করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় জয়পুরহাট জেলায় ব্যাপক হারে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিকভাবে ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধান চালিয়ে ১ হাজার ৮৪ শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহের তথ্য মিলেছে। কর্মহীন বাবা-মাকে সহায়তা করতে অনেক শিক্ষার্থী কাজে যোগ দিয়েছে। স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কমেছে স্কুলে উপস্থিতির হার।
জেলা শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, জয়পুরহাট জেলায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা (স্কুল ও মাদ্রাসা) হচ্ছে ২৯৫টি। এখানে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হচ্ছে ৩২ হাজার ৮১০ জন। এর মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার্থী ৯ হাজার ১৫৩ জন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে পাঁচবিবি উপজেলা উপজেলাতেই সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে।
পাঁচবিবি উপজেলার রতনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০ ছাত্রী, সোনাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে আট ছাত্রী, জীবনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩৫ ছাত্রী ও বাগজানা আছিরিয়া মাদ্রাসার পাঁচ ছাত্রী, ধরঞ্জি উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৫ ছাত্রী, কোতালীবাগ উচ্চ বিদ্যালয়ের তিন ছাত্রী, শ্রীমন্তপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সাত ছাত্রী, ধরঞ্জি মাদ্রাসার ৩০ ছাত্রী, উচনা মাদ্রাসার ২০ ছাত্রী, রসুলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ ছাত্রী, আয়মা হাজিমুনির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৬ ছাত্রীর, আয়মারসুলপুর বালিকা বিদ্যালয়ের ২৬ ছাত্রী, বড় মানিক বালিকা দাখিল মাদ্রাসার ২০ ছাত্রী, মালিদহ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২ ছাত্রী, আগাইর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৫ ছাত্রী, কড়িয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার ৪৭ ছাত্রী, বুধইল মাদ্রাসার দুই ছাত্রী, বীরনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯ ছাত্রী ও একজন ছাত্র, কোকতারা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২ ছাত্রী, আটুল মাদ্রাসার ৯ ছাত্রী, মহিপুর মাওলানা ভাসানী উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০ ছাত্রী, নীলতা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী, দিবাকরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ ছাত্রী, উচাই বালিকা বিদ্যালয়ের ২০ ছাত্রী, বিনধারা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৪ ছাত্রী, বারোকান্দী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২ ছাত্রী, নিকড় দীঘি নান্দুলা উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসি পরিক্ষার্থী ১৩ ছাত্রীর মধ্যে ৯ ছাত্রীসহ ১৮ জনের বাল্যবিবাহ হয়েছে।
এ ছাড়াও সরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৮ ছাত্রী, খোকশাগাড়ী মাদ্রাসার ২৫ ছাত্রী, মোহাম্মদপুর মাদ্রাসার ২০ ছাত্রী, ধুরইল উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৩ ছাত্রী, হাবিবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৫ ছাত্রী, হাকিমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৩ ছাত্রী, শালাইপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১১ ছাত্রীর, জয়হার মাদ্রাসার আট ছাত্রী, কাটাপুকুর মাদ্রাসার ৩০ ছাত্রী, পিয়ারা ছাতীনালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩০ ছাত্রী, শাইলট্রি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ ছাত্রী, জাবেকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৫ ছাত্রী, জাতাইর পাগলা বাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৫ ছাত্রী, কাঁকড়া পিংলু উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭৫ ছাত্রী, গোড়না দাখিল মাদ্রাসার সাত ছাত্রী, পাঁচবিবি পৌর নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সাত ছাত্রী, পৌর উচ্চ বিদ্যালয়ের আট ছাত্রী, পৌর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১১ ছাত্রী ও দারুল ইসলাহ একাডেমির ১০ ছাত্রী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, পল্লী বালা বালিকা উচ্চ বিদ্যলয়ের ৩০ ছাত্রী, তেঘর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০ ছাত্রী, উড়ি মাধবপাড়া মহিলা আলিম মাদ্রাসায় ২০ ছাত্রী, দুর্গাদহ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০ ছাত্রী, হরিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ১২ ছাত্রী, ভাদসা উচ্চ বিদ্যালয়ে সাত ছাত্রী, কালেক্টরেট বালিকা বিদ্যানিকেতনে পাঁচ ছাত্রী, হেলকুন্ডা উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঁচ ছাত্রী ও কাদোয় আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ে সাত ছাত্রী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছেন।
কালাই উপজেলায় পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৬৬ ছাত্রীর বাল্যবিবাহের খবর পাওয়া গেছে। মোলামগাড়ীহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোসাদ্দেক হোসেন জানান, এবারের এসএসসি পরিক্ষার্থী ৫০ ছাত্রীর মধ্যে ২০ জনের বাল্যবিবাহ হয়েছে। ৮ম থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত আরো ১০ ছাত্রী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। এ ছাড়াও পুনট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৫ ছাত্রী, ভূগোইল হেজবুল্যাহ দাখিল মাদ্রাসায় পাঁচ ছাত্রী, কালাই ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় চার ছাত্রী ও কালাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১২ ছাত্রীর বাল্যবিবাহের খবর জানা গেছে।
আক্কেলপুর উপজেলায় ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ৭৫ জনের বাল্যবিবাহ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জামালগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আফরুজা সুলতানা জানান, ৯ম ও ১০ম শ্রেণির ১৫ ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে। এ ছাড়াও তিলকপুর আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৫ ছাত্রী, অনন্তপুর চৌধুরীপাড়া দাখিল মাদ্রাসায় ১৫ ছাত্রী, আমবাড়ী কুলঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১২ ছাত্রী, আক্কেলপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ছয় ছাত্রী, গোপীনাথপুর বালিকা বিদ্যালয়ে দুই ছাত্রীর বাল্যবিবাহ হয়েছে।
ক্ষেতলাল উপজেলার ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৬৪ ছাত্রীর বাল্যবিবাহের খবর পাওয়া গেছে। নওটিকা-কেশুরতা আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩০ ছাত্রী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। এছাড়াও মাহমুদপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২ ছাত্রী, ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ ছাত্রী, তিলাবুদুল আব্দুল মজিদ উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঁচ ছাত্রী, পাঠানপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঁচ ছাত্রী ও জিয়াপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীর বাল্যবিবাহের খবর পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, করোনাকালে কঠোর লকডাউন চলাকালে গোপনে এসব বিয়ের আযোজন করা হয়। ৫ থেকে ১০ জনের উপস্থিতিতে সন্ধ্যাবেলা অথবা গভীর রাতে নিজ এলাকা কখনো অন্য এলাকায় বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। বাল্যবিবাহের ঘটনায় সরকারি বিধান অনুযায়ী বয়স না হওয়ায় সাদা কাগজে উপস্থিত সাক্ষী ও নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে দেন মোহরের পরিমাণ উল্লেখ করে ও মেয়ের বয়স পূর্ণ হওয়ার পর রেজিস্ট্রি করা হবে এই শর্তে এই বাল্যবিবাহগুলো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রীর মা বলেন, ‘মেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে। স্কুল খুলছে না লেখাপড়া নেই। এলাকার যুবক শ্রেণির ছেলেরা মেয়েকে উত্ত্যক্ত করছে তাই বিয়ে দিয়েছি।’ সচেতন অভিভাবকরা মনে করেন, জনপ্রতিনিধিরা ও প্রশাসন না এগিয়ে এলে বাল্যবিবাহ ঠেকানো সম্ভব নয়। জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ জয়পুরহাট শাখার সভাপতি ও গবেষক আমিনুল হক বাবুল বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বাররা এলাকায় ছিলেন। এর পরও কীভাবে এতগুলো বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটল তার খতিয়ে দেখা দরকার।
সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক কুমার বণিক বলেন, করোনার সময় শতকরা ২ থেকে ৩ ভাগ শিশু বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে। প্রকৃত তথ্য জানার জন্য এসব স্কুল পরিদর্শন করা হচ্ছে। পাঁচবিবি থানার ওসি পলাশ চন্দ্র দেব বলেন, ‘বাল্যবিবাহের বিষয়ে আমাদের কেউ জানালে আমরা অভিযান চালিয়ে বিয়ে ভেঙে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সহযোগিতায় প্রতি মাসে গড়ে বাল্যবিবাহবিরোধী ১০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়ে থাকে।’
জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) শাহাদুজ্জামান বলেন, সরকারের নির্দেশনা না থাকায় বাল্যবিবাহের তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি। করোনার কারণে অনেক অভিভাবক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। বাবা-মাকে সাহায্য করতে অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়েছে। শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ শিশু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা করেন তিনি।