গ্রেগরি ইয়েফিমোভিচ রাসপুতিন, অনেকে তাঁকে বলে থাকেন পাগলাটে সন্ন্যাসী, ইতিহাসে তিনি পরিচিত রহস্যময় পুরুষ হিসেবে। অনেকে আবার তাঁকে রাশিয়ার ‘লাভার বয়’ হিসেবেও আখ্যা দিয়ে থাকেন। একইসঙ্গে তিনি ইতিহাসের খলনায়ক হিসেবেও পরিচিত। রাসপুটিনের জন্ম ১০ জানুয়ারি ১৮৬৯-এ সাইবেরিয়ার তুরা নদীর তীরের একটি গ্রামে দরিদ্র কৃষক পরিবারে। তাঁকে নিয়ে জনশ্রুতি রয়েছে—তিনি আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী এবং ভবিষ্যত্ দেখতে পারেন। পাশাপাশি রোগ সারানোর ক্ষমতাসহ বহু অলৌকিক ক্ষমতারও অধিকারী ছিলেন। অনেকে ধারণা করতেন, তিনি ব্লাক ম্যাজিক নিয়ে পড়াশোনা করতেন এবং রাশিয়ার ভবিষ্যত্ দেখতে পেয়েছিলেন যা তার জীবনের ট্রাজেডিকে ডেকে আনে। রাসপুতিন সব সময়ই নিজেকে এক রহস্যময় চরিত্র হিসেবে সবার কাছে তুলে ধরেছেন, তাই তাঁকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ ছিল না। তিনি জার দ্বিতীয় নিকোলাসের দরবারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং হয়ে ওঠেন রাশিয়ার অন্যতম প্রধান ক্ষমতাবান ব্যক্তি।
রাসপুতিন ১৮ বছর বয়সে একটি নিষিদ্ধ খ্রিস্টান গোত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন, নারীদের প্রতি অশালীনতা রাসপুতিনের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। রাসপুতিন সম্পর্কে তাঁর সমালোচকরা বলে থাকেন, জারের স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তিনি জারের স্ত্রীকে অনেক কুমন্ত্রণা দিতেন আর জারের স্ত্রীও রাসপুতিনের কথামতো কাজ করতেন। এভাবেই রাশিয়ান রাজতন্ত্রে সহজেই নিজের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। রাশিয়ার সম্রাট জার দ্বিতীয় নিকোলাস ও সম্রাজ্ঞী জারিনা আলেক্সান্দ্রা পরপর চার কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত ১৯০৪ সালে এক পুত্রসন্তান লাভ করেন, যার নাম রাখা হয় আলেক্সি নিকোলায়েভিচ। কিন্তু জারের উত্তরাধিকার বহু আকাঙ্ক্ষিত এই সন্তান আক্রান্ত হয় হেমোপিলিয়া রোগে। পুত্রসন্তানের রোগমুক্তির জন্য সম্রাট নিকোলাস ও আলেক্সান্দ্রা বহু হাকিম-কবিরাজ, ফকির-দরবেশ, যাজক-ভিক্ষু আর সন্ন্যাসীর কাছে গিয়ে রিক্ত হাতে ফিরেছেন। অবশেষে গ্রেগরি রাসপুতিন জারপুত্র আলেক্সিকে সারিয়ে তুলতে সক্ষম হন। রাসপুতিনের এই সাফল্য তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রচার বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।
আধ্যাত্মিকগুরু হিসেবে পরিচিতি পেলেও আদতে রাসপুটিন ধর্মযাজক ছিলেন না। বরং তিনি মানুষের মুক্তির জন্য চার্চ ও ধর্মযাজকদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সরাসরি নিজের ভেতরের ঐশ্বরিক আত্মার অনুসন্ধানের কথা বলেন, ফলে চার্চনির্ভর সবাই তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হন। রাজপ্রাসাদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠায় এবং সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ পাওয়ায় খুব দ্রুত বিতর্কিত হয়ে ওঠেন। এসব কারণে রাসপুতিনের প্রচুর শত্রু তৈরি হয়। ১৯১৬ সালে রাসপুতিনকে বরফের নিচে পানিতে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তবে রাসপুতিনের মৃত্যু যে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সেটি পরবর্তীকালে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। রাসপুতিনকে সায়ানাইড মেশানো মদ আর কেক খাওয়ানো হলেও তাতে মারা যাননি। তিনি আগেই অনুমান করতে পেরেছিলেন তাঁকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হতে পারে। এ কারণে প্রতিদিন পরিমিত মাত্রায় বিষপান করে তিনি শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলেন। গুলি করেও রাসপুতিনের মৃত্যু নিশ্চিত করা যায়নি। আহত রাসপুতিনের ওপর নানারকম অত্যাচার করা হয়। সেই অবস্থায় বরফে ঢাকা নেভা নদীতে ফেলে দেওয়া হয় এবং কিছুদিন পর তাঁর লাশ পাওয়া যায়।
এইচ এম নাজমুল আলম