বর্তমান নারী স্বাধীনতার এই যুগেও প্রতিদিনই নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে শত শত নারী। প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন ও অনাচার। নারীরা তাদের কাজের পরিধি ও নির্দিষ্ট গণ্ডির সীমা অতিক্রম করতে পারলেও ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়। প্রতিদিন খবরের কাগজ, টেলিভিশন, ফেসবুকসহ কোথাও না কোথাও নারী নির্যাতন, হয়রানি ও উত্ত্যক্তের খবর দেখতে পাই। তাদের প্রতি নির্যাতন, সহিংসতার যতগুলো ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করি, গণমাধ্যমে উঠে আসে, তারও বেশি আমাদের অজানাই রয়ে যায়। পারিবারিক মর্যাদা, ভয়, সম্মানের কথা বিবেচনা করে অনেক নারীই তাদের প্রতি সহিংসতার কথা বলতে পারে না। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির মধ্যেও নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৬৫ জন নারীর স্বামী কর্তৃক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ৯৭৮ জন নারীকে ধর্ষণ এবং ৩৫ জনকে ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার শিকার হতে হয়েছে। এছাড়া সহিংসতার শিকার হয়ে ২৩০ জন নারী আত্মহননের চেষ্টা করেছে এবং আট জন আত্মহনন করেছে। এই তালিকায় ৬০ বছরের অসহায় নারী থেকে শুরু করে রয়েছে নববধূ, কিশোরী, প্রতিবন্ধী, এমনকি চার বছরের শিশু। যে শিশুরা অনেক কিছু বুঝে উঠতে পারেনি, তাদেরও নির্মম এই পাশবিকতার শিকার হতে হচ্ছে। মাঠে, ঘাটে, বাজারে, যানবাহনে, কর্মক্ষেত্রে, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও মেয়েরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
নারী নির্যাতন ও সহিংসতা প্রতিরোধে অতিসত্তর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধীদের অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার পেছনে তার পরিবারের লোকজনের অবহেলা, মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার অভাব দায়ী। তাই শিশুকে পরিবার থেকেই নারীর প্রতি সম্মান দেখানোর, বৈষম্য না করার, নারীর প্রতি দায়িত্ববোধ ও মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। নারীর প্রতি নির্যাতনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরপর একই অপরাধ আবার সংঘটিত হচ্ছে। আইনের জটিলতা ও প্রয়োজন সাপেক্ষে আইন সংশোধনের অভাব, প্রভাব-পতিপত্তির অজুহাতে বিচারে গাফিলতির অভিযোগ পাওয়া যায়, এতে অপরাধীরা দ্বিতীয়বার অপরাধ করতেও পিছপা হয় না। এই সমস্যার মোকাবিলায় সব ধরনের আইনি জটিলতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা অপসারণ করা বাঞ্ছনীয়। সেই সঙ্গে কঠিন শাস্তি আরোপে নতুন আইনের প্রবর্তন আবশ্যক।
নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া নারীকে সমাজের দুটি চাকার একটি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। যদি একটি চাকা বিকল হয়ে যায়, তবে সমাজের অগ্রগতিও থমকে যাবে। নারীরও সমাজের প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য ও দায়বদ্ধতা আছে। কিন্তু যে সমাজে নারীর নিরাপত্তাই নিশ্চিত নয়, সেখানে নারীরা কীভাবে অন্যের অধিকার নিয়ে কাজ করবে? সমাজের অগ্রগতিতে অবদান রাখবে? নারীর প্রতি সহিংসতা কেবল নারীর বিষয় নয়, এটা সবার বিষয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী, তার পরিবার ও সমাজ। নারী এগিয়ে গেলে এগিয়ে যাবে দেশ। নারী নির্যাতন ও সহিংসতা রুখে দিতে হবে। অপরাধ ও অপরাধীর শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে। এর জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। এভাবেই নিরাপদ হয়ে উঠবে নারীর পথচলা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়