তালেব রানা
ভারতের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে সবচেয়ে বেশি সময় দিল্লির ক্ষমতায় ছিল দলটি। কিন্তু ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে হারের পর থেকে দলটি যেন দুর্বল হতে শুরু করে। ২০১৯ সালের নির্বাচনেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি তারা। বিজেপি নেতা তথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যাপক জনপ্রিয়তাকে টক্কর দিতে পারেনি দলটির নেতারা। ২০১৪ সালের পর ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যও কংগ্রেসের হাতছাড়া হয়েছে। যে কয়েকটি রাজ্যে বর্তমানে কংগ্রেসের সরকার রয়েছে সেখানেও নানা অস্থিরতা চলছে। অনেক বিশ্লেষকই এজন্য কংগ্রেস নেতাদের অদক্ষ নেতৃত্বকে দায়ী করছেন।
কংগ্রেসে নতুন করে অস্থিরতার শুরু পাঞ্জাবে। সেখানে কয়েক মাস আগে রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি করা হয় ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক হওয়া নভজ্যোত সিং সিধুকে। এরপর থেকেই কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিংয়ের সঙ্গে সিধুর দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। পাঞ্জাবে কংগ্রেস সরকারের জনপ্রিয়তা কমছে—জরিপে এমন তথ্য আসার পর মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিংকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কংগ্রেস। গত ১৮ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন তিনি। এরপরই তিনি কংগ্রেসের রাজনীতি আর করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এরপর নতুন মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে চরণজিত্ সিং চান্নিকে। তবে বিতর্কিত লোককে নতুন মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হয়েছে দাবি করে সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন সিধু। শেষ পর্যন্ত নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর সভাপতির দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। আপাতত পাঞ্জাবে সংকট কাটলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী বছরের শুরুতে পাঞ্জাবে নির্বাচন হবে। এর আগে অমরিন্দর সিং কংগ্রেস ছেড়ে অন্য দলে গেলে পাঞ্জাবে সরকার ধরে রাখা কঠিন হবে কংগ্রেসের জন্য।
পাঞ্জাবের সংকটের মধ্যেই আলোচনায় ওঠে যে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রীও বদল করতে পারে কংগ্রেস। যদিও এখনো পর্যন্ত তেমনটা হয়নি। এর মধ্যেই ভারতের গোয়া রাজ্যের কংগ্রেসের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লুইজিনহো ফেলেইরো মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন মেঘালয়ে কংগ্রেসের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমাও। পূর্ব গারো পাহাড়ের প্রভাবশালী নেতা মুকুল তৃণমূলে যোগ দিলে মেঘালয়ে কংগ্রেসের বড় ক্ষতি হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রতিককালে এসব ঘটনার পর দিল্লিতে কংগ্রেসের সদর দপ্তরে এখন নানা রকম প্রশ্ন উড়ে বেড়াচ্ছে। কারা দলে থাকছেন, কারা দল ছাড়ছেন? এর কোনো উত্তর অনেকেই খুঁজে পাচ্ছেন না। সবাইকে অগ্রাহ্য করে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী নভজ্যোত সিং সিধুকে পাঞ্জাবের সভাপতি করেছিলেন। তিনি হঠাত্ পদত্যাগ করার পরে কপিল সিব্বলের মতো কংগ্রেসের সিনিয়র নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কংগ্রেসে কোনো নির্বাচিত সভাপতি নেই, তা হলে সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছেন? এর পরেই একদল কংগ্রেস কর্মী সিব্বলের বাড়িতে হামলা করে। গুলাম নবি আজাদ, মণীশ তিওয়ারি, আনন্দ শর্মার মতো ‘জি-২৩’-র সদস্যরা তো বটেই, পি চিদম্বরমও এই ঘটনার নিন্দা করেছেন। কিন্তু গান্ধী পরিবারের কেউ এ নিয়ে মুখ খোলেননি। কংগ্রেসের ভিতরে এখন প্রশ্ন, হাই কমান্ড কি এবার সিব্বলের মতো নেতাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে?
দিগ্বিজয় সিং এতো দিন গান্ধী পরিবারের আস্থাভাজন বলেই পরিচিত ছিলেন। পাঞ্জাব নিয়ে কংগ্রেসের অন্দরে অস্থিরতার মধ্যেই তিনি সম্প্রতি বিজেপির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও আরএসএসের প্রশংসা করেছেন। অথচ সম্প্রতি দিগ্বিবিজয়কে সোনিয়া গান্ধী দেশ জুড়ে বিক্ষোভের পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
এশিয়ানেট নিউজ অনলাইনের এক খবরে বলা হয়েছে, কার্যকর নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে কংগ্রেসের বেশ কিছু বর্ষীয়ান নেতা দল ছেড়ে যাচ্ছেন। যে কারণে কংগ্রেস পার্টি আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। কংগ্রেসের জি-২৩ বা সিনিয়র ২৩ নেতা দুই বছর আগে সোনিয়া গান্ধী সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য চিঠি লিখেছিলেন। তারা আবারও সক্রিয় হয়েছেন এবং দলের নেতৃত্বের সমালোচনা করছেন।
এনডিটিভির অনলাইনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিশ্লেষক সুধীন্দ্র কুলকার্নি লিখেছেন, গান্ধীদের অদক্ষতার কারণে কংগ্রেসকে এক রাজ্যের পর আরেক রাজ্যে মূল্য চুকাতে হচ্ছে। কংগ্রেসের অন্তর্বর্তী সভাপতি সোনিয়া গান্ধী এবং কার্যত সভাপতি রাহুল গান্ধী কি তাহলে নরেদ্র মোদিকে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?
তিনি লিখেছেন, উত্তর প্রদেশ ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেখানে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের কোনো ভালো সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। অথচ কয়েক মাস আগেও মনে করা হচ্ছিল—পাঞ্জাব সহজেই তাদের হাতে থাকবে, উত্তরাখণ্ডে ও গোয়ায় বিজেপি সরকারকে তারা হটাতে পারবে, মণিপুরে তারা ভালো করবে। এসব হলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে তারা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
কিন্তু পাঞ্জাব এখন হাতছাড়া হতে পারে। রাজস্থানে দলীয় কোন্দল মেটাতে পারেনি তারা, ঠিক এমন দ্বন্দ্বের কারণে ২০২০ সালের মার্চে মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেস সরকারের পতন হয়। মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল এখন পশ্চিমবঙ্গের বাইরে আসাম ও ত্রিপুরায় কংগ্রেস নেতাদের টেনে শক্ত ভিত্তি পেতে চাইছে। মেঘালয়ের সাবেক কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রীও তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন। কংগ্রেস-তৃণমূল বিরোধ এভাবে বাড়তে থাকলে ২০২৪ সালে তারা বিজেপিবিরোধী জোট কীভাবে করবে? এসব হচ্ছে কংগ্রেসে শীর্ষ নেতৃত্বের শূন্যতার কারণে।
কংগ্রেসকে ঘুরে দাঁড়াতে অনেক কিছুই করতে হবে। তার আগে এখনই রাহুল গান্ধীকে দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। হয় তাকে সভাপতি নির্বাচিত হতে হবে, না হয় গান্ধী পরিবারের বাইরে কাউকে সভাপতির দায়িত্ব দিতে হবে। আর এ কাজটি শিগিগরই করতে হবে।