রক্তদানে হোক জীবন সঞ্চার

মানব দেহের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রক্ত। শরীরের অভ্যন্তরীণ অত্যাবশ্যকীয় পরিবহন মাধ্যম। এটি প্রবাহিত হয় শিরা ও ধমনির ভেতর দিয়ে। দেহের প্রতিটি টিস্যুতে পৌঁছে দেয় শক্তি ও অক্সিজেন। বিভিন্ন প্রকার দুর্ঘটনায় আহত, ক্যানসার, অস্ত্রোপচার, সন্তান প্রসব কিংবা থ্যালাসেমিয়ার মতো জটিল রোগের চিকিত্সায় প্রয়োজন পড়ে রক্ত সঞ্চালনের। তবে প্রয়োজনীয় রক্তের চাহিদার তুলনায় দেশে রক্ত প্রাপ্তির পরিমাণ এখনো অপ্রতুল!

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখেরও অধিক মানুষ স্বেচ্ছায় রক্তদান করে থাকেন। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার প্রতি ১ হাজারে ৪০ জন হলেও অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে সেটি চার জনেরও কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদানের বিষয়ে এসব দেশসমূহের অসচেতন জনগোষ্ঠীর ভেতরকার সচেতনতাকে জাগ্রত করার মাধ্যমে রক্তের প্রয়োজনীয় চাহিদার শতভাগ সরবরাহ নিশ্চিত করা। তবে, করোনার প্রাণঘাতী ছোবলে সে উদ্যোগও এখন সংকটের মুখে!

তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে মানুষ তার চিন্তন দক্ষতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে গবেষণা কর্মে প্রয়োগের মাধ্যমে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছে, এক জন নিয়মিত রক্তদাতার শরীরে ক্যানসার সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি কমে যায় বহুলাংশে। প্রতিবার রক্তদানে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ হাড়গুলোর অস্থিমজ্জায় রক্তকণিকা উত্পাদন ব্যবস্থাও পূর্বের তুলনায় সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায় বহুগুণে। যাদের রক্তে আয়রন জমার প্রবণতা আছে, রক্তদান তাদের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ। নিয়মিত রক্তদানের ফলে শরীরে কোলেস্টরেলের মাত্রা কম থাকে এবং রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে হূদেরাগ ও হার্ট অ্যাটাকের মতো মারাত্মক ঝুঁকিসমূহ হ্রাস পায়। রক্তদানে শরীরের যে ক্যালোরি খরচ হয়, তা শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতে সহায়তা করে। শরীরে হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, সিফিলিস, জন্ডিস, এইচআইভি বা এইডস এবং ম্যালেরিয়ার মতো অত্যন্ত ভয়ংকর কোনো রোগ আছে কি না, সেটি রক্তদান প্রক্রিয়ার সময় জানা যায় একদম বিনা খরচে!

প্রাপ্তবয়স্ক এক জন সুস্থ মানুষের শরীরে চার থেকে ছয় লিটার পরিমাণ রক্ত থাকে। প্রতিবার রক্তদানে মাত্র ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত শরীর থেকে বের করা হয়। এ সময় শরীর থেকে ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিগ্রাম আয়রন কমতে পারে। সে-কারণেই রক্ত দিলে শরীরে তেমন কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই নেই। তবে, রক্ত দেওয়ার পর রক্তদাতার মাথা কিছুটা ঘোরাতে পারে। বমি বমি ভাব হতে পারে। তাই, এ সময়টাতে হাঁটাহাঁটি না করে অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞগণ। রক্তদাতা যদি ঘামতে থাকেন এবং শরীরে অস্থিরতা অনুভব করেন, তবে তাকে স্যালাইন এবং ডাবের পানি খেতে বলা হয়। এছাড়াও, রক্ত  দেওয়ার পর লোহিত রক্তকণিকার মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে অন্তত এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে। এর ক্ষয়পূরণে আয়রন ও প্রোটিনযুক্ত খাবার খেতে হবে নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে।

রক্তদানের গুরুত্ব ও উপকারিতা সম্পর্কে শুদ্ধচিন্তার বিকাশ ঘটাতে প্রতিবছর ১৪ জুন পালন করা হয় বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। দিবসটিকে ঘিরে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ গ্রহণ করে থাকে নানাবিধ জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি। দিবসটির প্রধান উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের কাছে রক্তদানের গুরুত্ব ও উপকারিতা সম্পর্কে সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া; পরামর্শ প্রদান ও উত্সাহদান। সর্বোপরি, রক্তদানে যেহেতু ক্ষতিকর প্রভাব নেই সেহেতু নিজে নিয়মিত রক্তদান করতে হবে এবং অন্যদেরও রক্তদানে উত্সাহিত করতে হবে। সুস্থ, সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী সমাজ বিনির্মাণে সহযোগিতার মনোভাব সম্পন্ন দৃঢ় চিত্তের অধিকারী একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়