এতদিন পর এ প্রশ্ন মনে জাগতেই পারে, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে না নেওয়ার পক্ষে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনদের কী যুক্তি ছিল? দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলা, দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা পাঞ্জাবি হওয়ার পরও- কেন পূর্ব বাংলায় ভাষার দাবিতে তীব্র আন্দোলনের মুখেও তত্কালীন সরকার এত কঠোর অবস্থান নিয়েছিল? ‘বেধর্মীদের চক্রান্ত’ বা ‘ভারতীয় চরদের ষড়যন্ত্র’— এসব বলাটা যে ছিল রাজনীতির মারপ্যাঁচ এটা বুঝতে বেগ পেতে হয় না।
এ কথা সত্যি আরবি হরফের প্রতি মুসলমান মাত্রেই দুর্বলতা রয়েছে। তা ধর্মের প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বাস থেকেই। বাঙালির সাংস্কৃতিক দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকার পরও বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা উর্দু না বাংলা, উনিশ শতকের গোড়ার দিকে পত্র-পত্রিকায় বাঙালি মুসলমান লেখকরা এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন। পাকিস্তান আমলে এসে আরবি হরফ প্রবর্তনের পক্ষে একদিকে ছিল ধর্মীয় আবেগ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সংহতির যুক্তি।
বলা হচ্ছিল, উর্দু ছাড়া পশতু, সিন্ধি, পাঞ্জাবি ভাষায় আরবি হরফ যেহেতু ব্যবহূত হচ্ছে— এখন বাংলায় এই হরফের প্রবর্তন করলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক সংহতি দৃঢ় হবে। তবে এটা বুঝতে কষ্ট হয় না এসব কথার আড়ালে ধর্মীয় আবেগের চেয়ে রাজনৈতিক কারসাজিই ছিল বেশি। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান। এ বিষয়ে তিনি পূর্ব বাংলার শিক্ষাবিদদের সহযোগিতা নেবার চেষ্টা করেছিলেন।
১৯৪৮ সালে ফজলুর রহমান এই কাজে সহযোগিতার জন্য সৈয়দ আলী আহসানকে বলেন। সৈয়দ আলী আহসান বলেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। ফজলুর রহমানের নির্দেশে তত্কালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষা উপদেষ্টা মাহমুদ হাসান ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে চিঠি দেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এ চিঠির উত্তর না দিয়ে তার ভাবনার কথা লিখে সংবাদপত্রে পাঠান। যা কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৪৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনে এক অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে মাহমুদ হাসানের দেখা হলে মাহমুদ হাসান মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে দেশদ্রোহী বলে উল্লেখ করেন।
ফজলুর রহমান ১৯৪৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পেশোয়ারে পাকিস্তান শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের দ্বিতীয় অধিবেশনে দেয়া বক্তৃতায় বলেন, একই জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠার পথে যেসব অসুবিধা আছে তার মধ্যে নানারকম হরফের সমস্যাটি অন্যতম। এই প্রসঙ্গে তিনি আরবি বর্ণমালার উপযোগিতার কথা বর্ণনা করেন। ১৯৪৮ সালের মার্চের ভাষা আন্দোলন স্তিমিত হয়ে এলেও এরপরও পাকিস্তান সরকারের আরবি হরফ প্রচলনের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ অব্যাহত থাকে।
১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা এক সভায় আরবি হরফ প্রচলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। এতে সভাপতিত্ব করেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। এ সভায় বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি সংসদ গঠন করা হয়। মো. নুরুল ইসলাম সভাপতি এবং ইলা দাশগুপ্তা ও আশরাফ সিদ্দিকী যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচত হন। এছাড়া নজরুল ইসলাম, মমতাজ বেগম, রিজিয়া খাতুন, খলিলুর রহমানসহ অন্যান্যদের নিয়ে বর্ণমালা সাব কমিটি গঠিত হয়।
আরও পড়ুন: নারী আসনে মনোনয়নপত্র জমা ৪৯ প্রার্থীর
এদিকে, এর প্রতিবাদে ১৯৪৯ সালের ১২ মার্চ বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে ছাত্র ফেডারেশনের একটি বিক্ষোভ মিছিল পরিষদ ভবনের সামনে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। আফজল হোসেন, মৃণালকান্তি বাড়রী, বাহাউদ্দীন চৌধুরী, ইকবাল আনসারী খান, আবদুস সালাম ও এ কে এম মনিরুজ্জামান চৌধুরীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এদের জামিন না দিয়ে বন্দি রাখা হয়।
ইত্তেফাক/আরকেজি