সুবোধ চন্দ্র বিশ্বাস
দুর্গা দেবীর পূজার প্রথম প্রচলন হয় সত্যযুগে। সত্যযুগের রাজা ও সমাধি বৈশ্য দুর্গামূর্তি তৈরি করে তিন বছর পূজা করেন। সত্যের পরের যুগ ত্রেতায় রাবণ চৈত্রমাসে (বসন্তকালে) দুর্গা দেবীর পূজা করতেন। সে কারণে এই পূজার নাম ছিল বাসন্তী পূজা। রামচন্দ্র রাবণের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণের পূর্বে আশ্বিন মাসে (শরত্কাল) অকালে দুর্গার পূজার আয়োজন করেন। সে কারণে এই পূজাকে বলা হয় দুর্গার অকালবোধন। বাংলাদেশে রামচন্দ্রের অনুসরণে এই পূজা পালিত হয় শারদীয় দুর্গা পূজা হিসাবে।
অর্থগত দুর্গা
ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী ও দুর্গতিনাশকারী—এই অর্থে ঈশ্বরের নাম দুর্গা। যে দেবী অগম্যা, দুষ্প্রাপ্যা বা যাকে সহজে পাওয়া যায় না এই অর্থেও তিনি দুর্গা। দুর্গ নামক দৈত্যকে দমন করে উনি দুর্গা নাম প্রাপ্ত হন। হিন্দু ধর্মমতে, পরমাপ্রকৃতি স্বরূপা মহাদেবী, মহাদেবের পত্নী। মার্কেণ্ডেয় পুরাণের মতে, ইনি মহামায়া, পরমবিদ্যা, নিত্যস্বরূপা, যোগনিদ্রা। ইনি জন্ম ও মৃত্যু-রহিতা। মহাশক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা অর্থেও ঈশ্বরকে দুর্গা বলে বর্ণনা করা হয়। দেবীর দশ হাত সেই অর্থে মহাশক্তির পরিচায়ক। পরাক্রমাধিষ্ঠাত্রী দেবতার সিংহই উপযুক্ত বাহন। দুর্জন বা অসুরেরাই জগতের দুর্গতির প্রধান কারণ, অতএব দুর্গা অসুরনাশিনী বলে বর্ণিত হয়েই একপ্রকারে দুর্গতিনাশিনী বলে বর্ণিত হয়েছেন। যখন নানা রকমের দুর্গতি আছে, তখন অন্যপ্রকার দুর্গতিনাশিনী অর্থেও দুর্গাকে দুর্গা বলা যায়।
দুর্গা পূজার ইতিহাস
মার্কাণ্ডেয় পুরাণ মতে, চেদি রাজবংশের রাজা সুরাথা ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কলিঙ্গে (বর্তমানে ওড়িষ্যা) দুর্গা পূজার প্রচলন করেছিলেন। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে দুর্গা পূজার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আছে দুই ধরনের স্থাপত্যরীতির মন্দির। প্রাচীনতমটি পঞ্চরত্ন দেবী দুর্গার, যা সংস্কারের ফলে মূল চেহারা হারিয়েছে। একাদশ ও দ্বাদশ শতক থেকে এখানে কালী পূজার সঙ্গে দুর্গা পূজাও হতো। ইতিহাসবিদ দানীর মতে, প্রায় সাড়ে পাঁচ শ’ বছর আগে রমনায় কালী পূজার সঙ্গে দুর্গা পূজা হতো।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যানুযায়ী, ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে দিনাজপুরের জমিদার প্রথম দুর্গা পূজা করেন। আবার কারো মতে, ষোড়শ শতকে রাজশাহী তাহেরপুর এলাকার রাজা কংসনারায়ণ প্রথম দুর্গা পূজা করেন। ১৫১০ সালে কুচ বংশের রাজা বিশ্বসিংহ কুচবিহারে দুর্গা পূজার আয়োজন করেছিলেন। অনেকে মনে করেন, ১৬০৬ সালে নদীয়ার ভবনানন্দ মজুমদার দুর্গা পূজার প্রবর্তন করেন। আবার কেউ বলেন, ১৬১০ সালে কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার সপরিবারে দুর্গা পূজা চালু করেন। পলাশীর যুদ্ধে বিজয় লাভের জন্য ১৭৫৭ সালে কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণদেব লর্ড ক্লাইভের সম্মানে দুর্গা পূজার মাধ্যমে বিজয় উত্সবের আয়োজন করেছিলেন। পাটনাতে ১৮০৯ সালের দুর্গা পূজার ওয়াটার কালার ছবির ডকুমেন্ট পাওয়া যায়। ওড়িষ্যার রামেশ্বরপুরে একই স্থানে ৪০০ বছর ধরে সম্রাট আকবরের আমল থেকে দুর্গা পূজা হয়ে আসছে।
দুর্গার যত রূপ
শাস্ত্রে আছে বিভিন্ন রকমের দুর্গা দেবীর কথা। সাধারণত সনাতনধর্মী বাঙালিরা দুর্গার যে মূর্তিটি শারদীয় উত্সবে পূজা করে থাকেন, সেই মূর্তিটির শাস্ত্রসম্মত নাম মহিষাসুরমর্দিনী-দুর্গা। বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণে মহিষাসুরমর্দিনীর একটু আলাদা রকমের বর্ণনা আমরা পাই। চণ্ডিকা নামে উল্লিখিত এই দুর্গার দশের জায়গায় কুড়িটি হাত। শ্রী শ্রী চণ্ডী-তে অষ্টাদশভুজা মহালক্ষ্মীর কথা আছে, যাঁর হাত তাঁর থেকেও দুটি বেশি। ডান দিকের দশ হাতে থাকে শূল, খড়্গ, শঙ্খ, চক্র, বাণ, শক্তি, বজ্র, অভয়, ডমরু, ছাতা; আর বাঁ দিকের দশ হাতে থাকে নাগপাশ, খেটক, পরশু, অঙ্কুশ, ধনুক, ঘণ্টা, পতাকা, গদা, আয়না ও মুগুর। দেবী কাত্যায়নী-দুর্গার মূর্তিটিও দশভুজা-দুর্গার অনুরূপ।
মিল ও অমিল
তবে বর্তমানে পরিচিত মহিষাসুরমর্দিনী ও তন্ত্রকথিত মহিষমর্দিনীর রূপে সামান্য পার্থক্য আছে। দেবী মহিষমর্দিনী অষ্টভুজা। তাঁর ধ্যানে সিংহের উল্লেখ পাওয়া যায় না। দেবীকে মহিষের মাথার উপর বসে থাকতে দেখা যায়। হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ, খেটক, ধনুক, বাণ, শূল ও তর্জনীমুদ্রা। এর পূজার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—শঙ্খপাত্রে অর্ঘ্য স্থাপনের উপর নিষেধাজ্ঞা; মৃত্পাত্রে এই কাজটি করতে হয়। কুলাচারে পূজিতা দেবী জয় দুর্গার মূর্তিটি কিছুটা জগদ্ধাত্রী মূর্তির মতো। শুধু দেবীর চার হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ ও ত্রিশূল এবং দেবীর গায়ের রং কালীর মতো কালো। কপালে থাকে অর্ধচন্দ্র। সিংহের পদতলে হাতি অনুপস্থিত। কেউ কেউ মনে করেন, জয় দুর্গা কালী ও দুর্গার সম্মিলিত মূর্তি।
দুর্গা যতভাবে দুর্গতিনাশিনী
মহাশক্তি বলে দুর্গাকে নিদ্রা, ক্ষুধা, লজ্জা, তুষ্টি, আগুনের দাহিকা শক্তি, সূর্যের তেজ, জলের শীতলতা, ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণ্যশক্তি, ক্ষত্রিয়ের ক্ষত্রিয়শক্তি, তপস্বীর তপস্যাশক্তি, ক্ষমাবানের ক্ষমাশক্তি, পৃথিবীর ধারণ ও শস্য-উত্পাদন ক্ষমতা প্রভৃতি বলে স্তব করা হয়েছে ও হয়ে থাকে। যাঁরা শাস্ত্রতত্ত্ব বোঝেন না, তাঁরাই মাটির দুর্গাপ্রতিমাকে দুর্গা মনে করেন। কিন্তু জ্ঞানী ও শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে, ঈশ্বরকেই অবস্থা বিশেষে দুর্গা বলে বর্ণনা করা হয়েছে।