পাঠপ্রতিক্রিয়া

রাশিয়াপাঠের মধ্য দিয়ে বিশ্ববীক্ষণ

বরেন চক্রবর্তীর ‘রাশিয়ার মেয়ে’ পড়তে গেলে বড় করে দম নিতে হয়। একটা ইটের সাইজে ১২০০ পৃষ্ঠার বই। বই না বলে মহাকাব্যিক উপন্যাস বলা যায়। পড়তে ভয় লাগবে, কিন্তু একবার পড়া শুরু করলে না পড়ে উপায় নেই। রাশিয়ার মেয়ে নাতালিয়া আপনাকে মোহাবিষ্ট করবে, এটা খুব সাধারণ ব্যাপার। অসাধারণ ব্যাপার হলো—আপনি রাশিয়ার ভেতরে দিয়ে বিশ্বপাঠ করে ফেলতে পারবেন। রাশিয়া সেই দেশ যেখানে তলস্তয়, দস্তয়েভিস্ক, পুশিকন, চেখভ, তুর্গেনভ, ইয়েসেনিন, গোর্কি, মায়াকোভস্কি কিংবা গোগলের চেয়ে বড় লেখক পৃথিবীতে আর জন্ম হয়নি। নারীর ভালোবাসা এখানে পায়ের কাছে ঢলে পড়ে ঠিক বৃষ্টির ফোঁটার মতো। প্রেম-ভালোবাসা এখানে মিউজিক্যাল চেয়ার খেলার মতো। সামনে চেয়ার খালি থাকলেই বসে যাও। এখানে বান্ধবী খুঁজে পাওয়া এক বোতল মদ খুঁজে পাওয়ার চেয়েও সহজ। শীতকালে সেখানে আকাশ থেকে পেঁজা তুলোর মতো স্বচ্ছ সাদা তুষার ঝরে পড়ে। বরফে ঢেকে যায় মস্কোর দিগ্বলয়। সে যেন এক হিমবসনা ধরিত্রী।

বরেন চক্রবর্তী সেই পটভূমির চিত্রনাট্য তুলে ধরার পাশাপাশি রাশিয়ান মেয়ে নাতালিয়ার প্রেম-ভালোবাসা, ত্যাগ-বঞ্চনা এবং সংগ্রামের চিত্রও তুলে ধরেছেন দারুণভাবে। নাতালিয়া যেন তার অলৌকিক উদ্বাহিনী দিয়ে উত্তরোত্তর বেঁধে ফেলে বাংলাদেশের কমলকে। নেভা পাড়ের মেয়ে নাতালিয়ার নিটোল নিখুঁত অঙ্গসৌষ্ঠব, ঘোরলাগানো কটিদেশ, সোনালি ফিনফিনে চুল আর পরিপুষ্ট কুচযুগলের অবাধ্য ইশারা কেবল কমলকে নয়, পাঠককেও যেন বিবশ করে দেয়।

এ উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পেয়েছে কমিউনিজম ভাবালুতা কেটে যাবার নেপথ্য রহস্য। নাতালিয়া যখন কমলকে নিয়ে স্ট্যালিনের সমাধির সামনে দাঁড়ায়, তখন কমলের ছলছলে চোখ দেখে অবাক হয়ে যায় নাতালিয়া। সে শ্লেষ করে বলে, তোমার চোখের জল কি জোশেফ স্ট্যালিনের জন্য, না স্ট্যালিন যে লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষ হত্যা করেছে—তাদের জন্য? নাতালিয়া মনে করে, পাঁচ কোটি মানুষকে যে লোক শুধু সন্দেহের বশে হত্যা করেছে আর কোটি কোটি নিরপরাধ মানুষকে যে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করেছে, সেই লোক রুশ আদর্শের প্রতীক হতে পারে না। তার মতে, জার আর কমিউনিস্টদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কিন্তু কমল মনে করে, স্ট্যালিন ঠিক কাজটিই করেছে, ফুলের বাগানে আগাছা রাখতে নেই।

নাতালিয়ার হাত ধরে কমলের রাশিয়া-বীক্ষা এই উপন্যাসের সবচেয়ে উপভোগ্য অংশ। কোথায় না চষে বেরিয়েছে তারা? এর পাশাপাশি যে তর্ক-বিতর্কের ফোয়ারা ছুটেছে দুজনের মধ্যে,             তা যেন নবোচ্ছ্বাসে পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় রাশিয়ান শিল্পসাহিত্য-দর্শন-রাজনীতির এক অমোঘ সত্যের মুখোমুখি। পরিশিষ্টের নির্ঘণ্টে ৪০৪টি স্বতন্ত্র স্থান বা বিখ্যাত ব্যক্তি অথবা শিল্পকর্মের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে এ উপন্যাসে। অবসর প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত ‘রাশিয়ার মেয়ে’ সব মিলিয়ে পাঠকের কাছে এক বিপুল বিস্ময় হয়ে ধরা দেবে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এই মহাউপন্যাসের অনন্য উদাহরণ বাংলায় আর দ্বিতীয়টি নেই।

মেহেদী হাসান টিটো