মহামায়া সনাতনী শক্তিরূপা গুণময়ী তিনি এক, তবু তার প্রকাশ বিভিন্ন—অপার পূর্ণময়ী শক্তিরূপা কখনো মহেশ্বরীরূপে মেঘমালা, কখনো ব্রহ্মময়ী রূপধারিণী মহাবজ্ররূপিণী ঐন্দ্রি উগ্রা শিবদুতি মুণ্ডমালিনী চামুণ্ডা, তিনিই আবার তমোময়ী নিয়তি। এই সপ্ত প্রকাশমনা মহাশক্তি পরমাপ্রকৃতির আর্ভিভাব হবে—সপ্তলোক তাই আনন্দমগ্ন।
এমন কথামালায় গাথাস্তুতির বজ্রকণ্ঠের সুর ভেসে আসতেই পড়ে যায় ঢাকের কাঠি। বুঝতে বাকি থাকে না অকালবোধনের আহ্বান এসে গেছে। মা আসছেন। আজ তার আগমনে ঢাকে পড়বে কাঠি বাজবে শঙ্খ কাসর-ঘণ্টা। আজ শুভ মহালয়া।
বোধ করি এ কথাগুলো বুঝতে আর কারো বাকি নেই যে কী বিষয়ের অবতারণা হচ্ছে। সেই ছোট্টকালে যবে মনচেতনা জাগ্রত হয়েছিল, সেদিন দিক থেকে প্রতিটি সনাতনী বাঙালির ঘরে ঘরে শরতের এই আহ্বান আজও অম্লান। শরতের পিতৃপক্ষের অবসান আর দেবীপক্ষের সূচনালগ্নে শুরু হয়ে যায়, মহালয়া বা চণ্ডী থেকে স্তবস্তুতি পাঠ, দেবীর আরোধনা, নারায়াণীস্তুতি। এমন মনকাড়া স্তুতি সে তো একজনের কণ্ঠেই মানায়। তিনি প্রয়াত বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র। ঐ উষালগ্নে প্রত্যুষে একটি ট্র্যানজেস্টারের সামনে বসে পড়া ছিল রীতিমতো এক নস্টালজিয়া।
মহালয়ার গুরুত্ব বাঙালির কাছে ভিন্ন মাত্রা বহন করে চলেছে। ধর্মীয় বা পৌরাণিক মতে সপ্তলোক বলতে আকাশমণ্ডলের সাতটি স্তরকে বোঝানো হয়। সনাতন মতে, সাত স্বর্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরাণমতে ব্রহ্মাণ্ডের ঊর্ধ্বাংশ সাতটি যা জগতের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো হচ্ছে ভূলোক, ভুবলোক, স্বলোক, মর্ত্যলোক, জনলোক, তপোলোক এবং উপরে সত্য বা ব্রহ্মলোক। তবে অথর্ববেদ অনুসারে ১৪ লোকের বিবরণ পাওয়া যায়। উপরে বর্ণিত সপ্তলোক হচ্ছে স্বর্গ। বাকিগুলো হচ্ছে পাতাল বা নরক। সপ্তস্বর্গের ঠিক নিচে সপ্তপাতাল অবস্থিত। অমরাবতীকে বলা হয় স্বর্গের রাজধানী। রাজধানীর প্রবেশপথের প্রহরায় নিযুক্ত ইরাবত। আর দেবরাজ ইন্দ্র সেখানে স্বমহিমায় অবস্থান করেন।
মহালয়াকে অতিপুণ্যময় তিথি হিসেবে পালন করা হয়। এই তিথিতে পৃথিবী স্বর্গলোকে পরিণত হয় বলে সনাতনী বিশ্বাস। বলা হয়, প্রয়াত পূর্বপুরুষেরা উত্তরপুরুষের দ্বারে দ্বারে উপস্থিত হয়ে যান এই পুণ্যলগ্নে, যখন মহামায়ার স্তবগাথা স্তুতি বেজে ওঠে ভুবন জুড়ে। এ দিনটি দুর্গাপূজার আগমনিবার্তা বয়ে আনলেও পূজার সঙ্গে বস্তুত এর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই মহালয়া। কারণ একটিই, সেটি হলো অনেকেই পিতৃ-মাতৃকুলের শ্রাদ্ধাদি তিথি যোগ অনুযায়ী করতে পারেন না বা ভুলেও যান অনেকে। এদিনে এই কাজটি তারা করতে পারেন। পাশাপাশি পূর্ব তিনপুরুষের আত্মার শান্তি কামনার জন্য এটি উত্কৃষ্ট দিবস। তর্পণের জন্য এই দিবস প্রশস্ত। গঙ্গায়, পুকুরে এমনকি বাসায় বসে বিশেষ ব্যবস্থায় এই দিনে পূর্ব তিনপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ দান ইত্যাদি করা হয়। তিলজল বা শুধু জল দ্বারাই এই তর্পণ চলতে পারে। এদিন পূর্বপুরুষের যাত্রাপথকে আলোকিত করার জন্য উল্কাদান করেন। রামচন্দ্র বনবাসে থাকার সময় শুধু জল দিয়ে তর্পণক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন। তর্পণাদির দ্বারা পূর্বপুরুষগণ তৃপ্ত হন, এমনকি নরকযন্ত্রণা থেকেও মুক্তি পেতে পারেন। শুধু পূর্বপুরুষ কেন এটি এতটাই সর্বজনীন যে, জগদ্বাসী, শত্রুমিত্র পশুপক্ষী সকল প্রাণীর উদ্দেশেও তর্পণাদি করা হয়ে থাকে। যারা তর্পণাদি করেন তারা তর্পিত সকলের নিকট থেকে বিশেষ আশীর্বাদপ্রাপ্ত হন। ‘ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যান্ত ভুবনত্রম, আব্রহ্ম স্তম্ভ পর্যন্তং তৃপ্যন্ত’। তর্পণ ছাড়া মুক্তি নাই মুক্তি নাই বলেও মন্ত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।