আজ জাতীয় জন্মনিবন্ধন দিবস। মানুষ একবারই জন্মগ্রহণ করে। জন্মগ্রহণের তারিখ যদি ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হয়, তাহলে তিনি যে মিথ্যা দিয়ে জীবন শুরু করলেন, তা একজন অল্প বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও একমত হবেন। জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে সঠিক জন্ম তারিখের কথা শুধু আধুনিক রাষ্ট্রই বলছে না, বহু বছর আগে থেকে বিভিন্ন ধর্মও সে কথা বলে আসছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিগত ত্রুটির কারণে এবং রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার কারণে আমরা অধিকাংশ (বিশেষ করে বয়স্করা) ভুল জন্ম তারিখ বয়ে বেড়াচ্ছি।
জন্মনিবন্ধনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মধ্যযুগে (১৪২৫-২৬ খ্রিষ্টাব্দে) খ্রিষ্টসমাজে গির্জার পাদ্রিরা শিশুদের সাময়িকভাবে পানিতে ডুবিয়ে খ্রিষ্টসমাজে দীক্ষিতকরণ ও খ্রিষ্টান নামকরণ করাতেন (যাকে ইংরেজিতে Baptisme বলে)। পরবর্তী আমলে সেখানে জন্মনিবন্ধনের বিষয়টি স্থানীয় কমিউনিটিতে ন্যস্ত করা হয়। ভারতবর্ষে দীর্ঘকাল আগে থেকে বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র বিদ্যমান। জ্যোতিষশাস্ত্রমতে শিশুর জন্মের সময় কোনো না কোনো গ্রহের প্রভাব থাকে। গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে কুণ্ডলী বা কুষ্ঠিমিলন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। বিশেষ করে বিবাহের সময় জাতকদের কুষ্ঠির গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করে বলা হয় নবদম্পতির ভবিষ্যত্ জীবন কেমন হবে। কুষ্ঠিমিলন পদ্ধতির স্বার্থেই শিশুর নাম, জন্ম তারিখ, দিন, মাস, বছর ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করে রাখা হতো। হিন্দু সমাজের কুষ্ঠিনামা দেখে সচ্ছল মুসলমান পরিবারেও শিশুর জন্ম তারিখ লিখে রাখার রেওয়াজ চালু ছিল। এরই অংশ হিসেবে একসময় ভারতবর্ষে পঞ্জিকার ব্যবহার শুরু হয়।
শিশুদের নাম ও জন্ম তারিখ লিখে রাখার বিষয়ে একেক দেশে একেক নিয়ম চালু রয়েছে। ইংল্যান্ডে ও ওয়েলসে পিতামাতাকে তাদের সন্তানের জন্মের ৪২ দিনের মধ্যে একটি নাম নির্ধারণ করতে হয়। জার্মানিতে এমন নাম রাখতে হয়, যা দেখে বোঝা যায় শিশুটি ছেলে না মেয়ে। মিসরে শিশুর জন্মের এক সপ্তাহ পর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নাম চূড়ান্ত করা হয়। ঐ অনুষ্ঠানে জ্বালানো হয় তিনটি মোমবাতি। একেকটি মোমবাতি একেকটি নামের প্রতিনিধিত্ব করে। শেষ পর্যন্ত যে মোমবাতি দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলে, সেটি বিজয়ী হয়। বাংলাদেশে মুসলিম সমাজে সন্তান জন্মের সাত দিন পর অথবা ১৪ তম দিনে অথবা ২১তম দিনে একটি পশু জবাই করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা হয়। একে আকিকা বলে। ঐ দিন সন্তানের মাথা মুণ্ডন করে নাম রাখা হয়। তবে জন্ম তারিখ লিখে রাখার প্রচলন দেখা যায় না।
ব্রিটিশ সরকার এ দেশের মানুষের জন্মনিবন্ধনের বিষয়ে অমনোযোগিতা লক্ষ করে ১৮৭৩ সালের ২ জুলাই অবিভক্ত বাংলায় জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত আইন জারি করে। প্রথমে জন্মনিবন্ধনের কার্যক্রম স্বাস্থ্য বিভাগের হাতে ন্যস্ত করা হয়। পরে অবশ্য এটিকে স্থানীয় সরকারের অধীনে দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ ১১৮ বছরে আইনের নানান পরিবর্তন সত্ত্বেও দেশের শতভাগ মানুষ জন্ম নবন্ধনের আওতায় না আসায় ২০০১-২০০৬ সালে ইউনিসেফ-বাংলাদেশের সহায়তায় পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ২৮টি জেলায় ও চারটি সিটি করপোরেশনে জন্মনিবন্ধনের কাজ নতুনভাবে আরম্ভ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৭৩ সালের আইন রহিত করে সরকার ২০০৪ সালের ৭ ডিসেম্বর জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ প্রবর্তন করে। আইনটি ২০০৬ সালের ৩ জুলাই থেকে কার্যকর হয়। ২০০১-২০০৬ সালের পাইলট প্রকল্প শেষে প্রকল্পটি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়) নামে আরম্ভ হয়ে ২০১২ সালে শেষ হয়। প্রকল্পটির তৃতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম জুলাই ২০১২ থেকে শুরু হয়ে ২০১৬ সালের জুন মাসে শেষ হয়। সারা দেশে ১৬ কোটি ৮৮ লাখের অধিক লোকের জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হয়। বর্তমানে সারা দেশে ১২টি সিটি করপোরেশনের ১২৪টি আঞ্চলিক অফিস, ৩২৯টি পৌরসভা, ৪ হাজার ৫৭৩টি ইউনিয়ন পরিষদ, ১৫টি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড ও ৪৪টি দেশের ৫৫টি দুতাবাস বা মিশনসহ মোট ৫ হাজার ১০৭টি নিবন্ধক অফিসে সরাসরি ও নিয়মিত যোগাযোগ সমন্বয় করে অনলাইনে নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে। সরকার ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিদ্যমান জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম অব্যাহত ও গতিশীল রাখার স্বার্থে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংশোধন করে রেজিস্ট্রার জেনারেল, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধক অফিস স্থাপন করে (সূত্র :উইকিপিডিয়া)। বর্তমান সরকার জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ (২০১৩ সালে সংশোধিত) এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিধিমালা ২০১৮-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে।
যে কোনো প্রকল্পের শুরুতে বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি থাকাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধনের বিষয়টিও ব্যতিক্রম নয়। কোনো কোনো কেন্দ্রে দেখা গেছে, চুক্তিভিত্তিক ব্যক্তিরা দ্রুত কাজ শেষ করতে গিয়ে বহু ব্যক্তির নাম, জন্ম তারিখ এন্ট্রি করতে গিয়ে ভুল করে। বর্তমানে ৫ হাজার ১০৭টি কেন্দ্রে অনলাইনে নিবন্ধন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে ১৮ কোটি মানুষের জন্মনিবন্ধন করার জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এরই মধ্যে প্রায় ৩৩ কোটি মানুষের জন্মনিবন্ধন হওয়ায় পুরো প্রকল্পটির স্বচ্ছতার বিষয়ে প্রশ্ন আসা শুরু হয়েছে। ধারণা করা হয়, এক ব্যক্তি একাধিকবার জন্মনিবন্ধন করায় এমনটি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সব অনিয়মের পেছনে রয়েছে শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন না করা। রেজিস্ট্রার জেনারেল একাধিক জুম মিটিংয়ে ৪৫ দিনের মধ্যে শতভাগ শিশুর জন্মনিবন্ধন করার জন্য কঠোরভাবে তাগাদা দিয়েছেন। এক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের নিবন্ধকদের বক্তব্য, ৪৫ দিনের মধ্যে শিশুর জন্মনিবন্ধন করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। যেমন—শিশুটির পিতামাতার জন্মনিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, দুই জনেরই জন্মনিবন্ধন নাই কিংবা একজনের আছে। তাদের জন্মনিবন্ধন করার নিয়মটি সহজীকরণ না হওয়ায় এক দিনে তারা শিশুর জন্মনিবন্ধন করতে পারছেন না। বর্তমানে নিবন্ধকেরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নেওয়ায় ৪৫ দিনের মধ্যে শিশুর জন্মনিবন্ধনের হার ২৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এখন প্রয়োজন অভিভাবক শ্রেণী, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য বিভাগের মাঠকর্মী, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সার্বিক সহযোগিতা।
n লেখক :গণতন্ত্রায়ণ ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক