কিশোর উপন্যাস

দুরন্ত দুখু

॥ একুশ ॥

ঝিলের তীরে ভূত হাঁটে

সামনে দ্রুত এগোতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল দুখু। কানের কাছে একটা শীতল ছোঁয়া পেল। কে যেন জোরে জোরে নিশ্বাস ছেড়ে আসছে পেছন পেছন। কে? আপনমনে প্রশ্ন করে পেছনে তাকাল সে―কেউ নেই। মনে হলো একটা গাঢ় ছায়া ক্রমশ হালকা হতে হতে মিলিয়ে গেল সন্ধ্যার হালকা আঁধারের মধ্যে।

না, মনের ভুল। ভেবেই আবার এগোতে লাগল দুখু।

এবার থপ-থপ করে হেঁটে আসতে থাকা কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেল। আবারও থমকে পেছনে তাকাল। না। এবারও কাউকে দেখল না। তবে ঝটিতি প্রশ্ন উদয় হলো মনে―সন্ধ্যার পর কি মাছ খেতে ভূত নামে ঝিলে? এমন কথা শুনেছিল দুখু। পাত্তা দেয়নি তখন। বিশ্বাস করেনি। এ মুহূর্তে অবিশ্বাস্য বানানো কথার সত্যতা দেখতে পাচ্ছে। ভাবতেই রোম খাড়া হয়ে যেতে লাগল। দুখুর ঝাঁকড়া চুলও যেন শজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে গেল। শুনেছে ভয় পেলে চেপে ধরে ভূত। ভয় জয় করলে পালিয়ে যায় ওরা, তখন চেপে ধরার সাহস পায় না ভূতের দল।

আশপাশে কয়টি ভূত আছে? সামনে তাকিয়ে অনুভব করল তার পেছন পেছন ঝাঁক বেঁধে ভূতের দল ছুটে আসছে। শোঁ শোঁ করে নিশ্বাস ছাড়ছে। এখনই কি ঘাড় মটকে দেবে বলশালী কোনো ভূত?

চট করে বুদ্ধি খুলে গেল। প্রিয় সঙ্গী, তার প্রিয় বাঁশিটা চেপে ধরল মুখে। সুরের ঢেউ তুলল বাঁশিতে।

আশ্চর্য! দুখু অনুভব করল, বাঁশির সুরের জাদুতে করুণ কান্নার সুর তুলে পালিয়ে যেতে লাগল ভূতের দল।

বাঁশি বাজাতে বাজাতে হাঁটতে লাগল দুখু। দিক ঠিক আছে তো? বাড়ির দিকেই যাচ্ছি তো? এমন প্রশ্নের দাপটে আবারও ভয় পেল। আবারও শুনতে পেল শীতল শ্বাস পড়ছে। আবার বাঁশিতে সুর তুলল। সুর না থামিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো লোকালয়ে। বাঁশির সুর থেমে গেল। দেখল, না, কেউ নেই। কৃষক আর রাখাল বালকেরা দল বেঁধে ফিরছে ঘরে।

দুখুও ফিরে এলো জায়গির-বাড়ির কাছারিঘরে, এখনকার নিজ ঠিকানায়।

ভেতরে ঢুকে দেখল অন্ধকার বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। লন্ঠন খুঁজল দুখু। হঠাৎ মনে পড়ল কেরোসিন নেই, কেরোসিন ছাড়া লন্ঠন জ্বালানো যাবে না। রাত জেগে পড়তে হয়। তেল শেষ হয়ে যায়। বারবার কেরোসিন চাইতে ইচ্ছে করে না দুখুর। এখন কী হবে, কার কাছে চাইবে কেরোসিন?

হঠাৎ দেখল জানালা দিয়ে চেয়ে আছে জ্বলজ্বলে দুটো চোখ। মুখ ছাড়া চোখ দেখা যায় কীভাবে? ভূত! আবারও ভূত! দেহ কেঁপে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফসকেও বেরোল, ‘ভূত! ভূত!’

খিলখিল হাসির শব্দ পেল এবার দুখু। চোখ দুটো হাসতে হাসতে সরে গেছে।

নূরজাহান! নূরজাহানই এসেছিল জানালার পাশে! ছোট্ট কিশোরী নূরজাহানকে উর্দু তালিম দিত সে কাজীর শিমলায় লজিং বাড়িতে। এখানে এলো কীভাবে সে?

পেছন ফিরে দেখল টর্চ হাতে কে যেন আসছে। আসুক। টর্চের আলো দেখে সাহস ফিরে এলো মনে।

আকাশের চাঁদ হাতে পেল দুখু। ঘরে ঢুকছে সহপাঠী নিয়ামত। বন্ধুহীন জগতে অসহায়ের সহায় নিয়ামত।

‘কেমন আছ, দুখু?’

‘কেরোসিনহীন আমি, লন্ঠন ছাড়া ডুবে আছি অন্ধকারে। সেই অন্ধকারে এলে তুমি। ‘ভূত’ আর ‘ভূতের চোখও’ পালিয়ে গেল তোমার সাড়া পেয়ে। কী নেয়ামত নিয়ে এলে নিয়ামত, বুঝেছ?’

দুখুর কৌতুক মেশানো কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল নিয়ামত। বলল, ‘তোমার জন্য কোনো নেয়ামত আনিনি। এসেছি নিজের স্বার্থে।’

‘কী স্বার্থ, বলো।’

‘আজ তো স্কুলে যাইনি, খেয়াল করেছ তুমি? আমার অনুপস্থিতি টের পেয়েছিলে?’

‘হুঁ। টের পেয়েছিলাম। তুমি ছাড়া আমার সঙ্গে কে মেশে, বলো?’

‘সবাই মিশবে। তোমার উদাস ভাব ছেড়ে দাও। কয়লা অঞ্চলের মায়ার সুতোটা গুটিয়ে রেখে দাও পকেটে, তখন তুমি সহজ হতে পারবে, অন্যরাও সহজভাবে মিশবে তোমার সঙ্গে।’

‘শুনলাম তোমার উপদেশ। এখন বলো, কী উদ্দেশ্যে এসেছ?’

‘দুটো বিষয়। প্রথম নিজের কাজ। অঙ্ক স্যারের বাড়ির কাজটা দাও। দ্বিতীয়টা তোমার কাজ।’

‘তা দিলাম বাড়ির কাজ। এখন বলো, আমার কাজটা কী?’

‘স্কুলের হেডস্যার, মহিমচন্দ্র খাসনবিশ, স্কুলে বিচিত্রাঅনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য একজন ভালো অভিনেতা খুঁজছেন। কালই অনুষ্ঠান। তুমি অংশ নেবে? আমার স্থির বিশ্বাস, মঞ্চে উঠলে মাতিয়ে তুলবে তুমি দর্শকদের।’

হ্যাঁ-না, কিছুই বলল না দুখু। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘এবার আমার জন্য একটা কাজ করো তুমি।’

‘কী কাজ?’

‘কেরোসিন কিনতে হবে। নইলে ঘরে লন্ঠন জ্বলবে না। রাতে পড়তেও পারব না।’

‘কেন, চলো ওই তো, কাছেই একটা মুদির দোকান আছে। সেখানে কেরোসিন পাওয়া যায়।’

‘পয়সা নেই। হাত শূন্য। আমাকে তিন পয়সা হাওলাত দাও। আছে পকেটে?’

পকেটে হাত ঢুকিয়ে নিয়ামত বলল, ‘আছে। চার আনা আছে। নাও। তিন পয়সা দিলাম তোমাকে। ঠিক সময়ে ফিরিয়ে দিয়ো।’

দুখু বলল, ‘আচ্ছা।’

 

 

॥ বাইশ ॥

স্কুলে হ্যাজাক বাতির আলো জ্বালাল দুখু

 

পরের দিন বিচিত্রাঅনুষ্ঠানের আয়োজন আর উচ্ছ্বাস দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল দুখু। স্কুল তো কোন ছার, পুরো তল্লাট এখন সরগরম। পুরো গ্রামের মানুষ আলোড়িত। এসব স্থানে আনন্দের হুল্লোড় রোজ হয় না। এমন আনন্দঘন অনুষ্ঠানে মঞ্চে ডাক পড়ল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র দুখুর। প্রথমে সে বাঁশের বাঁশিতে টান দিলো। তার বাঁশির সুরে মাতোয়ারা হয়ে উঠল দর্শক। তারপর একে একে আবৃত্তি করল ‘দুই বিঘা জমি’ আর ‘পুরাতন ভৃত্য’―রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই দুটি কবিতা।

শিক্ষকরা হতবাক। পাড়ার মানুষজন উল্লসিত। এক কোণে বসে নিয়ামত ভাবল–এ কী করে সম্ভব! কোনো রিহার্সেল ছাড়া, বই হাতে না নিয়ে কীভাবে দুখু এমন দরাজ কণ্ঠে আবৃত্তি করে গেল দুটি কবিতা! কীভাবে তুলল বাঁশিতে নতুন সুর! তাহলে কি সে স্বভাবকবি? প্রতিদিনই কি সে মনে মনে রিহার্সেল করে? নিজের দক্ষতার জয়গান কি এভাবেই বুনে চলে? এ কারণেই কি এই পাড়াগাঁয়ের সাক্ষর-নিরক্ষর মানুষের মন সে ভরিয়ে দিতে পারল আনন্দের জোয়ারে?

মঞ্চ থেকে নেমে আসার পর নিয়ামত জড়িয়ে ধরল দুখুকে। অভিনন্দন জানাল।

দুখু বলল, ‘এত খুশি হলে কেন তুমি?’

‘খুশি হব না? আমার সহপাঠী এত ভালো করল আর আমি খুশি হব না? তুমি কি ভেবেছ আমি হিংসুটে?’

দুখু উত্তর দিলো, ‘কেরোসিন তেলের পিটপিটে আলো দেখে এত খুশি হলে চলবে?’

‘হ্যাজাক বাতির আলো দেখেছি চাঁদের আলোকেও ছাড়িয়ে যেতে। সে আলোকে আমি চিনেছি। সে তুমি,’ জবাব দিলো নিয়ামত।

চলবে...