কৃত্রিম বৃষ্টিপাতে স্বকীয়তা হারাবে প্রকৃতি

তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত হয় এমন শুষ্ক অঞ্চলে সম্প্রতি কৃত্রিম বৃষ্টি ঘটিয়ে প্রাণসঞ্চারের প্রচেষ্টা আধুনিক বিজ্ঞানের উত্কর্ষতাকে প্রমাণ করেছে। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণত পরিবেশের মুক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে বাতাসে পানির পরিমাণ বাড়ানো হয়, যা স্বল্প সময়ের ব্যবধানে নির্দিষ্ট অঞ্চলটিতে কুয়াশা, বৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি হিসেবে আবির্ভূত হয়। কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটানোর এই প্রক্রিয়া ক্লাউড সিডিং নামে পরিচিত।

সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে ক্লাউড সিডিং পদ্ধতিটি কেবল আবহাওয়া পরিবর্তনের একটি কৃত্রিম উপায়, যার লক্ষ্য হলো মেঘ থেকে কোনো এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বা ধরনকে প্রভাবিত করা। তবে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটানোর এই প্রক্রিয়ায় অনেক সুবিধা থাকলেও পরিবেশবিদেরা এটিকে দেখছেন দীর্ঘ মেয়াদে প্রাকৃতিক পরিবেশের হুমকি হিসেবে। পূর্বে কোনো শুষ্ক অঞ্চলের মেঘ অন্যত্র উড়ে গিয়ে বৃষ্টিপাত ঘটালেও কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টিপাত ঘটালে বিঘ্নিত হবে প্রকৃতির এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। চিরহরিত্ বনাঞ্চলে হঠাত্ দেখা দিতে পারে তীব্র খরা। নদী শুকানোর কারণে নদীর ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করা মানবসভ্যতায় বাড়বে মানবিক আবেদন। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দারিদ্র্যপীড়িত শুষ্ক অঞ্চলগুলো হয়ে উঠতে পারে আরো শুষ্ক। মানুষের বেশি বৃষ্টির প্রয়োজন হচ্ছে ভেবে ক্লাউড সিডিং পদ্ধতি বারবার প্রয়োগ করলে কমতে পারে বৃষ্টির মোট পরিমাণ।

এই পদ্ধতিতে মেঘকে পুঞ্জীভূত করতে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ যেমন সিলভার আয়োডাইড, পটাসিয়াম আয়োডাইড, তরল প্রোপেন ও শুষ্ক বরফ ব্যবহার করা হয় এবং এসব পদার্থ মেঘ ঘনীভূতকরণ ও মেঘের মধ্যে সংঘটিত মাইক্রোফিজিক্যাল পদ্ধতি পরিবর্তন করতে সহায়তা করে। পুঞ্জীভূত মেঘমালার তাপমাত্রা যখন মাইনাস ২০ থেকে মাইনাস ৭-এর মধ্যে থাকে, তখনই কেবল বৃষ্টি হয়।

তবে ক্লাউড সিডিংয়ে ব্যবহার করা সিলভার আয়োডাইড পরিবেশের ওপর কীরূপ প্রভাব ফেলছে, সে সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট অধ্যয়ন করা হয়নি। বারবার এই পদ্ধতি প্রয়োগ করলে পরিবেশে আয়োডিনের যে ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতির দেখা মিলবে, তা থেকে আয়োডিন দ্বারা সৃষ্ট একধরনের বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাণিজ্যিক সাময়িকী ফোর্বসে প্রকাশিত ‘ক্লাউড সিডিং :পরিবেশের সঙ্গে আমাদের কি পাঙ্গা নেওয়া উচিত?’ নামক গবেষণা প্রবন্ধে পরিবেশবিজ্ঞানী জেমস কনকা বলেছেন, কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে সেই পানি দিয়ে আমরা বিস্তৃত পরিসরে কৃষিকাজের যে ছক অঙ্কন করছি, তা হিতে বিপরীত হতে পারে। আয়োডিনঘটিত বিষক্রিয়া উদ্ভিদের মাধ্যমে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে মানবশরীরে। ত্বকে ফুসকুড়ি, মাথাব্যথা এবং নাক ফুলে যাওয়া ইত্যাদি।

আবার ক্লাউড সিডিং একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া হওয়ায় পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চল এই প্রযুক্তির ভার বহন করতে পারবে না বলে বাড়বে অর্থনৈতিক বৈষম্য। যেসব অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ও খরা রয়েছে, ক্লাউড সিডিংয়ের কারণে সেসব অঞ্চলের মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়বে। মৌসুমি জলাধারগুলো শুকিয়ে যাবে চৈত্রের দাবদাহের বহু আগেই।

এত সব আলোচনার ভিড়ে ক্লাউড সিডিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। অনেক পরিবেশবিদ আবার এটিকে নিছক পরিবেশে বিষ মেশানোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ ক্লাউড সিডিং সফল হওয়া নির্ভর করে রাসায়নিকগুলো আদৌ বৃষ্টির মেঘে সঞ্চালিত হয়েছে কি না তার ওপর।

বৃষ্টি ঘটাতে সক্ষম নয় এমন কম ঘনত্বের মেঘে রাসায়নিক প্রয়োগ করলে শুধু ক্লাউড ফরমেশনে পরিবর্তন হবে বলে মত দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে মেঘমালা সম্ভাব্য অঞ্চলে বৃষ্টিপাত না ঘটিয়ে বাতাসের প্রভাবে অন্যত্র বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে।

পরিসংখ্যানগতভাবে ক্লাউড সিডিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে অনেক সন্দেহ, দ্বিধাদ্বন্দ্বের জন্ম নিলেও কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের বার্ষিক হার বাড়াতে কার্যকর বলে মনে করেন অনেক বিজ্ঞানী। কারণ ক্লাউড সিডিং প্রয়োগ করতে গেলে ন্যূনতম মেঘের অস্তিত্ব থাকতে হবে।

ফলে ক্লাউড সিডিং কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের তাপমাত্রাকে সাময়িক কমাতে সক্ষম হলেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে জলবায়ুর ওপর, যা থেকে অনেকের মনে এমন সন্দেহের উদ্রেক করে যে, ক্লাউড সিডিং ব্যবহার করে নির্দিষ্ট অঞ্চলের সামরিক অস্ত্র পরীক্ষাস্থলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বৃষ্টিপাত ঘটানো, বৃষ্টির মাধ্যমে রাসায়নিক প্রয়োগে জনস্বাস্থ্য হুমকিতে ফেলা এবং বন্যা সৃষ্টিসহ বিভিন্ন অবস্থায় আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার হবে নিকট ভবিষ্যতে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়