমাদের আশপাশে অনেক জিনিসেই ঘুরে বেড়াবে, আমরা অনেক কিছুর সম্মুখীনই হব, তবে এসব কিছুর মধ্যে আমাদের নিজেদের বেছে নিতে হবে কোন জিনিসগুলোকে আমরা বেছে নেব আর কোনগুলোকে বাদ দেব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জেড এইচ শিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শরীয়তপুর