কর্মজীবী মুসলিম নারীর অনুপ্রেরণা

কারুশিল্পী সাহাবিয়্যা জয়নব আস-সাকাফিয়্যাহ

ইসলামে নারীর সম্মান ও মর্যাদার সর্বজনীন সৌন্দর্যের কথা আমরা সর্বদাই শুনতে পাই। সত্যিকার অর্থে ইসলামপূর্ব আরবের জাহেলি সমাজে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, এর বিপরীতে সম্মানজনক নারী ব্যবস্থার উপস্থাপনা ইসলামি জীবনদর্শনকে অমরত্ব দান করেছে। সত্যিকার অর্থে ইসলাম পুরুষের ন্যায় নারীকে ঘরের বাইরে কর্মের ব্যাপারে বাধ্য করেনি, তবে কাজ করতে নিষেধও করেনি। ইসলামের যথাযথ নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় সব কাজে অংশগ্রহণের অনুমতি রয়েছে। নারীর পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক কর্মের স্বাধীনতা ছিল বলেই রসুলুল্লাহ (স)-এর যুগে বেহেশতের সুসংবাদপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সাহাবি হজরত জোবায়ের (রা)-এর স্ত্রী, হজরত আবুবকর (রা)-এর কন্যা আসমা (রা)-এর ঘোড়ার ঘাস সংগ্রহ করা, খেজুর বাগানের পরিচর্যা, খেজুরের আঁটি বহন করে বাড়ি আনা থেকে সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করতেন। হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহর খালা তালাকপ্রাপ্ত হলে তিনি খেজুরবাগান থেকে খেজুর সংগ্রহ করতেন। হজরত রসুলুল্লাহ (স) এটা জানলে বললেন, এতে কোনো ক্ষতি নেই। মহিলা সাহাবি ক্বিলাহ (রা) বাজারে ব্যবসা করতেন। ওহুদের যুদ্ধে উম্মে আম্মারা (রা) শত্রুদের তরবারির ডজন খানেক আঘাত সহ্য করেও বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে রসুল (স)-এর ওপর আক্রমণকারী শত্রুদের প্রতিহত করেছিলেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা)-এর সময় উম্মে শিফা নামক মহিলা বাজারের পরিদর্শক (আল হিসবাহ্) হিসেবে নিয়োজিত হন। রুফায়দা আল-আসলামিয়া প্রথম মুসলিম নারী ডাক্তার ছিলেন। রসুল (স) খন্দকের যুদ্ধের সময় তাকে মদিনার মসজিদের পাশে তাঁবু টানিয়ে দিয়েছিলেন এবং সেখানে তিনি যুদ্ধাহত মুসলিম সেনাদের শুশ্রূষা করতেন। আশ শিফা বিনতে আবদুল্লাহ মুসলিম মহিলাদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য বের হতেন। আরো এমন অনেক উদাহরণ আছে, যা নারীদের সম্মান ও অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

আজ এক মহীয়সী কারুশিল্পী সাহাবিয়্যাহর কথা বলব; তিনি হলেন হজরত রায়্যেতা বিনতে আবদুল্লাহ ইবনে মুয়াবিয়্যা আস-সাকাফিয়্যাহ (রা)। রসুলুল্লাহর প্রসিদ্ধ সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের স্ত্রী। তাকে রায়্যেতা উপনামেও অভিহিত করা হয়। তবে তিনি জয়নব উপনামে অধিক প্রসিদ্ধ। তিনি রসুল (স)-এর পরিবারে বেড়ে ওঠা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের স্ত্রী ছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এমন এক সাহাবিয়ার সঙ্গে রসুল (স)-এর হিজরতের যাত্রার রাস্তায় দেখা হয়েছিল এবং তার বকরির পাল হতে একটি শুষ্ক বকরির দুগ্ধ পান করেছিলেন। উল্লেখ্য, এ বকরির আগে থেকে বাচ্চা বা দুগ্ধ ছিল না। রসুল (স)-এর বরকতে তার স্তনে দুধ এসেছিল। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ শৈশবেই ইসলাম গ্রহণ করে হিজরত করেছিলেন এবং রসুল (স)-এর সেবায় নিজেকে উত্সর্গ করেছিলেন। তার কোরআন তেলাওয়াত এতই হূদয়স্পর্শী ছিল যে রসুল (স) তার কোরআন তেলাওয়াত শুনলে অশ্রুসিক্ত হতেন।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ অনেকটাই সংসার-বৈরাগী ছিলেন। ইবাদতে আধ্যাত্মিকতা তাকে মোহবিষ্ট করে রাখত। অনেক হাদিসবেত্তা বলেছেন, মূলত এ কারণেই তার পরিবারে দরিদ্রতা লেগে থাকত। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের স্ত্রী দরিদ্র পরিবারে এসে কোনো হতাশা প্রকাশ করেন নাই বরং এ পরিবারকে নিজের করে নিয়েছেন এবং অভাব-অনটনের পরিবারকে সহযোগিতা করার জন্য নিজ পরিবার থেকে প্রাপ্ত কাজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান। মুসতাদরেকে হাকেমের ভাষ্য মতে, তিনি বুননশিল্পে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। আবার কারো কারো মতে, তিনি কাপড়ে কারুকাজে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। যাই হোক তিনি গার্মেন্টস-সংক্রান্ত শিল্পে দক্ষ ছিলেন, এ কথা বলা যায়। তার দক্ষতা ও মেধার স্বাক্ষর রেখে তিনি সম্পত্শালী হয়েছিলেন। তার কাপড় উত্পাদন ও বিক্রির ব্যাপারে কেউ কেউ আপত্তি করলে তিনি রসুল (স)-এর কাছে গিয়ে পরিবারের অর্থসংকটের কথা বলেন এবং এর উত্তরণে তার প্রচেষ্টার কথা জানান। রসুল (স) সার্বিক অবস্থার বিবেচনা করে তাকে তার শিল্পকর্ম চালিয়ে যেতে অনুমতি দিয়েছিলেন এবং এ কাজ তিনি দক্ষতার সঙ্গে সামলেছিলেন। এ কাজ করে তিনি যে স্বাবলম্বী হয়েছিলেন এবং জাকাত দানের উপযুক্ত হয়েছিলেন।

মুহাদ্দিসদের বর্ণনা অনুযায়ী হজরত জয়নব রসুল (স) থেকে আটটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। সামর্থ্য আসার পর তিনি পরিবারের জন্য ব্যয় করে উন্মুক্তভাবে দান করতেন। তার দানের ব্যাপারে সাহাবিদের অনেকেই তাদের হাদিসে বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের ইন্তেকালের পর তিনি আর বিবাহ করেননি। বরং নিজ পরিবার ব্যবসা আর দান সদকায় নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন।

একজন কর্মজীবী মুসলিম নারীর জন্য আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের স্ত্রী যয়নব একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত। পরিবারের প্রয়োজনে ইসলামি পদ্ধতি মেনে তিনি শুধু ব্যবসাই করেননি বরং সফলতা এসেছে এবং পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে তিনি ব্যাপকভাবে সাদাকাহ করেছেন। বাঙালি নারীসমাজ তাকে অনুসরণ করে দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার দীক্ষা নিতে পারেন। বিশেষত আধুনিক যুগে একজন মুসলিম নারী পোশাকশিল্প, আউটসোসির্ং, ই-কমার্সসহ নারী ও ইসলামি পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নিজেদের ব্যাপৃত রাখতে পারেন।

l লেখক : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ও ইন্টারফেইথ বা আন্তঃধর্ম বিশেষজ্ঞ