এম এ আলআমিন
ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কোনো কোনো দেশের বিবাদ এখন আসন্ন। মেরু অঞ্চলে ইউরোপের দেশগুলোর যৌথ অনুসন্ধান কাজের ওপর যার প্রভাব পড়তে পারে। বিবাদের মূলে আছে নরওয়ের জলসীমায় অবস্থিত ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জ। এটি মেরু ভল্লুকের প্রাকৃতিক আবাসভূমি। সেখানে ভল্লুকের সংখ্যা স্থানীয় লোকসংখ্যার চেয়েও বেশি। নরওয়ের অভিযোগ, ইইউ সেখানে নির্ধারিত কোটার অতিরিক্ত মত্স্য আহরণ করছে।
ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জ কড মাছ শিকারের জন্য বিখ্যাত। নরওয়ে বলেছে, ইইউ ইতিমধ্যেই মাছ ধরার জন্য তাদের নির্ধারিত কোটা পূর্ণ করে ফেলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, শিগিগরই ইইউর মাছ ধরার নৌযান আটকাতে শুরু করবে নরওয়ে। ইইউভুক্ত দেশগুলোর মাছধরার বিষয়ে যে পদ্ধতি এতকাল অনুসরণ করা হয়েছে ব্রেক্সিটের পর তাতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। নরওয়ে অনেক আগেই জোট থেকে বের হয়ে গেছে। কিন্তু ব্রিটেন বেরিয়েছে গত বছর ৩১ জানুয়ারি। ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়া বা ব্রেক্সিটের পর দেশটির সঙ্গে ইইউর কিছু সমঝোতা বা চুক্তি হয়েছে যার ফলে ব্রিটেন এখন নিজস্ব জলসীমা অন্যদের ব্যবহার করতে দেওয়ার ব্যাপারে অনেকটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। ইউরোপের দেশ হিসেবে নরওয়েও চায় তাদেরও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকুক।
নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আউডুন হালভোরসেন বলেছেন, তার দেশের জলসীমায় কোটা নির্ধারণ করতে হলে আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি দরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সেটা নেই। এ নিয়ে অসলো ও ব্রাসেলসের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব বাড়ছে। উভয় পক্ষই একে অন্যকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য দুষছে। প্রভাবশালী মত্স্য শিল্পগুলো পেছনে কলকাঠি নাড়তে শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবলম নরওয়ে ও ইইউর মধ্যে কড মাছ ধরা নিয়ে দ্বন্দ্ব নয় বরং মেরু অঞ্চলে ইউরোপীয় যৌথ অনুসন্ধানের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। উসকে দিতে পারে ভূরাজনীতির ইস্যু। নরওয়ে মনে করে ইইউ ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে কড মাছ শিকারের মধ্য দিয়ে ইইউ আসলে মেরু অঞ্চলে অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করতে চায়। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিও মেরু অঞ্চলের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ। কারণ, নতুন প্রাকৃতিক সম্পদ আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের রুটও বদলে দিতে পারে।
আগেই বলা হয়েছে, ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে ইইউর সঙ্গে নরওয়ের সম্পর্কের ওপর। ব্রিটেন ও ইইউ মাছ নিয়ে আগের কোটা বাদ দিয়ে নতুন সমঝোতা করেছে। কোন প্রজাতির মাছ কতটা আহরণ করা হবে তা দুপক্ষ নতুনভাবে ঠিক করে নিয়েছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী চুক্তির অংশ হিসেবে ইইউ ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে বার্ষিক ২৪ হাজার ৬৪৫ টন মত্স্য আহরণের সুযোগ পায়। কিন্তু নরওয়ে এর সঙ্গে একমত নয়। হালভোরসেন বলেন, ‘এই সীমা ১৮ হাজার টন পর্যন্ত হতে পারে। নিজেদের জলসীমার ওপর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের সম্পর্ক রয়েছে।’ অসলোর দাবি চ্যালেঞ্জ করে ব্রাসেলস বলেছে, ১৯২০ সালে প্যারিসে সম্পাদিত চুক্তি দ্বীপপুঞ্জের ওপর নরওয়ের সার্বভৌমত্ব সীমিত করেছে। বিষয়টি নিয়ে ২০২১ সালের গোড়া থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। ফেব্রুয়ারিতে ইইউ মত্স্য কমিশনার ভার্জিনিজুস সিনকেভিসিয়াসের সঙ্গে নরওয়ের মত্স্যমন্ত্রী এমিল ইনজেব্রিগস্টেনের বৈঠক হয়। বৈঠকে নরওয়ের মন্ত্রী ইইউর দাবিকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন।
এখন পর্যন্ত কড মাছ আহরণের বিষয়টি নরওয়ে ও ইইউর মধ্যে একটি শীতল যুদ্ধ হিসেবে রয়ে গেছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, এই দ্বন্দ্ব সহজে মিটবে না। কারণ ইইউর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যেমন জার্মানি, স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের মতো দেশগুলো অসলোর আপত্তিকে পাত্তা দিতে নারাজ। সম্প্রতি জার্মানির পক্ষ থেকে সিনকেভিসিয়াসের প্রতি লেখা এক চিঠিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে নরওয়ের নেওয়া একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইইউর স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার ইউরোপীয় মত্স্য কমিশনের রয়েছে। ইইউর অন্যান্য দেশ এ কথার পক্ষের নিজেদের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছে। ইউরোপিয়ান নর্থ আটলান্টিক ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ডিয়েক পারলেভিলেট বলেন, নরওয়ে আসলে কি চায় তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।