শহরে অভিবাসন রোধে গ্রামে শিল্প স্থাপনে উত্সাহ দিতে হবে

বিআইডিএসের গবেষণা

ইত্তেফাক রিপোর্ট

গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন রোধে গ্রাম পর্যায়ে শিল্প স্থাপনে উত্সাহিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি প্রণোদনাগুলো সেভাবে সাজানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)। গতকাল বুধবার ‘লোকাল ননফার্ম অপরচুনিটি অ্যান্ড মাইগ্রেশন ডিসিশন : এভিডেন্স ফ্রম বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় এই সুপারিশ করা হয়। গবেষণা নিয়ে গতকাল সেমিনারের আয়োজন করা হয়। বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. কাজী ইকবাল এতে মূল পত্র উপস্থাপন করেন। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন এতে সভাপতিত্ব করেন।

কাজী ইকবাল উল্লেখ করেন, কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর দিকে যখন দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা করা হলো তখন আমরা গ্রাম থেকে শহরে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের দুর্দশা লক্ষ করেছি। বাংলাদেশ, ভারতসহ আরো অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি ছিল নিঃসন্দেহে একটি কঠিন মানবিক বিপর্যয়। বিপুল পরিমাণ শ্রমিক তাদের স্থায়ী বাসস্থান থেকে অনেক দূরবর্তী স্থানে কাজ করার কারণেই এই বিপর্যয় তৈরি হয়েছিল। এ ধরনের পরিস্থিতিতে উন্নত দেশগুলোতে তৈরি হয়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় এড়াতে শ্রমিকদের স্থায়ী বাসস্থানের কাছাকাছি স্থানে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিকল্প নেই।

গবেষণায় দেখা যায়, অকৃষি খাতের আয় বৃদ্ধি পেলে পৌরসভা এলাকা থেকে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের প্রবণতা হ্রাস পায়। গ্রামীণ এলাকা থেকে নয়। তবে অকৃষি খাতের আয় বৃদ্ধি পেলে গ্রামীণ এলাকা থেকে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন উত্সাহিত হয়। যেসব পরিবারের আয় এবং শিক্ষা তুলনামূলক বেশি এবং জমির পরিমাণ অপ্রতুল, সেসব পরিবারের ক্ষেত্রে এ প্রভাব বেশি। তবে ইউনিয়ন পর্যায়ে অভিবাসনের প্রবণতা কম।

এ গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্তত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাময়িক দুর্ভিক্ষ কমানো এবং দারিদ্র্য বিমোচনে অভিবাসন-ভর্তুকিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এ কৌশল সাময়িক দুর্ভিক্ষ সমস্যার স্বল্পমেয়াদি সমাধান দিতে সক্ষম হলেও এটিকে বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়ন করতে গেলে শহর এলাকায় দীর্ঘ মেয়াদে মজুরির হার হ্রাস এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাই গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে যেন গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের মাত্রা কমে আসে।

গবেষণায় আরো উল্লেখ করা হয়, মৌলিক প্রশ্ন হলো শিল্পকারখানার অবস্থান বিবেচনা করে শ্রমিকদের শিল্পের কাছাকাছি জায়গায় বাসস্থান নির্ধারণ করা উচিত, নাকি শিল্পকারখানাগুলোকে শ্রমিকদের অবস্থানের কাছাকাছি জায়গায় স্থাপন করা উচিত। এযাবতকাল বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রথম কৌশলটি ব্যবহার করেছে। একটি দেশের উন্নয়নের প্রথম পর্যায়ে এটি সমর্থনযোগ্য হলেও দেশের উন্নতির পরবর্তী ধাপে যখন শহরগুলোর ওপর শিল্পকারখানা এবং জনসংখ্যার চাপ বেড়ে যায়, তখন ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন এবং জনকল্যাণের স্বার্থে দ্বিতীয় কৌশলটি বেশি কার্যকর। এ লক্ষ্যে ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তারা নিজ উদ্যোগে প্রত্যন্ত এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপন করবেন, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়, কারণ সেসব এলাকায় উত্পাদন খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি। তাই সরকারের পক্ষ থেকে এমন প্রণোদনা কাঠামো তৈরি করতে হবে যেন ব্যক্তি খাত গ্রাম এলাকায় বা শহরের বাইরে শিল্পকারখানা স্থাপনে উত্সাহিত হয়। যেহেতু তৈরি পোশাক শিল্প কারখানার শ্রমিকদের সিংহভাগ গ্রাম থেকে আসেন। সরকারের উচিত গ্রামে যেমন প্রতি ইউনিয়নে একটি শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা।