তালেবানের পথের কাঁটা আইএস!

কিছু খারাপ এবং দুর্নীতিপরায়ণ মানুষ আছেন যারা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষণ্ন করতে চান। কিন্তু সেই সুযোগ দেওয়া হবে না। বিবিসির সংবাদদাতা সিকান্দার কিরমানি বলছেন, আইএস তালেবানের জন্য যে বিশাল হুমকি হয়ে উঠছে, সেটা তারা প্রকাশ্যে বড় করে দেখাতে চাইছেন না

শিফারুল শেখ

 

আফগানিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আশ্বস্ত করেছে তালেবান। তারা বলছে, দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে এবং আরেকটি যুদ্ধের সম্ভাবনা এড়ানো গেছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ একের পর হামলা চালিয়ে তার দায়িত্বও স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেটের আফগান শাখা আইএস-কে। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় আইএসের আত্মঘাতী হামলায় বহু মানুষ মারা যায় এবং আহত হয়। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত হামিদ কারজাই এবং আশরাফ ঘানির সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে তালেবান এই ধরনের হামলার দায়িত্ব স্বীকার করত। এখন তাদের শাসনামলে সেই ধরনের হামলা চালাচ্ছে আইএস-কে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইএস-কে-ই এখন তালেবানের প্রধান শত্রু হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদের সফলতা অর্জনে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইএস।

 

একের পর এ হামলা আইএস-কের

প্রায় আট সপ্তাহ হয়েছে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায়। কিন্তু এরই মধ্যে রাজধানী কাবুল, মাজার-ই-শরিফ, জালালাবাদ এবং কুন্দুজ প্রদেশে হামলা চালিয়েছে আইএসকে। তালেবান ক্ষমতায় আসার ১১ দিনের মাথায় কাবুলের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালায় আইএস-কে যাতে নিহত হয় ১৮০ জন। আর গত শুক্রবারের হামলায় নিহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। বিশেষ করে নানগারহার প্রদেশের রাজধানী জালালাবাদে কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ৩৫ তালেবান যোদ্ধাকেও হত্যার কথা জানায় আইএসে-কে। যদিও তালেবান স্বীকার করেনি। এসব হামলার পর তালেবান বরাবরই বলছে, তারা অস্থিতিশীলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

 

আইএস-কে যেভাবে তালেবানের শত্রু

আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠী যে নাম ব্যবহার করে তা হলো ইসলামিক স্টেট অফ খোরাসান প্রভিন্স। খোরাসান শব্দটি এসেছে আধুনিক আফগানিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ে যে অঞ্চল তার প্রাচীন নাম থেকে। আইএস-কে গোষ্ঠীর জন্ম ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে। এর মূল ঘাঁটি আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় নানগারহার প্রদেশে। পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এই এলাকাটি মাদক ও মানুষ পাচারের জন্য কুখ্যাত। এর সদস্যরা মূলত আফগান ও পাকিস্তানি জিহাদি। আফগান তালেবান থেকে দলত্যাগী অনেকেই আইএস-কেতে যোগ দিয়েছে। তালেবানের চেয়ে আইএস-কে বহুগুণ বেশি কট্টরপন্থি। তারা আফগান তালেবানকে শত্রু বলে মনে করে। ইসলামী বিধানের তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মনে করে যে মুরতাদ হিসেবে তালেবানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো ‘জায়েজ’ (বৈধ/আইনসিদ্ধ)।

গত বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং আফগানিস্তানের তালেবানের মধ্যে যে শান্তি চুক্তি হয় আইএস-কে তার নিন্দা জানায় এবং বলে যে, তারা আফগানিস্তানে তাদের লড়াই অব্যাহত রাখবে। এই গোষ্ঠী একই সঙ্গে তালেবানের আফগানিস্তান দখলকে নাকচ করে দিয়ে দাবি করে যে, এক গোপন চুক্তির অংশ হিসেবে আমেরিকানরা আফগানিস্তানকে তালেবানের হাতে তুলে দিয়েছে। বিবিসির নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফ্র্যাংক গার্ডনার বলছেন, এর পরও তালেবানের সঙ্গে আইএস-কের যোগাযোগ রয়েছে, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে গবেষকদের উদ্ধৃত করে তিনি জানান, আইএস-কে এবং হাক্কানি গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে হাক্কানি গোষ্ঠীর সঙ্গে রয়েছে তালেবানের সম্পর্ক। আইএস-কে সুন্নিপন্থি এবং শিয়া ধর্মাবলম্বীর দেশ ইরান তাদের অন্যতম প্রধান শত্রু। আবার তালেবানের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ।

 

টিকতে পারবে তালেবান?

এখনো তালেবান সরকারের স্বীকৃতি মেলেনি। ক্ষমতায় আসার পর গতকাল রবিবার এবং এর আগের দিন শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রথমবারের মতো বৈঠক করেছে। সেখানে তালেবান রিজার্ভ ছাড়ের আবেদন এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আবেদন জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এই বৈঠক মানেই স্বীকৃতি নয়। এই পথ এখনো বহুদূর। ক্ষমতায় আসার পরই আইএস-কের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। নানগারহার প্রদেশে আইএসের শক্তিশালি ঘাঁটি থেকে ৮০ সদস্যকে আটকের কথা জানিয়েছে তালেবান। গোষ্ঠীটি আইএস-কের সাবেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা জিয়াউল হককে হত্যার কথা জানিয়েছিল। এছাড়া ফারুক বেনগালজাইকে হত্যা এবং সালাফি পণ্ডিত আবু ওবায়দুল্লাহ মুক্তাকিকে আটকের কথা জানায়। এক সপ্তাহ পর মুত্তাকির মরদেহ পাওয়া যায়। তবে তালেবান মুত্তাকিকে হত্যার কথা অস্বীকার করেছে। তালেবান বিভিন্ন জেলার ১৬টি সালাফি মতাদর্শের মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান যুদ্ধ নিয়ে বইয়ের লেখক ও সাংবাদিক ওয়েসলি মরগান বলছেন, আগের কাবুল সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতোই তালেবান যে কোনো দোষ প্রমাণ ছাড়াই আইএস-কের ওপর চাপিয়ে এড়িয়ে যেতে পারে। যদিও আইএস-কের বেশির ভাগ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় নানগারহার প্রদেশকে ঘিরে। বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষকরা বলছেন, নানগারহার প্রদেশের কাছের কুনার প্রদেশে              সালাফি মতাদর্শের মানুষ বেশি যাদেরকে সমর্থন দেয় আইএস-কে। তবে বেশির ভাগ অঞ্চলেই হানাফি মতাদর্শের মানুষের সংখ্যা বেশি।

মরগান বলছেন, তালেবানের সমস্যা হলো তালেবানের সাবেক অনেক নেতাই ২০১৫ সালে আইএস-কের সঙ্গে যুক্ত হন। আবার আইএস-কের সঙ্গে তালেবানের অন্যতম শত্রু হয়ে উঠছে আল-কায়েদা। সম্প্রতি ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুল্লাহ মোহাম্মদ ইয়াকুব বলেন, কিছু খারাপ এবং দুর্নীতিপরায়ণ মানুষ আছেন যারা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষণ্ন করতে চান। কিন্তু সেই সুযোগ দেওয়া হবে না। বিবিসির সংবাদদাতা সিকান্দার কিরমানি বলছেন, আইএস তালেবানের জন্য যে বিশাল হুমকি হয়ে উঠছে, সেটা তারা প্রকাশ্যে বড় করে দেখাতে চাইছেন না। বহু আফগান আশা করেছিল তালেবান ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এলেও একটা অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু তালেবান নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, আইএস তাতে বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে।