করোনায় যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত

  নাছিমা খাতুন

 

আগের দিন রাতে ফ্যানের বাতাস সরাসরি গায়ে লাগার কারণে হালকা সর্দি লাগে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা আইরিন আক্তারের। পরদিন সকালে চিকিত্সকের কাছে নিয়মিত চেকআপ করার জন্য রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মা ও শিশু হাসপাতালে যান তিনি। কিন্তু চিকিত্সক সর্দির কথা শুনে তাকে না দেখে করোনা পরীক্ষার সনদ নিয়ে আসতে বলেন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি বাসায় ফিরে যান, সর্দি ভালো হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।

এমন চিত্র শুধু আইরিন আক্তারেরই নয়। সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিত্সা কেন্দ্রে গর্ভবতী ও সাধারণ যৌন-প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা নারীদের ক্ষেত্রে এমন বিড়ম্বনা ঘটেছে বলেও জানা গেছে। করোনাকালে আইরিন আক্তারের মতো অনেক নারী যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পাননি। এমনকি এ সময়ে বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে গর্ভধারণ, গর্ভপাতসহ বিভিন্ন প্রকার ঘটনা ঘটছে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে।

গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসব ও পরবর্তী সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে নারী ও কিশোরীরা। করোনাকালে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো সীমিত আকারে স্বাস্থ্য পরিসেবা চালু রাখার কারণে অধিকাংশ মানুষকে ঘরে বন্দি থাকতে হয়েছে। এতে হাতের কাছে পরিবার পরিকল্পনার সেবা পাননি। ফলে ঘরে থাকা অনেক নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

করোনা প্রাদুর্ভাবের আগে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা নানা কর্মসূচি গ্রহণ করলেও বর্তমানে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। এমনকি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যাতায়াতসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতা পার হয়ে নারীরা সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। রয়েছে জনবল সংকটও।

দেশের হাসপাতালগুলোতে কর্মরত অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরম ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করলেও তাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষায় নজির নেই দায়িত্বশীলদের। দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। চিকিত্সা ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাসের কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে    আগামী দিনগুলোতে শিশু ও মাতৃমৃত্যু বাড়ার            আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এই দেশগুলোতে পরিবারপরিকল্পনা সেবার প্রায় ১০ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জানতে চাইলে এ বিষয়ে নারী মৈত্রীর প্রজেক্ট ম্যানেজার তাসলিমা হুদা বলেন, নারীর যৌন ও  প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে নারী মৈত্রী। প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থীকে এই বিষয়ে সচেতন করা, চারটি বিদ্যালয়ে মাসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক উপকরণ দিয়ে কর্নার তৈরি করে দেওয়া, সারা দেশে ৩৩ হাজার            স্কুলে যেন কিশোরীদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্নার করা হয় সেই জন্য মাধ্যমিক ?ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে অ্যাডভোকেসি করা,        করোনাকালে ১ হাজার পরিবারকে মাসিক   স্বাস্থ্যবিষয়ক উপকরণ দেওয়াসহ নানাবিধ কাজ      করে যাচ্ছে নারী মৈত্রী।

নিউ ইয়র্ক থেকে ‘ইমপ্যাক্ট অব দ্য কোভিড-১৯ পেনডেমিক অন ফ্যামিলি প্লানিং অ্যান্ড এন্ডিং জেন্ডার বেসড ভায়োলেন্স ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশন অ্যান্ড চাইল্ড ম্যারেজ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, কোভিড-১৯-এর কারণে নিম্ন মধ্যম আয়ের ১১৪টি দেশে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী আধুনিক পরিবারপরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও অনিরাপদ গর্ভপাতের হার বাড়বে। করোনার কারণে এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবাদানকারী কর্মীদের পক্ষে আগের মতো তাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে না।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই অনিচ্ছুক দম্পতিদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিতে উদ্বুদ্ধ করা ছিল একটা দুরূহ কাজ। এখন সেটা দুরূহতম হয়ে যাবে—এটাই স্বাভাবিক। তাই অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বাড়ছে উচ্চহারে। এ অবস্থায় শুধু করোনাবিষয়ক স্বাস্থ্যসেবা দিতে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে নারী ও কিশোরীদের যৌন-প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়টি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এদিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্কুল-কলেজ তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, এমনকি অনেক সচ্ছল পরিবারেও মেয়েদের বিয়ে দেওয়াটাই যৌক্তিক মনে করছেন। ফলে বেড়ে গেছে বাল্যবিয়ে।

 

ছবি :ইন্টারনেট