আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে রোগীর চাপ বাড়ছেই। কোভিডমুক্ত হওয়ার পর নানা ধরনের নিউরো রোগী ব্যাপক হারে বেড়েছে। এছাড়া পরিবেশগত প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং সারা দেশে প্রতিদিন নানা দুর্ঘটনায় আহতরা আসছেন নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট হাসপাতালে। প্রতিদিন যত রোগী আসে, তার মধ্যে প্রতি পাঁচ মিনিটে একজন স্ট্রোকের রোগী থাকে। এত রোগী সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন চিকিত্সকেরা।
এদিকে ঢাকার বাইরে পুরাতন আটটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিউরোলজিক্যাল চিকিত্সার ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে রোগীরা সেবা পাচ্ছে না। প্রচার-প্রচারণার অভাবে এবং চিকিত্সকদের আন্তরিকতার ঘাটতির কারণে সেখানে যায় না রোগীরা। আবার অনেক ক্ষেত্রে খুবই সাধারণ সমস্যা নিয়ে আসা রোগীদের চিকিত্সকেরা পাঠিয়ে দিচ্ছেন নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট হাসপাতালে, যে কারণে প্রচুর রোগীর চাপ দেখা যায় বিশ্বের সর্ববৃহত্ নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউটে। এ অবস্থায় ৪৫০ বেডের এই ইনস্টিটিউটকে আগামী বছর ৯৫০ বেডে উন্নীত করা হচ্ছে। এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ঢাকার বাইরে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ১০০ বেডের মিনি নিউরোসায়েন্স ইউনিট চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এটা এখনো প্রক্রিয়াধীন আছে। সারা দেশে নিউরো সার্জন আছেন ১৮০ জন। অন্যদিকে নিউরোলজিস্ট আছেন ৩০০ জন।
নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সরকারি-বেসরকারি অন্য যে কোনো হাসপাতালের চেয়ে এই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনাও অত্যাধুনিক।
এক দশক আগেও মস্তিষ্কজনিত রোগের চিকিত্সা মানেই ছিল বিদেশনির্ভরতা, যেখানে সুযোগ হতো সমাজের উচ্চবিত্তদের। কিন্তু দিন বদলেছে। ২০১২ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের যাত্রার মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় এই সেবা ধনী-দরিদ্র সবার নাগালের মধ্যে এসেছে। আর বিশ্বমানের গবেষণা ও চিকিত্সাসেবা সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে। অল্প দিনে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের হূদয়ে এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম নিলে সবার ওপরেই থাকবে নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট। মস্তিষ্কের সব ধরনের ব্যাধি নিরাময় করা হলো এই হাসপাতালের মূল ক্ষেত্র।
১৯৯৯ সালে দেশে প্রথম নিউরোলজিক্যাল চিকিত্সাসেবা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২২ বেড দিয়ে শুরু হয়। সীমিত পরিসরে চিকিত্সাসেবা ছিল। ২২ বেড থেকে এখন পূর্ণাঙ্গ নিউরোলজিক্যাল চিকিত্সাসেবার জন্য ইনস্টিটিউট হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিউরো ইউনিট যখন চালু হয়, তখন এই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ। তিনি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমান পরিচালক। প্রথমে ৩০০ বেড দিয়ে ইনস্টিটিউটটি চালু হয়। এরপর আরো দেড় শ বাড়িয়ে ৪৫০ বেডে উন্নীত করা হয়। হাসপাতালের পাশে আরেকটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, যেখানে আরো ৫০০ বেড সম্প্রসারণ করার কার্যক্রম চলছে। আগামী বছরের ডিসেম্বর মাসে এই ৫০০ বেড চালু হবে। বর্তমানে প্রতিদিন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের বহির্বিভাগে গড়ে ১ হাজার ৫০০ রোগী চিকিত্সাসেবা নিতে আসছে। বর্তমানে রোগীদের বেড পাওয়া কঠিন। পূর্ণাঙ্গ এই ইনস্টিটিউটে স্ট্রোক, মৃগীরোগী, জিবিএস (হাত-পা অবশ হওয়া), স্মৃতিভ্রম (ভুলে যাওয়া), ব্রেনের রক্তনালিতে ইনফেকশন, ব্রেন টিউমার, ব্রেন স্টেইন (ব্রেনের রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে স্টেইন বসিয়ে দিলে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল শুরু), মুভমেন্ট ডিজঅর্ডার ট্রিটমেন্টসহ নিউরোলজিক্যাল সব চিকিত্সার ব্যবস্থা আছে। ব্রেনে টিউমার মাথা না কেটে নাক দিয়ে বের করে আনা হচ্ছে। এছাড়া আরো আছে আলাদাভাবে অত্যাধুনিক ১০০ শয্যাবিশিষ্ট কমিপ্রিহেনসিভ স্ট্রোক ইউনিট। এসব সেবা রোগীরা প্রায় বিনা মূল্যে পায়। শিশুদের জন্মগত ত্রুটি, মাথা বড় হওয়াসহ নানা ধরনের নিউরোলজিক্যাল চিকিত্সা ও অপারেশন ব্যয়বহুল।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা বলেন, ঢাকার বাইরে পুরাতন আটটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিউরো সার্জারি ইউনিট আছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি বিভাগীয় শহরেও নিউরোসায়েন্সের চিকিত্সাসেবার ব্যবস্থা রয়েছে। তার পরও নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউটে রোগীর চাপ বেশি কেন? ঢাকার বাইরে নিউরো চিকিত্সা প্রদানের ক্ষেত্রে চিকিত্সকেরা অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রাথমিক চিকিত্সাও তারা না দিয়ে রোগীকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চলে এলেও দেখার যেন কেউ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (হাসপাতাল) দায়িত্ব রোগী সেবা পাচ্ছে কি না, সেসব মনিটরিং করা। অথচ তার অবস্থা অনেকটা ঠুঁটো জগন্নাথের মতো। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারাও সঠিকভাবে বিষয়টি মনিটরিং করেন না। অভিযোগ রয়েছে, তারা সব সময় টাকার ধান্ধায় থাকেন। স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর কাজ কোথায় কী ধরনের চিকিত্সাব্যবস্থা আছে তা প্রতিটি হাসপাতালের সামনে সাইনবোর্ড আকারে টানিয়ে দেওয়া। এতে রোগীরা হাসপাতালের সবকিছু জানতে পারবে। কিন্তু স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো এই কাজ সঠিকভাবে পালন করে না। এই বিভাগের একশ্রেণির কর্মকর্তা নানা অনিয়মে জড়িত। নামসর্বস্ব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা নেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ বলেন, ঢাকার বাইরে নিউরো চিকিত্সার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু রোগীরা সেখানে চিকিত্সাসেবা পায় না। ডাক্তাররা ঠিকমতো সার্ভিস দেন না। মাথাব্যথা কিংবা সামান্য কিছু হলেই রোগীকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। দেখা যাচ্ছে, নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউটে আসা ২৫ ভাগ রোগীর নিউরোলজিক্যাল কোনো সমস্যা নেই। ঢাকার বাইরে আট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যে নিউরোলজি বিভাগ আছে, সেটিও অনেকে জানেন না।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. বদরুল আলম বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ নিউরোলজিক্যাল চিকিত্সাসেবার অত্যাধুনিক চিকিত্সাসেবা প্রতিষ্ঠান হলো ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল। রোগীরা উন্নত মানের চিকিত্সাসেবা পাচ্ছে। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান। প্রতিদিন প্রচুর রোগী আসছে এই হাসপাতালে। এর মধ্যে প্রতি পাঁচ মিনিটে আসে একজন স্ট্রোকের রোগী। এসব রোগী সামাল দিতে চিকিত্সকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই আগামী বছর আরো ৫০০ বেড চালু হবে। তবে হাসপাতালে বেড যতই বাড়ানো হোক না কেন, কোনো লাভ হবে না, যদি ঢাকার বাইরে নিউরো চিকিত্সার ব্যবস্থা না করা হয়। ঢাকার বাইরের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিউরো চিকিত্সা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।