আমার প্রিয় শিক্ষক

মোছা. সানিয়া জাহান ঋষিকা

পারুলিয়া তফশিলী  উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ, হাতীবান্ধা

 

ভূমিকা:মানুষের ভালো লাগার ধরনটা বড় অদ্ভুত। কাকে, কখন, কোথায় কীভাবে ভালো লাগে তা পূর্ব থেকে কেউ বলতে পারবে না। কেন ভালো লাগে তার কোন যুক্তিসংগত বা সর্বজনগ্রাহ্য ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে কেউ দিয়ে যেতে পারেননি। তবুও প্রত্যেক মানুষের জীবনেই কোনো না কোনোভাবে, কোনো না কোনো কারণে ভালো লাগার মানুষের, প্রিয় মানুষের অবির্ভাব ঘটে।  আমার এই অতি ক্ষুদ্র জীবনে যে ক’জন প্রিয় মানুষের দেখা মিলেছে তাদের মধ্যে আমার প্রিয় শিক্ষক জনাব মো. বেলাল হোসেন খন্দকার স্যারের নাম আমার কাছে রাতের আকাশের  ধ্রুব তারার মতোই উজ্জ্বল। কেন তিনি আমার প্রিয় শিক্ষক তা ব্যাখ্যা করে শেষ করা আমার পক্ষে কোনোকালেই সম্ভব নয়। ছাত্রজীবনে দিক নির্দেশনার বিষয়ে শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বেলাল হোসেন খন্দকার স্যার ছিলেন আমার জীবনের দিক নির্দেশক। বাবা-মায়ের পরে আমি তাকেই আপন বলে জানি।

প্রথম পরিচয়: আমি তখন প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হব। বাবার কোলে চড়ে কম্পিত বক্ষে প্রথম যেদিন, পারুলিয়া শিশুনিকেতনে ভর্তি হই সেদিনই আমার এই প্রিয় শিক্ষকের সাথে প্রথম সাক্ষাত। বিশাল মাঠ প্রাঙ্গণে বসিয়ে আমার বাবা প্রথমে আমাকে বলেছিলেন এই হলো তোমার বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ বেলাল হোসেন খন্দকার স্যার। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি আমার হাত দুটো চেপে ধরে তার কোলে বসিয়ে ছিলেন। আমি খুব ভয়ে ভয়ে তার কাছে গিয়েছিলাম কিন্তু কিছুক্ষণ কথা বলার পর স্যারকে আমার খুব আপন মনে হয়েছিল। তখন থেকেই তিনি আমার হূদয় জুড়ে বসেছিলেন। তারপর বাবা আমাকে শ্রেণি কক্ষে বসিয়ে চলে যাচ্ছিলেন হঠাত্ কী জানি কী জন্যে আমার নয়ন জুড়ে কান্নার বন্যা বয়ে চলছিল। ।  আমার সমগ্র অস্তিত্ব বাবাকে প্রাণপনে জানিয়ে দিতে চাচ্ছিল যে, এই অপরিচিত পরিমণ্ডল আমার নয়, আমাকে এখানে ফেলে যেওনা, আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যাও বাবা। তখন কোথা থেকে যেন হঠাত্ এসে উপস্থিত হয়েছিলেন বেলাল হোসেন খন্দকার স্যার। তখনো তিনি আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত। আমি জানি না কী ছিল তার ধীর, স্থির ও সাবলীল বাচনভঙ্গিতে। শুধু এটুকু জানি, সেদিন তার কথার মধ্যে আমার ছোট অবুঝ মন খুঁজে পেয়েছিল এক  নির্ভরতা, যে নির্ভরতা আজও আমার পথের পাথেয়।

আদর্শ শিক্ষক:ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলাম। তাঁকে আরো ভালো লাগতে শুরু হলো। তিনি আমাদের গণিত পড়াতেন। প্রতিটি জটিল বিষয় তিনি এত প্রাঞ্জলভাবে বুঝিয়ে দিতেন এবং ব্যাখ্যা করে দিতেন যে আমাদের না বোঝার মতো কোনো কারণ ছিল না। শুধু তাই নয়, বাংলা, ইরেজি, বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ে ছিল তাঁর অগাধজ্ঞান। শিক্ষক হিসেবে তাঁর বড় গুণ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্সাহ- উদ্দীপনা সৃষ্টি করা। তিনি সর্বক্ষণ আমাদের বলতেন ‘ছাত্রজীবন পুষ্প শয্যা নয়’। তিনি আরও বলতেন, চেষ্টা করো তবেই সফলতা অর্জন করতে পারবে। তার মায়ামাখা হূদয় সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন। মানুষের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। একবার আমি অসুস্থ থাকায় বিদ্যালয়ে যেতে পারিনি। আমাকে দেখতে আমাদের বাড়িতে এসছিলেন এবং আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদর করেছিলেন। আমি কী যে শক্তি আর আনন্দ পেয়েছিলাম তা ভুলতে পারিনি আজও।

উপসংহার: একজন শিক্ষক যে কীভাবে একটি হতাশাগ্রস্ত, নির্জীব প্রাণে নব প্রেরণা সৃষ্টি করতে পারেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বেলাল হোসেন খন্দকার স্যার। তিনি আমার জীবনে চলার পথে প্রেরণার অন্যতম উত্স।